ডা. সাজ্জাদ মাহমুদ

ডা. সাজ্জাদ মাহমুদ

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


০৬ মে, ২০২৬ ০৬:১৭ পিএম

পুরুষের ‘প্রেগন্যান্সি টেস্ট’ পজিটিভ: হাসির আড়ালে এক গুরুতর বার্তা

পুরুষের ‘প্রেগন্যান্সি টেস্ট’ পজিটিভ: হাসির আড়ালে এক গুরুতর বার্তা
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিষয় বারবার সামনে আসছে যে, কোনো একজন পুরুষ মজা করে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করলেন, অবাক করা বিষয় হলো সেই ফলাফল এসেছে পজিটিভ। বিষয়টি প্রথম দৃষ্টিতে নিছক হাস্যরসের মতো মনে হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মোটেও তুচ্ছ কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি এমন একটি সংকেত, যা কখনো কখনো গুরুতর রোগের ইঙ্গিত দিতে পারে। তাই বিষয়টিকে হালকাভাবে না দেখে, যথাযথ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝা জরুরি।

প্রেগন্যান্সি টেস্ট মূলত একটি নির্দিষ্ট হরমোন শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যার নাম হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন (এইচসিজি)। এই হরমোন সাধারণত গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা থেকে উৎপন্ন হয় এবং রক্ত ও প্রস্রাবের মাধ্যমে নির্গত হয়। তাই একজন নারীর ক্ষেত্রে প্রস্রাবে এইচসিজি পাওয়া গেলে সেটিকে গর্ভধারণের একটি নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু একজন পুরুষের শরীরে এই হরমোন স্বাভাবিক অবস্থায় তৈরি হওয়ার কথা নয়। এখানেই শুরু হয় আসল প্রশ্ন—তাহলে পুরুষের শরীরে এইচসিজি এলো কোথা থেকে?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা হলো, কিছু নির্দিষ্ট ধরনের টিউমার এই হরমোন উৎপন্ন করতে পারে। বিশেষ করে অণ্ডকোষের ক্যান্সারের একটি বড় অংশ, যাকে টেস্টিকুলার ক্যান্সার বলে বলা হয়, তার মধ্যে থাকা জার্ম সেল টিউমার প্রকারভেদে এইচসিজি তৈরি করতে সক্ষম। যেমন—কোরিওকারসিনোমা বা এম্ব্রায়োনাল কারসিনোমা ধরনের টিউমারগুলোতে এই হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং তা প্রস্রাবে ধরা পড়তে পারে। এ ধরনের টিউমার অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে খুব বেশি উপসর্গ সৃষ্টি করে না, ফলে রোগী নিজেই বিষয়টি বুঝতে পারেন না। তবে কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ থাকতে পারে—অণ্ডকোষে ব্যথাহীন ফোলা বা গাঁট, হালকা ভারী অনুভূতি অথবা হরমোনের প্রভাবে স্তনের আকার কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়া। আরও অগ্রসর অবস্থায় পিঠে ব্যথা বা শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

পুরুষের প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ মানেই ক্যান্সার নয়

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন, তা হলো—সব ক্ষেত্রে পুরুষের প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ মানেই ক্যান্সার, এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি দেওয়া যাবে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফলস পজিটিভ নামক একটি বাস্তবতা রয়েছে। অনেক সময় টেস্ট কিটের গুণগত সমস্যা, মেয়াদোত্তীর্ণ স্ট্রিপ, পরীক্ষার ভুল পদ্ধতি অথবা শরীরের কিছু অ্যান্টিবডির কারণে ভুলভাবে পজিটিভ ফলাফল আসতে পারে। এমনকি কিছু হরমোনের গঠনগত সাদৃশ্যের কারণে ক্রস-রিঅ্যাক্টিভিটিও হতে পারে। তাই একটি মাত্র ইউরিন টেস্টের ওপর ভিত্তি করে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

এই প্রেক্ষাপটে একজন সচেতন চিকিৎসকের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ফলাফলকে কখনোই হাসির বিষয় হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়, আবার অযথা আতঙ্কও সৃষ্টি করা উচিত নয়। এটিকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে ধরে নিয়ে ধাপে ধাপে নিশ্চিত হওয়াই হলো সঠিক পদ্ধতি। 

পরীক্ষা-নিরীক্ষা 

প্রথমে পুনরায় একটি ভিন্ন কিট দিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে। এরপর রক্তে সিরাম বেটা এইচসিজি পরিমাপ করা প্রয়োজন, যা অধিক নির্ভুল এবং পরিমাণগত তথ্য প্রদান করে। যদি রক্তে এইচসিজির মাত্রা সত্যিই বৃদ্ধি পাওয়া যায়, তাহলে অণ্ডকোষের শারীরিক পরীক্ষা এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম করা জরুরি। প্রয়োজনে আরও বিস্তৃত মূল্যায়নের জন্য অন্যান্য ইমেজিং, যেমন সিটি স্ক্যানও করা হতে পারে।

সময়মতো পদক্ষেপে সুস্থতা সম্ভব

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টেস্টিকুলার ক্যান্সার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া যায় এমন রোগ, যদি তা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়। অর্থাৎ সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অত্যন্ত ভালো। কিন্তু দেরি হলে রোগটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে এবং তখন চিকিৎসা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

অসুখে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই এমন অনেক বিষয়কে বিনোদনের চোখে দেখি, যেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি প্রেগন্যান্সি টেস্ট স্ট্রিপে পজিটিভ লাইন দেখা যাওয়ার ঘটনাটি হয়তো মুহূর্তের জন্য হাসির উদ্রেক করতে পারে, কিন্তু এর পেছনে যে সম্ভাব্য শারীরিক ঝুঁকির বার্তা লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটিকে অবহেলা করা ঠিক নয়। বরং এই ধরনের ঘটনার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, পুরুষের ক্ষেত্রে প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল ক্লু। এটি কোনো চূড়ান্ত রোগনির্ণয় নয়, কিন্তু এমন একটি ইঙ্গিত, যা আমাদের আরও অনুসন্ধানে যেতে বাধ্য করে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল আচরণ হলো—বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা। সচেতনতা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপই এখানে সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত