১৪ এপ্রিল, ২০২৫ ০৬:৩১ পিএম

চিকিৎসকদের নববর্ষ ভাবনা: রোগীর মাঝেই খোঁজেন উদযাপনের আনন্দ

চিকিৎসকদের নববর্ষ ভাবনা: রোগীর মাঝেই খোঁজেন উদযাপনের আনন্দ
ডা. নুসরাত ইয়াসমিন পিয়া, ডা. ফারিয়াজ তাসনিম ঐশী, ডা. মো. রাইয়ান রহমান অর্নব, ডা. মো. মতিউর রহমান ও ডা. ইমরানুল ইসলাম (বাঁ থেকে)। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: নূতনের কেতন উড়িয়ে বঙ্গাব্দ পা রেখেছে ১৪৩২ এর ঘরে। দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ, নেচে-গেয়ে বর্ষবরণ করছে দেশবাসী। কিন্তু অন্য দশজনের মতো এভাবে উদযাপন করতে পারেন না চিকিৎসকরা। কর্তব্যনিষ্ঠা আর সেবার শপথে হাসপাতাল আর রোগীর মধ্যেই তারা আনন্দ খোঁজেন, অনুভব করেন অনাবিল প্রশান্তি। এর মধ্যেই মিলিয়ে যায় পরিবার নিয়ে উদযাপন না করতে পারার বেদনা।

আজ ১৪ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষে এমন অনুভূতির কথাই তুলে ধরেছেন চিকিৎসকরা। বলছেন, রোগীর সেবাই চিকিৎসকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন বর্ষে স্বাস্থ্যখাত ও ব্যক্তিগত প্রত্যাশার কথাও ব্যক্ত করেছেন তারা।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে প্রশিক্ষণরত বারডেম ইনস্টিটিউটের জেনারেল সার্জারি বিভাগের ফেজ-বির রেসিডেন্ট ডা. নুসরাত ইয়াসমিন প্রিয়া মেডিভয়েসকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের সব কিছুই হাসপাতাল ও রোগীকেন্দ্রিক। যদি বলেন, নববর্ষকে কীভাবে দেখছি? তাহলে বলবো, হাসপাতালকে দিয়েই আমাদের শুরু। আমরা আসি, আমাদের রোগীরা কেমন আছে দেখার জন্য। হাসপাতাল নববর্ষ হিসেবে ওয়ার্ডগুলো সাজানোর চেষ্টা করে, খাওয়া-দাওয়ার সরবরাহের চেষ্টা করে। এভাবে রোগীদের মাঝেই আমাদের আনন্দ।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারকে সময় দিতে না পারার কথা যখন চিন্তা করি, তখন আসলে খারাপ লাগে। আমার সাড়ে তিন বছরের একটি বাচ্চা আছে, বাবা-মাও পাশের একটি ফ্ল্যাটে থাকে। চিন্তা ছিল আজকে সবার মতো পান্তা-ইলিশ দিয়ে উদযাপন করার এবং বাচ্চাকে নিয়ে বের হওয়ার। কিন্তু ডিউটি চলাকালে তাকে এখানে নিয়ে আসা সম্ভব না। কিছু করার নেই, জেনে-শুনেই এ খাতে আসা। এখানেও তো আমার জন্য অনেক মানুষ (রোগী) অপেক্ষা করে আছে, আমি আসবো, তাদেরকে দেখবো। এ চিন্তা করেই ত্যাগ করতে হয়। ওর বাবাকে বলে আসছি আশেপাশে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে।’

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ডা. নুসরাত ইয়াসমিন প্রিয়া আরও বলেন, ‘আমার স্বামী নন-মেডিকেল পার্সন। এজন্য প্রথম দিকে সে মন খারাপ করতো। বলতো, কী চাকরি করো, ঈদের দিনেও যেতে হয়। যেমন—ঈদের পরের দিন আমার নাইট ডিউটি ছিল। ও বলছে, ঈদের দিন নাই, একটু পরিবারের সাথে ঈদ করবো, আবার তোমার সাথে চলে আসা লাগে। তবে থাকতে থাকতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়। আজ আসার সময় কিছু বলেনি। বুঝে গেছে, বলেও লাভ নেই।’

ঢামেক হাসপাতালের ক্যাজুয়াল্টি বিভাগে প্রশিক্ষণরত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) জেনারেল সার্জারি বিভাগের রেসিডেন্ট (এমএস ফেজ-বি) ডা. ইমরানুল ইসলাম বলেন, ‘চিকিৎসকরা সব সময় রোগীদের পাশে থাকি। ঈদ বলেন, সাপ্তাহিক ছুটি বলেন আর পহেলা বৈশাখ; আমরা রোগীদের সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করছি। মূলত, চিকিৎসকদের মন-মানসিকতাটিই এ রকম যে, যে কোনো রোগী যে কোনো সময়েই আসুক, আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগছে। কেননা সরকারি ছুটির দিনেও ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমি চিকিৎসাসেবা দিতে পারছি, আমার অর্জিত জ্ঞানটুকু মানুষের সেবায় প্রয়োগ করতে পারছি। এটি মানসিকভাবে আমাকে প্রশান্তি দেয়। মনে হচ্ছে, আল্লাহ কিছু না কিছু বিনিময় দিবেন। এজন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি আমি।’

