বিশ্ব আইভিএফ দিবসের আলোচনায় বক্তারা
প্রতি ছয় দম্পতির একটি বন্ধ্যত্বে ভুগছে, দেশে সহজলভ্য আধুনিক চিকিৎসা
মেডিভয়ে রিপোর্ট: দেশেও প্রতি ছয় দম্পতির একটি বন্ধ্যত্বে ভুগছে, যা বিশ্বের সামগ্রিক চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে একসময় দুরারোগ্য মনে করা এই সমস্যার আধুনিক চিকিৎসা এখন দেশেই সহজলভ্য। বর্তমানে সরকারি তিনটি এবং বেসরকারি প্রায় ২২টি আইভিএফ কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্ধ্যত্ব কোনো অভিশাপ নয়; সময়মতো রোগ নির্ণয় ও বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা নিলে সন্তান লাভের সম্ভাবনা আশাব্যঞ্জকভাবে বেড়ে যায়।
বিশ্ব আইভিএফ দিবস উপলক্ষে আজ শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর পান্থপথে লুমিনা আইভিএফ অ্যান্ড ফার্টিলিটি কেয়ার সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তারা।
দেশে কতজন দম্পতি বন্ধ্যত্বে ভুগছেন এ ব্যাপারে তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগ এবং রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফ্লোরিডা রহমান।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউএইচও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতি ছয়জন দম্পতির একজন বন্ধ্যত্বে ভুগেন। সে হিসাবে দেশে কতজন বিবাহিত দম্পতি আছেন, তার ভিত্তিতে বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত দম্পতির সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশে সরকারি খাতে তিনটি আইভিএফ সেন্টার রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে একটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগের অধীনে, যেখানে আমি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দ্বিতীয়টি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগে। তৃতীয় সরকারি আইভিএফ সেন্টারটি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), যা মূলত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য পরিচালিত হয়। এ ছাড়া দেশে প্রায় ২২টি বেসরকারি আইভিএফ সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে দুটি, মৌলভীবাজারে একটি, খুলনায় একটি এবং বাকি অধিকাংশ সেন্টার ঢাকায় অবস্থিত।’
আইভিএফ চিকিৎসার দেশবরেণ্য চিকিৎসদের তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসার পথিকৃৎদের মধ্যে অধ্যাপক পারভীন ফাতেমা, অধ্যাপক রাশিদা এবং প্রয়াত অধ্যাপক টি. চৌধুরীর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমানে রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি (আরইআই) বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) থেকে তিন বছর মেয়াদি এসফসিপিএস অথবা সমমানের উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হয়। বর্তমানে এফসিপিএস ও এমএস মিলিয়ে প্রায় ৭০ জন আরইআই বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আরও অনেক চিকিৎসক বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় যুক্ত আছেন।
দেশের বিভিন্ন আইভিএফ সেন্টারে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন চিকিৎসক নিয়মিত আইভিএফ সেবা প্রদান করছেন বলেও জানান অধ্যাপক ফ্লোরিডা রহমান।
দেশেও সহজলভ্য বন্ধ্যত্বের আধুনিক চিকিৎসা
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ (গাইনি এন্ড অবস) বিভাগের অধ্যাপক ডা. উম্মে তাহমিনা সীমা বলেন, এক সময় বন্ধ্যত্ব নিয়ে মানুষের মনে অনেক ভয় ও অনিশ্চয়তা ছিল। অনেকেই ভাবতেন, এর চিকিৎসা আদৌ সম্ভব কি-না, কিংবা সন্তান লাভের স্বপ্ন কখনও পূরণ হবে কি-না! কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সেই পরিস্থিতি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। বিশ্বের আধুনিক বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার সুবিধা এখন বাংলাদেশেও সহজলভ্য।
তিনি বলেন, দেশে আইভিএফ অ্যান্ড ফার্টিলিটি সেন্টারে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক চিকিৎসা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্ধ্যত্বের কার্যকর চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। ফলে সন্তান লাভের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব।
সবাইকে আশাবাদী থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বন্ধ্যত্বকে জয় করে আপনারা সফলতার মুখ দেখবেন—এই লক্ষ্যে আমাদের প্রচেষ্টা চলছে।’
বন্ধ্যত্ব কোনো অভিশাপ
আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডা. মুক্তি রানী সাহা বলেন, ‘বন্ধ্যত্ব কোনো অভিশাপ বা কুসংস্কারের বিষয় নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। সঠিক সময়ে একজন ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও চিকিৎসা নিলে বন্ধ্যত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসায় কিছু অর্থ ব্যয় হলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।’
আইভিএফ নিয়ে সমাজে নানা ভুল ধারণা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি কোনো অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়। এটি স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। নিষিক্তের পর ভ্রূণটি তিন থেকে পাঁচ দিন ল্যাবরেটরিতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, এরপর স্থানান্তর করা হয় মায়ের জরায়ুতে। পরবর্তী বৃদ্ধি ও বিকাশ সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই মায়ের গর্ভে ঘটে।
‘তাই প্রয়োজন অনুযায়ী যে চিকিৎসা উপযুক্ত, তা গ্রহণে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয়’—বলেন তিনি।
ল্যাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এমব্রায়োলজিস্টরা
লুমিনা আইভিএফ অ্যান্ড ফার্টিলিটি কেয়ারের চিফ এমব্রায়োলজিস্ট ডা. মো. মাসরুদ হোসাইন বলেন, আইভিএফ চিকিৎসায় এমব্রায়োলজিস্টরা পর্দার আড়ালে ল্যাবরেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে আইভিএফের সফলতা কখনোই একজনের একক প্রচেষ্টার ফল নয়; এটি একটি সমন্বিত টিমওয়ার্ক। চিকিৎসক, এমব্রায়োলজিস্ট, নার্স, কাউন্সেলর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি সফল ফলাফল অর্জিত হয়।
বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা এখন অনেক এগিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যে আধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তার অধিকাংশই বর্তমানে লুমিনা আইভিএফ অ্যান্ড ফার্টিলিটি কেয়ারসহ দেশের বিভিন্ন সেন্টারে দেওয়া হয়। এসব কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা ও আধুনিক ল্যাব সুবিধার মাধ্যমে রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব আইভিএফ দিবসে আমাদের বার্তা একটাই—বন্ধ্যত্ব কোনো অভিশাপ নয়; এটি চিকিৎসার মাধ্যমে জয় করা সম্ভব। সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর প্রত্যেক রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। যাদের আইভিএফ প্রয়োজন, তাদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু করতে অযথা দেরি হয়। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইভিএফের সফলতার হার কমে যায়। ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে সাফল্যের হার বিশ্বজুড়েই তুলনামূলকভাবে কম। তাই সময় নষ্ট না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন’—বলেন এই এমব্রায়োলজিস্ট।
ডা. মাসরুদ হোসাইন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে নিজস্ব ডিম্বাণু ও শুক্রাণু ব্যবহার করে যে আইভিএফ চিকিৎসা করা হয়, তার সফলতার হার আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে সফলতার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।’
অনুষ্ঠানে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডা. নাফিসা জেসমিন বলেন, ‘এখনও অনেক মানুষ জানেন না, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার জন্য কোথায় যেতে হবে। অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের উন্নত চিকিৎসা পেতে বিদেশে যেতে হয়। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশেই আন্তর্জাতিক মানের আইভিএফ ও বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা সহজলভ্য।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই, দেশের মানুষ দেশেই চিকিৎসা গ্রহণ করুন। এতে রোগীরা যেমন সহজে সেবা পাবেন, তেমনি দেশের অর্থও দেশের মধ্যেই থাকবে।’
সব রোগীর ক্ষেত্রে শতভাগ সফলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় জানিয়ে ডা. নাফিসা জেসমিন বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দক্ষতা ও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিটি দম্পতির পাশে থাকতে চাই। সফলতার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই আমাদের অঙ্গীকার।’
অনুষ্ঠানে সফল আইভিএফ চিকিৎসায় সন্তান লাভ করা একাধিক দম্পতিসহ বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা নেওয়া দম্পতি ও বিভিন্ন স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এমইউ/