চুরাশি ভাগ হৃদরোগীর রক্তে প্লাস্টিক, গবেষণা প্রতিবেদনের ফল
মেডিভয়েস রিপোর্ট: হৃদরোগে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীর রক্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বেশির ভাগ হৃদরোগীর রক্তে মিশে রয়েছে মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিক। এমনকি, হার্টের ধমনীর ভিতরেও তা পরতে পরতে জমা হচ্ছে।
একই সঙ্গে এসব রোগীর শরীরে প্রদাহজনিত বায়োমার্কার এবং সূক্ষ্ম বায়ুদূষণ কণাও বেশি ছিল বলে জানিয়েছেন তারা।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নাল’ এবং ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে’ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে।
ইতালির স্যাপিয়েঞ্জা ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা হৃদরোগীদের নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছেন। দেখা গিয়েছে, সদ্য হার্ট অ্যাটাক হয়েছে অথবা বহু বছর ধরে হৃদরোগে ভুগছেন, এমন রোগীদের প্রায় ৮৪ শতাংশের রক্তে ও হার্টের ধমনীতে জমে রয়েছে প্লাস্টিকের সূক্ষ্ম কণা।
তারা করোনারি ধমনী রোগ (করোনারি আর্টারি ডিজিজ) সন্দেহে করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি করা ৬১ জন রোগীর ওপর এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তাতে গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত ১৯ জন, দীর্ঘমেয়াদি করোনারি সিনড্রোমে (সিসিএস) আক্রান্ত ২০ জন এবং স্বাভাবিক করোনারি ধমনীযুক্ত ২২ জন ছিল।
ফলাফলে দেখা যায়, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের ৮৪.২ শতাংশের রক্তে ও হার্টের ধমনীতে জমছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এই প্লাস্টিকের কারণেই তাঁদের হার্টের ধমনীতে চর্বির আবরণ (প্লাক) জমছে এবং হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
তুলনায় সিসিএস রোগীদের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের হার ছিল ৪০ শতাংশ এবং স্বাভাবিকদের ক্ষেত্রে ছিল ৩১.৮ শতাংশ।
এ ছাড়া হৃদরোগে আক্রান্তদের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব এবং বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। শনাক্ত হওয়া প্লাস্টিকের মধ্যে পলিইথিলিন ছিল সবচেয়ে বেশি, যা মোট শনাক্ত পলিমারের প্রায় ৯৭ শতাংশ।
একই রোগীর করোনারি রক্ত এবং শরীরের অন্য অংশের (পেরিফেরাল) রক্তে একই ধরনের প্লাস্টিক পাওয়া গেলেও করোনারি রক্তে এর ঘনত্ব ছিল বেশি।
গবেষকদের দাবি, প্লাস্টিকের কণা নষ্ট হয় না। ফলে শরীরে ঢুকলে তা অবিকৃত দিনের পর দিন এবং জমা হতে থাকে। হার্টের ধমনীতে যদি এমন প্লাস্টিক জমে যায়, তাহলে সেটা রক্তপ্রবাহে বাঁধা দিবে এবং হৃৎস্পন্দনের হার বদলে যাবে। ফলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়বে।
দেহে ন্যানোপ্লাস্টিক যেভাবে প্রবেশ করে
ন্যানোপ্লাস্টিক হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে দেখা যায় না। এটি বিভিন্নভাবে শরীরে প্রবেশ করতে পারে—যেমন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং, বোতলজাত পানি বা দূষিত খাবারের মাধ্যমে, বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে, কিছু ক্ষেত্রে ট্যাপের পানির মাধ্যমে।
আবার যারা বেশি ধূমপান করেন তাদের শরীরে সিগারেটের ফিল্টার থেকে ন্যানোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে। তামাক যেভাবে প্রক্রিয়াকরণ করা হয়, তার থেকে প্লাস্টিক মিশে যায় তামাকজাত পণ্যে। সেই প্লাস্টিকের গুঁড়ো সরাসরি ঢুকে যায় ফুসফুসে।
যেভাবে রক্তে ছড়িয়ে পড়ে
ফুসফুসের অ্যালভিওলাই’র (বায়ুথলি) মাধ্যমে এই সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণাগুলো রক্তনালির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে পুরো শরীরের রক্তপ্রবাহে ও হৃৎপিণ্ডের ধমনীতে গিয়ে পৌঁছায়। রক্তনালির দেওয়ালে যে চর্বি বা কোলেস্টেরল (প্লাক) জমে, প্লাস্টিক কণাগুলো সেই চর্বির ভিতরে গিয়ে জমা হয়।
ফলে সেখানে তীব্র প্রদাহ হয়। এই প্রদাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে রক্তনালির ভিতরে ব্লকেজ় তৈরি হয় বা রক্তনালির দেওয়ালে ক্ষত সৃষ্টি হয়। ফলে ধমনী শক্ত হয়ে সংকোচিত ও রক্ত জমাট বাঁধার কারণে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
ন্যানোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানোর উপায়
দৈনন্দিন জীবনে কিছু সচেতন অভ্যাস গড়ে তুললে ন্যানোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানো সম্ভব। প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে কাঁচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ব্যবহার করা। প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার বা পানীয় রাখা এবং মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করা এড়িয়ে চলা। খাবার সংরক্ষণের জন্য কাঁচ, স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা।
এ ছাড়া প্লাস্টিকে মোড়ানো ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে তাজা ও ঘরে তৈরি খাবারের অভ্যাস করা। ঘরের ধুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা, কারণ ধুলোর মধ্যেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা থাকতে পারে। সম্ভব হলে প্রাকৃতিক তন্তুর কাপড় ব্যবহারের পাশাপাশি সিন্থেটিক কাপড়ের ব্যবহার কমানো।
কাঠ বা বাঁশের কাটিং বোর্ড ব্যবহার করা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য এড়িয়ে চলা এবং নিরাপদ পানি পান করাও ন্যানোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমাতে সহায়ক হতে পারে। প্লাস্টিকের জিনিস অতিরিক্ত তাপ ও রোদ থেকে দূরে রাখা এবং দৈনন্দিন ব্যবহারে কাঁচ, স্টিল ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প বেছে নেওয়ার চেষ্টা করা।
এইউ/এমইউ