একই বিভাগে কর্মরত ইউরোলজি বিভাগের রেসিডেন্ট (ফেজ-এ) ডা. মো. রাইয়ান রহমান অর্নব বলেন, ‘এ বছরে মানুষের ভেতর স্বস্তি দেখেছি। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন করছেন। সকাল থেকেই ডিউটিতে আছি, মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তই দেখছি। এটি ভালো এবং সুস্থভাবে হোক, এটি আমাদের চাওয়া।’

নতুন বছরে হাসপাতালে আরও সুন্দর ও সুষ্ঠু সেবার পরিবেশ প্রত্যাশা করেন তিনি। বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাত খুবই সংবেদনশীল বিষয়। এ খাতের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাই জড়িত। কেউ একজন না থাকলেই স্বাস্থ্যখাত ভেঙে পড়ে। এক্ষেত্রে সবাইকে আরেকটু সচেতন হতে হবে। ঊর্ধ্বতন মহল থেকেও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানো যেতে পারে। আর রোগীদের সর্বোচ্চ যে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, সেটিই আমরা দিচ্ছি। তবে তা যেন আরও সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে দেওয়া যায়, এটিই চাই।’

অন্য দশজনের মতো নববর্ষ উদযাপনের সুযোগ না পাওয়া মন খারাপের কোনো বিষয় নয় বলে মনে করেন ডা. ফারিয়াজ তাসনিম ঐশীবিএমইউর এই রেসিডেন্টও (ফেজ-এ) ঢামেকের ক্যাজুয়াল্টি বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকেই আমার ডিউটি ছিল। একদম স্বাভাবিক দিনের মতো। নববর্ষে সবার আকাঙ্ক্ষা থাকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে উদযাপন করার। চিকিৎসক হিসেবে সব সময় সে সুযোগটা হয়ে উঠে না। কিন্তু এটি মন খারাপের কোনো বিষয় না, কারণ আমরা যখন শপথগ্রহণ করি—তখন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই থাকি যে, মানুষের সেবা দিয়ে যাবো আজীবন। এজন্য আমার নিজে থেকে গর্ববোধ হয়, আমি এমন একটি অবস্থানে আছি যেখানে সাধারণ জনগণ আমার কাছ থেকে সেবা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।’

এবারের বর্ষবরণ ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ডা. ঐশী বলেন, ‘মানুষের উদযাপন-উচ্ছ্বাস আগের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া বিগত বছরগুলোতে নববর্ষ উদযাপন হয়নি, তারপরে ঈদপরবর্তী একটি অনুষ্ঠান এসেছে। তাই আগের চেয়ে অনেক বেশি উদযাপিত হচ্ছে।’

নতুন বছরে নিজের পেশার আরও বিস্তৃতি চান ডা. ঐশী। বলেন, ‘বাংলাদেশের একজন চিকিৎসক হিসেবে জনগণের সুবিধার স্বার্থে আমার প্ল্যাটফর্মটি যাতে আরও বিস্তৃতি হয়, কাজ করার পরিধি যাতে বেড়ে যায়, বিস্তৃত পরিসরে আমি যেন কাজ করতে পারি, সেই সুযোগ-সুবিধাটি যেন সরকার থেকে আমাদের দেওয়া হয়। সাথে আমাদের লোকবল ও প্রযুক্তি লাগবে, একই সাথে অবকাঠামো। এদিকে যেন নজর দেওয়া হয়।’

‘একই সাথে প্রাইভেট রেসিডেন্ট হিসেবে আমাদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন ভালোভাবে চালানোর জন্য ভাতাটা যদি বাড়ানো যায়, বিসিএসের স্বাস্থ্য ক্যাডারের তুলনায় আমরা কিন্তু অবহেলিত। এটুকুই প্রত্যাশা আমাদের। পহেলা বৈশাখের জন্য প্রাইভেট ট্রেইনিরা উৎসব ভাতা পান না। সরকারি চিকিৎসকরা পান। নির্ধারিত একটি ভাতা দেওয়া হয়, তবে আরেকটু বাড়ানো গেলে ভালো হতো’—যোগ করেন তিনি।

ঈদ-নববর্ষ কিংবা যেকোনো উৎসব হোক, কাজ করতে ভালোবাসেন নিউরোসার্জারির এফসিপিএস পার্ট-২ প্রশিক্ষণার্থী ডা. মো. মতিউর রহমান। মেডিভয়েসকে তিনি বলেন, ‘কাজ ভালোই লাগে। সবই তো সেবামূলক কাজ, তবে আমাদের ক্ষেত্রে মানুষের সেবা করার সুযোগ পাওয়া অনেক বড় একটি বিষয়, অনেক প্রাপ্তির বিষয়। মাঝে মাঝে মনে হয় ছুটির দিনগুলো যদি কাজ না থাকতো। মনে হলে একটু বিষণ্ণ হই, হতাশা কাজ করে। এই বিষয়গুলো থাকবেই। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে কাজ করতে হবে। রোগীদের কাছে যখন প্রতিক্রিয়া পাই, তখন এটি ভুলে যাই। রোগীকে ভালো হতে দেখছি, এটিও নিজের কাছে অনেক বড় একটি তৃপ্তি।’

নববর্ষে ডা. মতিউর রহমানের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্যখাতকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ যেন নেওয়া হয়।

এনএআর/এমইউ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক