বিরল ‘সিএফ’ রোগের চিকিৎসায় জেনেরিক আনল বেক্সিমকো, ৩৭০০০০ ডলারের ওষুধ মিলবে ১২৭৫০ ডলারে
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিরল ও প্রাণঘাতী বংশগত রোগ সিস্টিক ফাইব্রোসিসের (সিএফ) চিকিৎসায় নতুন আশার বার্তা নিয়ে এসেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অন্যতম কার্যকর সিএফ চিকিৎসার ওষুধ ‘ট্রিকাফট’র জেনেরিক সংস্করণ ‘ট্রিকো’ বাজারে এনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ শুরু করেছে।
সোমবার (১৫ জুন) টঙ্গীতে বেক্সিমকো ফার্মার উৎপাদন কারখানায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ছয়টি দেশের সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগী ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ওষুধটি তুলে দেওয়া হয়।
বেক্সিমকো ফার্মার নতুন ওষুধ ‘ট্রিকো’ ইলেক্সাক্যাফটর, টেজাক্যাফটর ও আইভাক্যাফটরের সমন্বয়ে তৈরি, যা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্টেক্স ফার্মাসিউটিক্যালসের উদ্ভাবিত ‘ট্রিকাফটা’ এর জেনেরিক সংস্করণ। কোম্পানির দাবি, এর মাধ্যমে বিশ্বের বহু রোগী অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা অনেক কম খরচে গ্রহণের সুযোগ পাবেন।
এই উদ্যোগের ঘোষণা প্রথম দেওয়া হয় ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অনুষ্ঠিত নর্থ আমেরিকান সিস্টিক ফাইব্রোসিস কনফারেন্সে (এনএসিএফসি)। সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের একটি জোটের আহ্বানের পর বেক্সিমকো এ উদ্যোগ নেয়।
সিস্টিক ফাইব্রোসিস এমন একটি বংশগত রোগ, যেখানে ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রে ঘন শ্লেষ্মা জমে শ্বাস-প্রশ্বাস ও হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেলে রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া আরও প্রায় ৮০ হাজার রোগী এখনও শনাক্ত হয়নি, যাদের ৮২ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করেন।
বর্তমানে সিএফ চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকর ওষুধগুলোর একটি ট্রিকাফটা। তবে যুক্তরাষ্ট্রে একজন রোগীর এ ওষুধে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হয়, যা অধিকাংশ রোগীর সামর্থ্যের বাইরে। পেটেন্ট সুরক্ষার কারণে এতদিন এর কোনো জেনেরিক সংস্করণও বাজারে ছিল না।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলো ওষুধের পেটেন্ট সুরক্ষা কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় বেক্সিমকো আইনগতভাবে এ জেনেরিক সংস্করণ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে।
বেক্সিমকো ফার্মা জানিয়েছে, ট্রিকোর বার্ষিক মূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলার এবং শিশুদের জন্য ৬ হাজার ৩৭৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি ট্রিকাফটার যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ কম। কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, মূল ব্র্যান্ডের একজন শিশুর চিকিৎসা ব্যয়ে ট্রিকোর মাধ্যমে প্রায় ৫৮ জন শিশুর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ‘বেক্সডেকো’ নামে আইভাক্যাফটরের জেনেরিক সংস্করণও বাজারে এনেছে, যার মূল্য প্রতি ট্যাবলেট ৫ মার্কিন ডলার। প্রাথমিকভাবে ‘সিএফ বায়ার্স ক্লাব’ এর মাধ্যমে নির্ধারিত রোগীদের কাছে ওষুধ সরবরাহ করা হবে। ভবিষ্যতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্বের আরও বেশি চিকিৎসাবঞ্চিত রোগীর কাছে এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘রাইট টু ব্রিদ’ গ্লোবাল ক্যাম্পেইনের নেত্রী ও রোগী অধিকারকর্মী গেইল প্লেজার বলেন, জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে আধুনিক সিস্টিক ফাইব্রোসিস চিকিৎসা এখনও অধিকাংশ রোগীর নাগালের বাইরে। বেক্সিমকো ফার্মার এই উদ্যোগ বৈশ্বিক চিকিৎসা বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রাব্বুর রেজা বলেন, বিরল ও জটিল রোগের চিকিৎসায় অপূর্ণ চাহিদা পূরণে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। সাশ্রয়ী মূল্যে এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধ রোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে পারা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। তার মতে, এই উদ্যোগ বিশ্বের হাজারো সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
এমআর/