পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে নিপসমের দুই গবেষণা
যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ দাম্পত্য সম্পর্ক বাড়ায়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সুশাসনের ঘাটতি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: পারস্পরিক সম্মান, কার্যকর যোগাযোগ ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি পরিবারের সংহতি ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে পারিবারিক এই সম্পর্ক সমাজের ভিত্তিকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্লিনিক্যাল কার্যক্রম সন্তোষজনক হলেও সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুশাসন নাগরিক সেবার মান নির্ধারণ করে দেয়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) পরিচালিত দুটি জাতীয় গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে, যা পরিবার ও স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
আজ মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীতে নিপসম অডিটোরিয়ামে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্বখাতে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ ও নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
প্রথম গবেষণায় বাংলাদেশের পারিবারিক সংহতি ও দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে শক্তিশালী ইতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় গবেষণায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্লিনিকেল কার্যক্রম সন্তোষজনক হলেও সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
দাম্পত্য সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা
‘ম্যারিটাল ডাইনামিক্স অ্যান্ড ফ্যামিলি কোহিশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন নিপসমের সহযোগী অধ্যাপক ড. শাহরিয়া সাত্তার। সহ-গবেষক হিসেবে ছিলেন ড. মো. আশরাফুল আলম, ড. এস. এম. শারাফ উল আলম এবং ড. শুভ তিথি গোস্বামী।
গবেষণাটি দেশের আটটি বিভাগের শহর ও গ্রামীণ এলাকার মোট এক হাজার ৬৪০ জন বিবাহিত নারী-পুরুষের ওপর পরিচালিত হয়। গবেষকদের দাবি, এটি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গবেষণা, যেখানে দাম্পত্য সম্পর্ক ও পারিবারিক সংহতির পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দাম্পত্য সম্পর্কের মান এবং পারিবারিক সংহতির মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে (Pearson's r = ০.৮১, p < ০.০০১)। পাশাপাশি পারিবারিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক মানসিক সমর্থন, সম্মান, কার্যকর যোগাযোগ এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সুদৃঢ় পরিবার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রধান গবেষক ড. শাহরিয়া সাত্তার বলেন, ‘সুষ্ঠু ও স্থিতিশীল পরিবারের ভিত্তি হলো সুষ্ঠু দাম্পত্য সম্পর্ক। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, পারস্পরিক সম্মান, কার্যকর যোগাযোগ, যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগগত সমর্থন পরিবারের সংহতি ও স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করে।’
গবেষণায় দাম্পত্য সম্পর্ক উন্নয়নে প্রাক-বিবাহ ও বিবাহোত্তর কাউন্সেলিং সম্প্রসারণ, গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও আয়বর্ধক কর্মসূচি জোরদার এবং জাতীয় পরিবারকল্যাণ ও জনস্বাস্থ্য নীতিতে ‘পারিবারিক সংহতি’কে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সুশাসন সংকট
অনুষ্ঠানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সুশাসনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে পরিচালিত দেশের প্রথম জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গবেষণার ফলও প্রকাশ করা হয়।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক ছিলেন নিপসমের জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল প্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. নাজমুল হাসান রিফাত। সহ-গবেষক ছিলেন অধ্যাপক ডা. এ. এন. এম. সামসুল ইসলাম এবং ড. জায়েদা জালাল সরকার।
গবেষণায় দেশের আটটি বিভাগ, ১৬টি জেলা ও ৪৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৮৬ জন স্বাস্থ্যব্যবস্থাপক ও কমিটি সদস্যের ওপর জরিপ এবং ১৮ জন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতার গভীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, সুশাসনের ১৬টি ডোমেইনের মধ্যে ১৩টিতে সন্তোষজনক চর্চা রয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিক্রিয়াশীলতা, ন্যায্যতা, আইন ও বিধিবিধান প্রতিপালন, নেতৃত্ব এবং মৌলিক ক্লিনিক্যাল সেবা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
তবে অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গুণগত মান উন্নয়ন, স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যের ব্যবহার এবং জনবল সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও স্থানীয় পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তা যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় না।
গবেষকরা বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্লিনিক্যাল ভিত্তি শক্তিশালী, এখন প্রয়োজন সেই ভিত্তিকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে সুশাসন ও ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।’
এ গবেষণায় ব্যবস্থাপকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে জনবল ব্যবস্থাপনায় অধিক ক্ষমতা প্রদান, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু, বাজেট ও ব্যয়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য কমিটিকে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়াসহ ছয়টি সুপারিশ করা হয়েছে।
নিপসম পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানার সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, এমপি।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদসহ নিপসমের শিক্ষক, গবেষক ও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
এমআই/এমইউ/