হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলনে আহ্বান
হাসপাতালে শয্যার সঙ্গে জনবল, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নিতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করলেও নিরাপত্তাহীনতাসহ কর্মস্থলে তাঁদের নানা অসুবিধা ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থায় হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর সঙ্গে জনবল, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমানতালে সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছে বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন।
আজ সোমবার (১৫ জুন) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে মাওলানা আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই আহ্বান জানান তারা।
‘নিরাপদ কর্মস্থল চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা জনগণের অধিকার’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের কথা তুলে ধরেন বক্তারা। তারা বলেন, বর্তমানে গড় আয়ু ৭২ বছরের বেশি, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বে প্রশংসিত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছার পাশাপাশি সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সাফল্যের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
এই অর্জনগুলো কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয় উল্লেখ করে তারা বলেন, এর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার পরিকল্পনা কর্মী এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম, ত্যাগ ও পেশাগত নিষ্ঠা।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংকটে স্বাস্থ্যকর্মীদের অবদানের কথা তুলে ধরে জানানো হয়, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগ, মহামারি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জনস্বাস্থ্য সংকটে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সামনের সারিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রেখে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়েছেন।
তারা বলেন, ‘অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেছেন। বিনিময়ে আমাদের যে প্রণোদনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তাও মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ পায়নি। এতে আমাদের কোন দুঃখ নেই। বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে এবং হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে সরকারের আদেশ অনুযায়ী সারাদেশের সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
তারা আরও বলেন, ঈদ, পূজা, ছুটি কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠান—সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে স্বাস্থ্যকর্মীরা সর্বদাই জনগণের সেবা নিশ্চিত করেছেন।
এ সময় দেশের স্বাস্থ্যখাতের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। বলেন, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সূচকের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সীমিত সম্পদের মধ্যেও বিপুল জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দেশের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। তবে এই অর্জনের পেছনে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাস্তব কর্মপরিবেশ আজ গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং জনগণের কাছে নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পৌছে নিয়ে তাদের সুপারিশসমূহ সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে।
চিকিৎসকদের দাবি, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, রোগের ধরন পরিবর্তন, চিকিৎসাসেবার চাহিদা বৃদ্ধি এবং মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। সরকার দেশে সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০১ শয্যায়, বেশ কয়েকটি জেলা হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায়, বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ১০০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে শুধু শয্যা নয়, শয্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমানতালে সম্প্রসারিত হতে হবে। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, শয্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপ, শূন্যপদ, সীমিত সহায়ক ব্যবস্থা এবং ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই স্বাস্থ্যকর্মীরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তারা বলেন, এইবারই প্রথম দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্ধের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ১.১০ (এক দশমিক এক শূন্য) শতাংশ বলে সংসদে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে অর্থমন্ত্রী এটিকে বর্তমান সরকারের মেয়াদ পূর্তিতে ৫% পর্যন্ত উন্নীত করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও স্বাস্থ্য খাতের উপর বর্তমান সরকারের গুরুত্ব প্রকাশ করে। এই জন্য বিসিএস হেলথ ক্যাডার এসোসিয়েশন বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছে। কিন্তু সাথে সাথে এই সম্পর্কে উদ্বেগও প্রকাশ করছে যে, সারা বছরের জন্য যে বাজেট দেওয়া হয় স্বাস্থ্য বিভাগ তার সামান্যই ব্যয় করতে পারে। এর পেছনে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সময়মত অর্থ ছাড় না হওয়া ও প্রশাসনিক অদক্ষতা। ফলে জনগণ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
‘এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, ভাঙচুর, হুমকি এবং চিকিৎসা কার্যক্রমে বাধা প্রদানের ঘটনা ক্রমাগত আলোচনায় আসছে। এসব ঘটনা শুধু একজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং এটি জনগণের অবিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারকেও সরাসরি প্রভাবিত করছ ‘—যোগ করেন বক্তারা।
এ সময় একাধিক চিকিৎসক নিগ্রহের কথা তুলে ধরে হতাশা প্রকাশের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিতের দাবি জানান তারা। বলেন, ‘অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে আমরা স্মরণ করছি, শরীয়তপুরে দায়িত্বরত ৪৮তম বিসিএস কর্মকর্তা ডা. নাসির ইসলাম, কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ড. তানভীর লতিফ, বরিশালে কেমসি হাসপাতালে বেসরকারি চিকিৎসক ডা. শিবু, গত শনিবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) মতো ওয়ার্ডে ঢুকে চিকিৎসকের উপর হামলাসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সংঘটিত ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা। দায়িত্ব পালনরত একজন সরকারি চিকিৎসকের তথা একজন সরকারি কর্মকর্তার ওপর এ ধরনের হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তথা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কাঠামো ও কর্মপরিবেশ নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের প্রতিফলন। সরকার এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আমরা আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই যে, তারা অতি দ্রুততার সাথে ডা. নাছিরের সকল চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন এবং মামলারও ব্যবস্থা করেছেন।’
‘তবে আমরা লক্ষ্য করেছি, বিভিন্ন ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হলেও অনেক ক্ষেত্রে দায়ীদের দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গভাবে আইনের আওতায় আনা এবং দৃশ্যমান বিচারিক অগ্রগতির বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকে যায়। এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলছেই, ফলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছি’—জানানো সংবাদ সম্মেলনে।
এমইউ/