২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫ ০১:৫৮ পিএম
৮-১০ মার্চ দুই ঘণ্টা, ১১ মার্চ থেকে পূর্ণ কর্মবিরতি

পদোন্নতির জন্য সাত দিনের আল্টিমেটাম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের

পদোন্নতির জন্য সাত দিনের আল্টিমেটাম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন করে দ্রুততম সময়ে পদোন্নতির দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এজন্য এক সপ্তাহ সময় বেঁধে দিয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী ৮ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করবেন তারা। এতে কর্তৃপক্ষের টনক না নড়লে ১১ মার্চ থেকে পূর্ণ কর্মবিরতিতেও যাবেন তাঁরা। তবে এই সময়ে জরুরি সেবা অব্যাহত থাকবে।

আজ মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডিরেক্টর কনফারেন্স রুমে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফোরাম আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে তাঁরা এসব কথা জানান।

চিকিৎসকরা জানান, যৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়ে বারবার বিভিন্ন কর্তপক্ষের দ্বারস্থ হওয়ার পরও মিথ্যা আশ্বাসে পদোন্নতি আটকে রাখা হচ্ছে। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে কর্মবিরতির মতো চরম কর্মসূচিতে যাচ্ছেন তারা। ঘোষিত কর্মসূচির সময় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে এর দায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।

তারা আরও জানান, কাজের মান বৃদ্ধি ও গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিসিএস স্বাস্থ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চাকরির নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর পদোন্নতি দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস এবং ফাউন্ডেশন ট্রেনিং সম্পন্ন করা থাকলে চাকরি স্থায়ী হয়। চাকরি স্থায়ী এবং চার বছর পূর্ণ হলে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যায়। উত্তীর্ণরা পদোন্নতির জন্য যোগ্য বিবেচিত হন। কিন্তু স্বাস্থ্য ক্যাডারের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (এফসিপিএস/এমডি/ডিপ্লোমা) অর্জনের বাধ্যবাধকতা, যা মোটেও কোনো সহজসাধ্য ব্যাপার নয়।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ক্যাডারে অবহেলা ও সংকটের কারণ তুলে ধরার পাশাপাশি দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের দাবি জানান চিকিৎসকরা। লিখিত বক্তব্যে স্বাস্থ্য ক্যাডারে অবহেলা ও সংকটগুলো তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—

১. স্বাস্থ্য প্রশাসন বিসিএস ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি না দিয়ে, ‘পদ নাই পদোন্নতি নাই নীতি মেনে চলা।’

২. নতুন নতুন মেডিকেল ডেন্টাল কলেজে শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি এবং পুরনো মেডিকেল কলেজে শিক্ষক অনুপাতে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বে ও নতুন পদ সৃষ্টি না করা।

৩. চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ নবীন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বরাবরই হেলাফেলার দৃষ্টিতে দেখে থাকেন।

৪. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির জন্য যে ভর্তি পরীক্ষা হয়ে থাকে, সেখানে বাস্তবতার নিরিখে আসন সংখ্যা দেশে নির্ধারিত হয় না।

৫. বিভিন্ন বিষয়ে পদোন্নতির অসামঞ্জস্য, যেমন—কোন সাবজেক্টে সরাসরি সহকারী অধ্যাপক আবার কোন সাবজেক্টে আরপি/আরএস>জুনিয়র কনসালটেন্ট সহকারী অধ্যাপক। এর ফলে অন্তঃক্যাডার বৈষম্য তৈরি হয়। কোনো সাবজেক্টে আবার ৬ষ্ঠ গ্রেডের তেমন পদই নেই, যেমন—ডেন্টাল।

৬. কিছু বিশেষ ক্যাডারের চাকরিতে নির্দিষ্ট সময়কাল পর ২য় ও ১ম গ্রেড প্রাপ্ত হয়, কিন্তু স্বাস্থ ক্যাডারকে কোনো কারণ ছাড়াই এ থেকে বঞ্চিত করা হয়। 

বক্তারা বলেন, স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিদ্যমান বৈষম্যের কারণে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সেবা খুবই ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলমান কিছু সংকট তুলে ধরেন তারা।

১. কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতিসহ যথাযথ সম্মানের অভাবে সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, যা এদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অন্তরায়।

২. বিদ্যমান ৩৭টি মেডিকেল কলেজে নানা স্পেশালিটির চিকিৎসক সংকটের কারণে চিকিৎসা শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। এতে কর্মদক্ষ এমবিবিএস, বিডিএস ও পোস্ট গ্রাজুয়েট ডাক্তার তৈরি হবে না।

৩. উন্নত চিকিৎসার প্রায়োগিক দিকে শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ার ফলে দেশের অর্থ বিদেশে চিকিৎসায় ব্যয় হয়। 

৪. প্রশাসনিক পদোন্নতি পেয়ে জুনিয়র বিসিএসের যারা ইউএইচএফপিও হয়েছেন, সিনিয়র এবং সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন চিকিৎসকদের। এতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ অসম্মানিত বোধকরে থাকেন, যা কাজের স্পৃহা কমায়। 

৫. বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রমোশন না পাওয়ায় উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করার পরেও মেডিকেল অফিসার হিসেবে হেলথ কমপ্লেক্সে কাজ করায়, তাদের মেধার অপচয় হয়ে ও দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে।

৬. পদোন্নতির বৈষম্যের কারণে চরম বিষন্নতার শিকার হচ্ছেন যোগ্য প্রার্থীগণ। এতে স্বাস্থ্য ক্যাডারের অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির সমন্বয়ের অভাবে ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চেইন অব কমান্ড ব্যাহত হচ্ছে।

এ সময় এই ভয়াবহ সমস্যার সমাধানে সম্ভাব্য উপায়সহ নিজেদের দাবি তুলে ধরেন বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. মো. বশীর আহম্মেদ খান। ফোরামের দাবিগুলো হলো—

১.  বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে বিভিন্ন কারণে পদোন্নতি বঞ্চিত চিকিৎসকদের ভূতাপেক্ষিকভাবে পদোন্নতি দিতে হবে।

২. যেহেতু পদোন্নতি প্রার্থীর সংখ্যা এত বেশি যে শুধুমাত্র পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে জনগণের চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে নানা বিষয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক নতুন পদ সৃষ্টি করা।

৩. সম্ভাব্য নতুন পদের জন্য বর্তমানে আবেদনকারীদের মধ্য থেকে অধিক সংখ্যায় ভূতাপেক্ষভাবে পদের অতিরিক্ত পদোন্নতি বা সুপারনিউমারারি বা ইনসিটু পদোন্নতি দিয়ে বিদ্যমান জট কমিয়ে জনগণের স্বাস্থ্যসেবার পথ সুগম করা।

৪. সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সকল বিষয়ে দ্রুত ও জরুরি ভিত্তিতে সহকারী/সহযোগী/অধ্যাপক পদে ভূতাপেক্ষভাবে সুপারনিউমারারি পদোন্নতি ও প্রয়োজনে ইনসিটু পদোন্নতি দেওয়া।

৫. যেহেতু প্রতি বছর অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অবসরে যান এবং মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে মেডিকেল শিক্ষার্থী ও পোস্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পায়, সেহেতু প্রতি বছর অন্তত দুইবার পদোন্নতির নিয়ম চালু করা এবং আন্ত ও অন্তঃক্যাডার বৈষম্য কমিয়ে আনতে একটি যুগোপযোগী পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়ন করা।

ডা. মো. বশীর আহম্মেদ খান বলেন, ‘যেহেতু পদোন্নতির সকল শর্ত পূরণ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ে সকল ফাইল বারবার আপডেটের পরও বছরের পর বছর মিথ্যা আশ্বাসে পদোন্নতি আটকে রাখা হয়েছে, এখন আমাদের এক দফা এক দাবি—আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পদোন্নতির যোগ্য সকল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পদোন্নতি না দিলে আগামী ৫ মার্চ থেকে সারা বাংলাদেশের সকল হাসপাতালের সকল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রতিদিন সকাল ৯-১১টা ২ ঘণ্টা কলম বিরতি পালন করবো।’

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের ৬০টি সোসাইটি একাত্মতা ঘোষণা করেছে। এতে উপস্থিত ছিলেন ৩০টি সোসাইটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। 

এমইউ/এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক