২৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:৩৩ পিএম

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: গবেষণার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: গবেষণার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা, পদ্ধতি এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী পরিচালক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিচালিত যেকোনো গবেষণা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত। অন্যথায় তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার পাশাপাশি দেশীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

আজ সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে মেডিভয়েসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে সংগ্রহ করা ২৫টি টুথপেস্টের মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আটটি টুথপেস্টকে মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার বড় একটি অংশ পার্শ্ববর্তী একটি দেশের ব্র্যান্ড।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। কেন পার্শ্ববর্তী দেশের কিছু টুথপেস্টকে নিরাপদ হিসেবে তুলে ধরা হলো, আর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হলো, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’

তার মতে, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কোনো পণ্যের মান নিয়ে গবেষণা হলে সেটি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অথবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে হওয়াই অধিক গ্রহণযোগ্য। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার এমন গবেষণা প্রকাশের পেছনের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যদি সত্যিই টুথপেস্টে এত মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে, তাহলে এটি অবশ্যই বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়। তবে সে ক্ষেত্রে গবেষণাটি আরও বিস্তৃতভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।’

তা ছাড়া ওরাল হেলথ বা মুখের স্বাস্থ্য রক্ষায় টুথপেস্টের চেয়ে নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার রাখা, সঠিক ব্রাশিং পদ্ধতি অনুসরণ এবং দৈনন্দিন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মাইক্রোপ্লাস্টিক দেহের ভেতরে গেলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে টুথপেস্টের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। টুথপেস্ট সাধারণত শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো হয় না; এটি মূলত দাঁত পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত হয়। যদি মাইক্রোপ্লাস্টিক রক্তে প্রবেশ করত, তাহলে তা রক্তনালীর মাধ্যমে হৃদ্‌যন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারত।

তিনি বলেন, ‘বাস্তবে আমরা টুথপেস্ট খাই না। দিনে দুইবার—সকালে নাশতার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে—মাত্র এক থেকে দেড় মিনিট দাঁত ব্রাশ করি। এই সময় টুথপেস্ট ব্রাশে ব্যবহার করার পর কুলি করে ফেলে দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই স্বল্প সময়ের ব্যবহারে টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়? বরং বিষয়টিকে সামনে এনে দেশের টুথপেস্ট বাজার বা দেশীয় উৎপাদকদের ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো প্রচেষ্টা আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ আর আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন খাবার, বিশেষ করে স্ট্রিট ফুড ও নানা খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বাস্তবভিত্তিক উদ্বেগ রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন গবেষণায় চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

‘অর্থাৎ, যেসব উৎস থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে, সেগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়। অথচ টুথপেস্টের মতো এমন একটি পণ্য, যা ব্যবহার শেষে কুলি করে ফেলে দেওয়া হয় এবং যার সংস্পর্শের সময়ও খুব অল্প, সেটিকে কেন্দ্র করেই বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির আলোচনা হচ্ছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠতে পারে, বিষয়টি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করছে কি না।’

দেশীয় টুথপেস্ট শিল্পের প্রসঙ্গ তুলে ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানীয় ব্র্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যবহৃত হচ্ছে। যথাযথ যাচাই ছাড়া এমন গবেষণা প্রকাশ দেশীয় শিল্পের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, ‘গবেষণাটি পরিচালনাকারী সংস্থার ভূমিকা, গবেষণার পদ্ধতি এবং তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা উচিত। একজন নাগরিক ও একজন ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার প্রশ্ন, ‘কেন বিদেশি কিছু ব্র্যান্ডকে নিরাপদ হিসেবে তুলে ধরা হলো এবং দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো, সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’

এনএইচ/এমআই/এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক