তৃণমূলে স্বাস্থ্যসেবার রুগ্নদশা, ১২-১৫ জনের স্থলে সেবায় ২-৩ চিকিৎসক
আবু নাঈম মনির: চিকিৎসক স্বল্পতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে এ সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলায় ১২ থেকে ১৫ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও সেখানে কাজ করছেন মাত্র ২-৩ জন। এ পরিস্থিতিতে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। অন্যদিকে সেবা অব্যাহত রাখতে গিয়ে কর্মরত চিকিৎসকদের গড়ে প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা সময় দিতে হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন এই ধকলের কারণে দারুণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন।
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের তথ্যমতে, তৃণমূলে এখনো প্রায় ১৩ হাজার চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। প্রান্তিকের স্বাস্থ্যসেবা গতিশীল ও শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের আয়োজন করে সরকার।
নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সুপারিশপ্রাপ্ত অনেক চিকিৎসক বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি থেকে ইস্তফা প্রদান করেছেন, কেউ কেউ পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্সে পড়াশোনা বন্ধ রেখেছেন। নিয়োগপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় এখন তারা বিপাকে পড়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, অল্প কয়েকজনের পুলিশ ভ্যারিফিকেশনসহ কিছু কাজ বাকি আছে, যা দ্রুততার সঙ্গেই চলছে। অযথা বিলম্বিত হওয়ার ধারণা ভুল। দাপ্তরিক কাজগুলো শেষ হলে আশা করা যায় ডিসেম্বরেই নিয়োগ সম্পন্ন হবে।
বিশেষ বিসিএসের উদ্যোগ যে কারণে
গত ২৯ মে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) দ্রুততার সঙ্গে পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশের কাজ সম্পন্ন করে। ফলাফল প্রকাশিত হয় ১১ সেপ্টেম্বর।
এর পর বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য সচিব গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, অক্টোবর কিংবা নভেম্বরের মধ্যেই নিয়োগ সম্পন্ন হবে। সর্বশেষ বক্তব্যে বলা হয়, ২০ নভেম্বরের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এখনো গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৪৮তম বিসিএসে উত্তীর্ণ চিকিৎসকদের নিয়োগ দিতে পারছে না। এর ফলে উত্তীর্ণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিলম্বের কারণে বিপাকে পদায়নপ্রত্যাশীরা
দ্রুত নিয়োগের আশ্বাসে পোস্টগ্রাজুয়েশন ট্রেনিংয়ে যুক্ত ছিলেন, এমন অনেকে অক্টোবর-নভেম্বর থেকে সেই প্রশিক্ষণ বন্ধ করেছেন। একই সঙ্গে বেসরকারি চাকরিতে সাধারণত এক থেকে দুই মাস আগে পদত্যাগের নোটিশ দিতে হয়। আগামী নভেম্বরের মধ্যেই নিয়োগ হবে―এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক প্রার্থী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, যার ফলে তারা এখন আর্থিক ও পেশাগত বিপাকে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসক সংকট মোকাবিলায় বিশেষ বিসিএসের উদ্যোগকে ইতিবাচক ধাপ হিসেবে দেখা হলেও গেজেট প্রকাশে বিলম্ব ও প্রশাসনিক জটিলতায় নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হলে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা আবারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুপারিশপ্রাপ্ত এক চিকিৎসক বলেন, ‘৪৮তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পরপরই মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চিকিৎসকদের নিয়োগ দিয়ে উপজেলায় প্রেরণ করা হবে’—এ ধরনের বিবৃতি প্রদান করেন। বিষয়টি মাথায় রেখে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত অনেক চিকিৎসক তাদের চাকরি থেকে ইস্তফা প্রদান করেন। এ ছাড়াও উত্তীর্ণ চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্সে (এফসিপিএস/এমডি-এমএস) রয়েছেন। তাদের অনেকেই বিসিএসে জয়েনের উদ্দেশ্যে উচ্চতর ডিগ্রি বন্ধ করে এখন বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই তাদের রাজধানীর ভাড়া বাসাগুলো ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়ায় দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে অন্য কোথাও স্থানান্তর হতে পারছেন না।’
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আহসান হাবীব বলেন, ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা চিকিৎসকদের আরও এক মাস আগেই আসার কথা ছিল। অক্টোবরের শেষ কিংবা নভেম্বরের শুরুতে তারা চলে আসার কথা। এই বিসিএস আয়োজনের জন্য কথা ছিল সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন হবে। এর আলোকে সব এগুচ্ছিল। দ্রুততম সময়ে সুপারিশ হয়ে গেল, তাহলে বাকি কাজগুলো নিশ্চয় এক মাসের মধ্যেই হওয়ার কথা। সেখানে প্রায় দুই মাস হয়ে যাচ্ছে।
হিমশিহ খাচ্ছেন তৃণমূলের কর্মরত চিকিৎসকরা
জানতে চাইলে ঘোড়াঘাট উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আহসান হাবীব বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক সংকটের কারণে আমরা শুধুমাত্র জরুরি এবং অন্তবিভাগে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। কর্তব্যরত চিকিৎসককে তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার চেয়েও অনেক বেশি কাজ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া বহির্বিভাগে আমাদের শুধুমাত্র সিএমও দিয়ে চিকিৎসা করতে হচ্ছে। সর্বোপরি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ ভয়াবহভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
১২ জনের জায়গায় সেবায় ২-৩ চিকিৎসক
তিনি বলেন, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসারের ১২ পদের বিপরীতে দুইজন কাজ করছেন। সর্বমোট মেডিকেল অফিসারের জায়গায় আছেন চারজন। একজন সংযুক্তিতে সিভিল সার্জন অফিসে কর্মরত আছেন। একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। গত ছয় মাস ধরে এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি। মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে একজন ফেরায় এ সংখ্যা এখন তিনজন হলো। আমরা শুধু জরুরি আর অন্তবিভাগ দেখছি।
প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন
ডা. মো. আহসান হাবীব বলেন, এটা করতে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। এটা সাধ্যের বাইরে। এভাবে কত দিন সম্ভব? রোগীর পরিমাণ অনেক বেশি। বহির্বিভাগে প্রায় চার-পাঁচশ’ রোগী। অন্তবিভাগে প্রতিদিন ৫০-৬০ জন ভর্তি থাকেন। ৩০-৪০ জন নতুন রোগী আসছেন।
‘সর্বশেষ ৪২তম স্পেশাল বিসিএসের পর ২০২২ সালে নতুন আটজন চিকিৎসক যোগ দেন। সব মিলিয়ে তখন দশজন চিকিৎসক এখানে কাজ করতেন। এর মধ্যে একজন সংযুক্তিসহ বাকি সবাই ট্রান্সফার হয়ে যায়। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে একজন, দিনাজপুর সদরে একজন, নীলফামারীর সৈয়দপুরে একজন, উচ্চশিক্ষায় একজন। এভাবে সাতজনই চলে গেছেন। ফলে এখানে চিকিৎসকের চরম সংকট বিরাজ করছে। প্রান্তিকের প্রায় সকল হাসপাতালেই অভিন্ন চিত্র’—যোগ করেন তিনি।
সেবা পেতে রোগীদের ভোগান্তি
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা জানান, ‘পঞ্চাশ শয্যার হাসপাতালে ১৭ জন চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু সেখানে মাত্র দুইজন চিকিৎসা দিচ্ছেন। সেবা নিতে আমাদের দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকে চিকিৎসক না পেয়ে সেবা না নিয়েই চলে যান।’
সদ্য পঞ্চাশ শয্যায় উন্নীত হওয়া কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবায় করুন চিত্র দেখা গেছে। এক শিফটে একজন চিকিৎসক থাকায় তিনি অন্তবিভাগ ও সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগে সেবা দিতে পারেন। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে কখনো ডিএমএফদের সেবা দিতে দেখা গেছে।
পদায়ন নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসকের বেতনের বিষয়টি পাস করেছে।
ডাক্তার নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলছে জানিয়ে সূত্রটি বলছে, অল্প কয়েকজন চিকিৎসকের পুলিশ ভ্যারিফিকেশন বাকি আছে, এটা সম্পন্ন হতে দেরি হবে না। সুতরাং পদায়নে অযথা বিলম্ব হচ্ছে, এই ধারণা ভুল। দাপ্তরিক কাজ আছে, আশা করা যায়, ডিসেম্বরে হয়ে যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ৪৮তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্তদের পদায়ন নতুন সরকার এলে দেওয়া হবে—বিষয়টি এ রকম না। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী দুজনই পদায়নের ব্যাপারে খুব আন্তরিক। উনাদের গ্রামের বাড়ি আছে, সেখানে নিজস্ব জায়গায় হাসপাতালে চিকিৎসকের সংকট আছে। মারাত্মক সংকট চলছে। এমনকি কর্মরত চিকিৎসকরা নতুন চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছে।
‘আমরা জনগণের সুবিধার্থে খুব দ্রুতই চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার পক্ষপাতী। এ নিয়ে সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই’—যোগ করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, নিয়মিত বিসিএসের বাইরে বিশেষভাবে চিকিৎসক নিয়োগ দিতে এ বছর ২৯ মে ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দুই মাসের কম সময়ের মধ্যে, গত ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষা।
এতে সহকারী সার্জন পদে চার হাজার ৬৯৫ জন এবং সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে ৫১১ জন প্রার্থী সাময়িকভাবে উত্তীর্ণ হন।
এরপর সম্পন্ন হয় ভাইভা কার্যক্রম। গত ৬ আগস্ট থেকে মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়, যা শেষ হয় সেপ্টেম্বরের শুরুতেই। সব প্রক্রিয়া শেষে ১১ সেপ্টেম্বর পিএসসি তিন হাজার ১২০ জনকে সাময়িকভাবে মনোনীত করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে। পরে গত মাসের মাঝামাঝিতে এ বিসিএসে আরো ৩৪৮ জনকে সুপারিশ করে পিএসসি।
এমইউ/