১৩ মে, ২০২৫ ০৫:০৬ পিএম

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের নাম পরিবর্তনের চেষ্টা: প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের নাম পরিবর্তনের চেষ্টা: প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের (এসএইচএসএমসি) নাম পরিবর্তনের চেষ্টার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আন্তর্জাতিক মান ও স্বীকৃতি অর্জনের পথে থাকা প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন এই মূহর্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অভিযোগ তাদের। বলছেন, এটি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করবে।

আজ মঙ্গলবার (১৩ মে) সকালে শিক্ষার্থীরা এসএইচএসএমসির নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানান। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাকি মোহাম্মদ জাকিউল আলম বরাবর স্বারকলিপিও দিয়েছেন তারা।

স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, ‘আমরা দেখছি, কিছু বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তনের চেষ্টায় লিপ্ত। এ প্রচেষ্টা শুধুমাত্র একটি নাম পরিবর্তন নয়—এটি আমাদের পরিচয়, ইতিহাস ও ভবিষ্যত প্রশ্নবিদ্ধ করার এক নগ্ন উদ্যোগ।’

এদিকে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ৬ মে বেগম খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার নাম পরিবর্তন করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ রাখে।

তবে এর আগেও নাম পরিবর্তন হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানটির। এর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৬৩ সালে আইয়ুব কেন্দ্রীয় হাসপাতাল হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নাম বদলে ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল’ রাখা হয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকার এটিকে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা পরের বছর কার্যকর হয়।

অধ্যক্ষের উদ্দেশ্যে স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ‘আপনার নেতৃত্বাধীন একাডেমিক কাউন্সিল কিংবা আপনার অফিস থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তাবনা বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আমরা সকল শিক্ষার্থী আপনার পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট ও লিখিত অবস্থান প্রত্যাশা করি, যেখানে এই নাম পরিবর্তনের চেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করা হবে।’

এসএইচএসএমসির একাধিক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে জানান, কোনো পূর্ব ঘোষণা বা আলোচনা ছাড়াই এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার অভাব প্রকাশ করে। ফলে কলেজের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করেন, এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তারা বলছেন, বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের (ডাব্লিউএফএমই) অধীনে দেশের মেডিকেল কলেজগুলো আন্তর্জাতিক মান ও স্বীকৃতি অর্জনের পথে রয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ইতোমধ্যে একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই মুহূর্তে নাম পরিবর্তন করলে তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করবে।

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ নামটি একটি ঐতিহাসিক পরিচয় বহন করে, যা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয় বরং একটি জাতীয় গর্বের প্রতীক। তাই নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তারা।

এ প্রসঙ্গে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাকি মোহাম্মদ জাকিউল আলম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা একটি স্মারকলিপি দিয়েছে, আমি কর্তৃপক্ষকে জানাবো। তবে এগুলো পুরোপুরি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যাপার। অধ্যক্ষ হিসেবে এটি আমার একার কোনো কাজ না। অন্যান্য মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তন হয়েছে সরকারের ইচ্ছাতে। কলেজের প্রশাসন চাইলো কি চাইলো না, তা তো অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপারই না। একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদন হোক বা না হোক, সরকারের ইচ্ছার উপরেই চলে।’

অধ্যাপক জাকিউল আলম গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর এসএইচএসএমসির অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান। এর আগে কলেজটির অধ্যক্ষ ছিলেন অধ্যাপক ডা. এবিএম মাকসুদুল আলম। গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মাকসুদুল আলম নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন বর্তমান অধ্যক্ষ। কলেজের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, শিক্ষার্থীদের এমন অভিযোগ সত্য কিনা—জানতে চাইলে এই মন্তব্য করেছেন তিনি।

অধ্যাপক সাকি মোহাম্মদ জাকিউল আলম বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর আগের অধ্যক্ষ কিছুদিন ছিলেন। তখন একাডেমিক কাউন্সিলে একটি প্রস্তাব এসেছিল যে এর নাম বেগম খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজ করতে হবে। তিনি থাকাকালীন সময়েই এটি হয়েছিল। তবে তিনি কী করেছেন, তা আমার বিস্তারিত জানা নেই।’

এ ছাড়া গত ৬ মে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ দিবসে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি কারো কারো আলোচনায় উঠে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে শিক্ষার্থীদের মনে হয়তো ভয় প্রবেশ করেছে যে, নাম পরিবর্তন হতে পারে; যা আসলে বায়বীয় কথাবার্তা। তবে এর আগে বেগম খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজ ছিল। ফ্যাসিবাদীরা এর নাম পরিবর্তন করে।’

একই সাথে কলেজের মান উন্নয়নেই সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে চান বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক জাকিউল আলম। তিনি বলেন, আমি চাই, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোনিবেশ করুক। আমি এ সমস্ত কাজে মনোযোগ না দিয়ে বেশি পরিমাণে কলেজ ও হাসপাতালের কার্যক্রমে মনোযোগ দিতে চাই।’

এমআই/এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : শহীদ সোহরাওয়াদী মেডিকেল কলেজ
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত