স্বাস্থ্যখাত নিয়ে যেসব সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ক্যাডারভুক্তি বাতিল করে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস গঠন, জনবল কাঠামো ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পুনর্গঠন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনসহ স্বাস্থ্য খাতে ২৩টি বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। আজ শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে গত বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দেন কমিশন প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী। একই দিন আরও পাঁচটি সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে রাখা হয়েছে ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস সংস্কারে বিশেষ সুপারিশমালা’। এ সুপারিশমালায় মোট ২৩টি সুপারিশ রয়েছে। সুপারিশগুলো হলো—
পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন
প্রতিবেদনের চতুর্থ অধ্যায়ে বিসিএস ক্যাডারের পরিবর্তে প্রত্যেক সার্ভিসের বৈশিষ্ট অনুযায়ী নামকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের পরিবর্তে স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস’ নামকরণ করা হবে। ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস-এ’ জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি পরীক্ষা ইত্যাদি কাজ সম্পাদনের জন্য আলাদা একটি পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন করার সুপারিশ করা হলো। বিষয়টি নিয়ে পুঙ্খানুপুংখরূপে আলোচনার জন্য উচ্চ পর্যায়ের একটি টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করা হলো।
স্বাস্থ্য সার্ভিসের জনবল কাঠামো পুননির্ধারণ
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিসের জনবল কাঠামো পুনঃনির্ধারণসহ বিভিন্ন দিক বিশেষ করে বৃহদাকার জনবলের বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি কমিটি গঠন করে সার্ভিসের জনবল কাঠামো পুনঃনির্ধারণের প্রস্তাব তৈরি করা যেতে পারে এবাং প্রস্তাবিত স্থায়ী জনপ্রশাসন সংষ্কার কমিশনের নিকট প্রস্তাব পাঠানো যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পুনর্গঠন
স্বাস্থ্য সার্ভিসের জনবল কাঠামো পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত। এই ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করলে দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ সমস্যার সমাধান হবে এবং উভয় শাখার দক্ষতা ও ফোকাস উন্নত হবে, যা শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।
ক্যারিয়ার প্লানিং ও ডেপুটেশন পলিসি
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিসের সকল স্তরের জনবলের জন্য একটি ক্যারিয়ার প্লানিং প্রণয়ন করা যেতে পারে। পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য সেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-এরূপ তিনটি শ্রেণি বিভাজন করা হলে ক্যারিয়ার প্লানিং সহজ হবে। ডেপুটেশন পলিসি-তে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে বিবেচনা করতে হবে—
১. এমবিবিএস পরীক্ষার রেজাল্ট।
২. ইন্টার্নশীপ ও গ্রামে অবস্থানকালীন কর্মক্ষমতা (পারফরমেন্স)। ই-লগবুক এর মাধ্যমে মাধ্যমে মূল্যায়ণ করা হলে চিকিৎসকরা গ্রামে সেবা দিতে উৎসাহিত হবে।
৩. স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চাহিদাভিত্তিক বিষয় প্রদান করা।
৪. প্রার্থীর পছন্দ।
লাইন প্রমোশন
স্বাস্থ্য সেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-এরূপ তিনটি বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য লাইন প্রমোশন দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পদসোপান তৈরি করা যেতে পারে। এ তিনটি পদসোপানের মধ্যে সম্পর্ক কী হবে তা নিয়ে অধিকতর আলোচনার প্রয়োজন হবে।
সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিসে প্রবেশের সুযোগ
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন কর্তৃক সুপারিশকৃত ‘সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিসে প্রবেশের জন্য অন্যান্য সার্ভিসের মতো স্বাস্থ্য সার্ভিসের কর্মকর্তারাও প্রতিযোগিতামুলক পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ পাবেন।
প্রাথমিক নিয়োগের বয়সসীমা বৃদ্ধি
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিসে প্রাথমিক নিয়োগের বয়সসীমা দুই বছর বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
মেডিকেল কলেজ ও শিক্ষার্থী সংখ্যা যৌক্তিকীকরণ
দেশের জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় রেখে মেডিকেল কলেজ ও শিক্ষার্থী সংখ্যা সম্পদ প্রাপ্তি সাপেক্ষে যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই বিবেচনায় বিদ্যমান কলেজগুলোর মানোন্নয়নের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্য শিক্ষায় শিক্ষকের ঘাটতি পূরণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হলো।
সাংগঠনিক ও জনবল কাঠামো এবং একাডেমিক ও সার্ভিস হাসপাতাল পৃথকীকরণ
স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগকে পরিপূর্ণভাবে বিভাজন করে দেশের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাডেমিক ও সার্ভিস হাসপাতাল-এরূপ দু’ভাবে ভাগ করে তাদের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ স্ব স্ব বিভাগের অধীনে ন্যস্ত করা যেতে পারে। সকল স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্য শশক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক ও জনবল কাঠামো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা জরুরি।
ঢাকার বাইরে বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান
বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকার বাইরের স্থানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবল নিয়োগ
কোনো নতুন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পূর্বেই প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবল নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত।
উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ
উপস্থিতি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ডিজিটাল হাজিরার পাশাপাশি সরেজমিনে তদারকি বাড়াতে হবে। বিধিবহির্ভূতভাবে কেউ অনুপস্থিত থাকলে বিধি মোতাবেক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গ্রাম এলাকায় চিকিৎসক পদায়ন
সরকারি চিকিৎসকদের উচ্চ শিক্ষার জন্য যথাযথ নির্দেশনার অভাব গ্রামীণ এলাকায় কর্মরত থাকা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ডেপুটেশন পলিসি, পদায়ন ও পদোন্নতিতে গ্রাম এলাকায় কর্মরত থাকার বিষয়টি ই-লগবুকের মাধ্যমে সমতার ভিত্তিতে করা গেলে বিষয়টির কিছুটা সূরাহা হবে বলে আশা করা যায়। গ্রামীণ সেবা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য কৌশলগত কর্মশক্তি পরিকল্পনা এবং নীতি সংষ্কারে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
প্রশিক্ষণ নীতিমালা
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চাহিদা অনুযায়ী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া উচিত। একটি প্রশিক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে কর্মকর্তারা জাতীয় স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেবেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে নয়।
অধিকতর স্বায়ত্বশাসন
বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বায়ত্বশাসন দেওয়া যেতে পারে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়ন করা যেতে পারে।
সিএসআর কর্মসূচি
দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজগুলোকে তাদের সিএসআর কর্মসূচি হিসেবে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ প্রদানের আহ্বান জানানো যেতে পারে।
রোগীর সংখ্যা অনুপাতে বাজেট বরাদ্দ
সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যার পরিবর্তে চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগীর সংখ্যা অনুপাতে বাজেট বরাদ্দ করা যেতে পারে।
দালালদের দৌরাত্ম অবসান
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম অবসানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। প্রতিটি হাসপাতালের সেবা সমূহকে র্পূণ অটোমেশনের আওতায় আনতে হবে। প্রতিদিন কতটি বেডে কতজন রোগী আছে তা ড্যাশবোর্ডে (ডিজিটাল) টানিয়ে দিতে হবে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন
চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীদের স্বার্থে ভারসাম্য রেখে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা যেতে পারে।
ল্যাবরেটরিগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত ল্যাবরেটরিগুলোর মান গ্রহণের জন্য একটি রেগুলেটরী কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
ফিজিওথেরাপি বিভাগ এবং ফিজিওথেরাপিষ্ট পদ সৃষ্টি
দেশের সকল সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, আইএইচটি এবং সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সদর বা জেনারেল হাসপাতালসমূহে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য ফিজিওথেরাপি বিভাগ এবং ফিজিওথেরাপিস্ট পদ সষ্টির সুপারিশ করা হলো। এ সম্পর্কিত একটি সাংগঠনিক ও জনবল কাঠামো সংযুক্তি-১১ তে রাখা হয়েছে।
কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালনা
গ্রাম পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য খাতে নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। সরকার কতগুলো সুনির্দিষ্ট শর্তে বাজেট বরাদ্দ দিয়ে কেন্দ্রগুলো পরিচালনা আউটসোর্স করবে। উপজেলা নিবার্হী অফিসার, স্বাস্থ্যকর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ বেসরকারি সদস্য নিয়ে একটি কমিটি এনজিওগুলোর কাজ তদারকি করতে পারেন।
স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যা বলছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের সংবিধান, জাতীয় নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারসমূহ যেমন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) আলোকে বাংলাদেশ সরকার সকল নাগরিকের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিদ্যমান অনেক ধরণের প্রতিবন্ধকতা মানসম্মত ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষ ও সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠী। একদিকে, যথাযথ ও মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা না থাকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে, মানসম্মত প্রশিক্ষণের অভাবে মেধা চর্চা ব্যাহত হওয়ায় দক্ষ সেবাদানকারী চিকিৎসক, চিকিৎসা শিক্ষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য প্রশাসক তৈরি হচ্ছে না।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, যেমন গড় আয়ু বৃদ্ধি, যা মূলত টিকাদান, পুষ্টি কর্মসূচি, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, এবং স্বাস্থ্য নির্ধারক উন্নতকরণসহ জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নাগরিক সন্তুষ্টি এখনও কাঙ্খিত মানের নয় যা সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রায়শই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব বা অন্যান্য জটিল কারণে চিকিৎসা নিতে বিদেশে চলে যায়। এর ফলে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা চলে যায়। চিকিৎসা শিক্ষা ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান, সুষম ব্যবস্থাপনা, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলামের অভাবে দক্ষ ও মানবিক চিকিৎসক তৈরি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এ কারণে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশন (ডব্লিউএফএমই) বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজসমূহের এক্রিডিটেশন বন্ধ রেখেছে। এর ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ ব্যাহত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার কাজ শুরু করা দরকার।
কমিশন বলছে, স্বাস্থ্য খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত বিধায় সেখানেও ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক চ্যালেঞ্জগুলো সমাধানের জন্য একটি আলাদা কমিশন কাজ করছে, তবে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বিশেষ কিছু সুপারিশ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।
জনপ্রশাসন সংষ্কার কমিশন মনে করে, স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে অধিকতর জনবান্ধব, যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করা এবং মানব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে রোগীদের সেবার মান উন্নীত করার লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার করা প্রয়োজন। যেহেতু স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন কাজের সাথে জনপ্রশাসনের একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে সেহেতু এ কমিশন স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের জন্য কিছু সুপারিশ প্রণয়ন করা জরুরি বিবেচনা করছে। উদাহরণ স্বরূপ- স্বাস্থ্য খাতের শুধু চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কাজ সম্পাদনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থাপনার বিষয় রয়েছে। এ বিরাট কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য বিদ্যমান কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জনবল কাঠামোর একটি চিত্র তুলে ধরে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মোট সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা হচ্ছে ১১০টি, ডেন্টাল কলেজ ১৩টি, ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) ১২৮টি, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) ২১৬টি, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক কলেজ পাঁচটি এবং পোস্ট-গ্রাজুয়েট প্রতিষ্ঠান ২৩টি। অপরদিকে, প্রতিটি জেলা সদরে ৬৫টি সিভিল সার্জন অফিস ও হাসপাতাল, ৪৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১৪ হাজার ৩৫৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ১৮টি স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট স্বাস্থ্য সেবার কাজে নিয়োজত আছে। অপরদিকে, তিন হাজার ২৯০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ২৮৮টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, চারটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও চারটি পরিবার কল্যাণ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কমিশন বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ছয়টি মূল অংশ চিহ্নিত করেছে—নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা, সেবা প্রদান, স্বাস্থ্যকর্মী (এইচডব্লিউএফ), অর্থায়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্তি এবং স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থা। এ উপাদানগুলোর কার্যকারিতা সম্মিলিতভাবে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক শক্তি এবং দুর্বলতা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী, টেকনোলজিষ্ট, ফার্মাসিষ্ট, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, সেবাদানকারী এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহায়তাকারী কর্মী। এরা সবাই সেবা প্রদান এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যান্য অংশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে, কাঠামোগত সমস্যার কারণে তাদের কর্মক্ষমতা প্রায়ই প্রত্যাশিত মানের নিচে থাকে। বাংলাদেশের সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য খাতে প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত অনুমোদিত পদ দুই লক্ষ ৩৬ হাজার ৮২৮ টি। এর মধ্যে কর্মরত মোট জনবল হচ্ছে এক লক্ষ ৭৩ হাজার ২৬১। মোট ৬৩ হাজার ৫৭১টি পদ শূন্য রয়েছে, যা মোট পদের শতকরা ২৭ ভাগ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দেশের অন্যতম বৃহৎ নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, যা একটি বিশাল স্বাস্থ্যকর্মী দলের ব্যবস্থাপনা করে থাকে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বর্তমানে (২০২৪) নিয়োজিত মোট চিকিৎসক হচ্ছে ৩৪ হাজার ৪৩৫ জন। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে রয়েছে আরো এক হাজার ১২০ জন কর্মকর্তা ও ২৩ হাজার ৫০০ জন পরিবার কল্যাণ সহকারী। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৭৪৩ জন হচ্ছেন বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তা।
স্বাস্থ্যকর্মী পরিচালনার চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও বর্তমান কাঠামো কিছুটা ভারি বলে মনে হয় এবং এর পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে, স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজনীয়তা উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যার মধ্যে রয়েছে কর্মীর ঘাটতি, উচ্চ শূন্যপদের হার, গ্রামীণ-শহুরে বৈষম্য এবং ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা। এ চ্যালেঞ্জগুলো বিশেষ করে গ্রামীণ এবং সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে দুটি পৃথক বিভাগে ভাগ করা হয়—স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ। এ বিভাজন ব্যবস্থাপনার উন্নতি করার পরিবর্তে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি করেছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, প্রথমত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পূর্বের মত বহাল রেখেছে। অপরদিকে, চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ চিকিৎসা শিক্ষা এবং পরিবার পরিকল্পনার জন্য দায়িত্ব পালন করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বিভাগগুলো স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে, তাদের নিজস্ব বাজেট এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে। কোনো বিষয়ে একাধিক বিভাগের জড়িত থাকলে আন্তমন্ত্রণালয় আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পূর্বে, এ ধরনের পদায়ন আন্তমন্ত্রণালয় আলোচনার প্রয়োজন হতো না। নতুন এ ব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জটিলতা বেড়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিভাজন থেকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ উদ্ভূত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়, বিভাজনের ফলে নির্দিষ্ট কিছু শাখায় নতুন পদ তৈরি হয়েছে, যা জনসাধারণের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, তবে এর সাথে কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়নি। দ্বৈত রিপোর্টিং লাইন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। দুই বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে ষ্পষ্ট বিভাজনের অভাব রয়েছে। এ অস্পষ্টতা ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নে অদক্ষতাকে বাড়িয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামোর অনুলিপি তৈরি করার ফলে সম্পদের ওপর চাপ পড়েছে। বিভাগের ওভারল্যাপিং ভূমিকা সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অপারেশনাল প্রক্রিয়াগুলোতে বিলম্ব এবং অদক্ষতা সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে ১১.৭০ জন চিকিৎসক (জুন ২০২২) কর্মরত ছিলেন। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ডব্লিউএইচওর সুপারিশ মোতাবেক প্রতি ১০ হাজারে ২০২৫ সালে ৩১.৫ এবং ২০৩০ সালে ৪৪.৫ জন চিকিৎসক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় থাকার কথা বলা হয়েছে। চাহিদা মোতাবেক উৎপাদনে অক্ষমতা, সময় উপযোগী নীতিমালার অভাব এবং উপলদ্ধতার সীমাবদ্ধতার কারণে অল্প সময় বা মাঝারি সময়ের মধ্যে এ অনুপাত অর্জন করা কঠিন হতে পারে। তদুপরি, কর্মীদের বিতরণেও বৈষম্য রয়েছে, যেখানে শহুরে এলাকায় প্রতি এক হাজার ৫০০ জনে একজন চিকিৎসক পাওয়া যায়, কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় এই অনুপাত ১৫ হাজারে একজন। এ অসমতা স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং গ্রামীণ জনগণের কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত করে।
এ ছাড়া অনেক পদ দীর্ঘ সময় ধরে শূন্য থাকে উল্লেখ করে বলা হয়, একটি রিপোর্ট (এইচএলএমএ,২০২১) অনুযায়ী অনুমোদিত পদের বিপরীতে জেনারেল ফিজিসিয়ান এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি যথাক্রমে ২৫শতাংশ এবং ৫৮শতাংশ। নিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতা, স্বচ্ছতার অভাব, পদায়ন ও পদোন্নতিতে স্থবিরতা এবং আইনি জটিলতার কারণে বিদ্যমান কর্মীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং সেবার মান কমে যাচ্ছে।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে গ্রামীণ-শহুরে বৈষম্য রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলগুলোতে কর্মী সংখ্যা অনুমোদিত পদের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি, যেখানে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে তীব্র কর্মী সংকট বিদ্যমান। অনেক উপজেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে, যা ২৪/৭ জরুরি মাতৃ ও নবজাতক সেবা প্রদানের ক্ষমতা সীমিত করে।
অনেক সংখ্যক সরকারি চিকিৎসক ব্যক্তিগত অনুশীলনে নিযুক্ত হন, যা অনেক ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টার অপচয় ঘটে। একে ‘দ্বৈত অনুশীলন’ উল্লেখ করে এ বিষয়ে পরিষ্কার নীতিমারা তৈরি করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিশাল জনগোষ্ঠিকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে ইনস্টিটিটিউশনাল প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা করা দরকার।
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতৃত্ব এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতিও রয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা, বিশেষ করে অফিস প্রধানরা, ক্রয় এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। এর মূল কারণ হচ্ছে ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব দক্ষতা তৈরিতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বলছে, স্বাস্থ্য খাতের সংষ্কারের জন্য মতবিনিময় ও সমীক্ষা পরিচালনা করেছে এ কমিশন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, সরকারি ইনস্টিটিউটসমূহের প্রতিনিধি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের দুইজন প্রতিনিধির এক মতবিনিময় সভার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সভায় সকল অধিদপ্তরের পক্ষে মোট পাঁচটি উপস্থাপনা পেশ করা হয়।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক স্বাস্থ্য সার্ভিস সংষ্কার বিষয়ে একটি যৌথ সমীক্ষা পরিচালিত হয়। সমীক্ষায় স্বাস্থ্য সার্ভিসের বিভিন্ন পর্যায়ের মোট দুই হাজার ৫২৯ জন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সমীক্ষার ফলাফল নিম্নরূপ—
১. মোট শতকরা ৭১ ভাগ চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপক মনে করেন যে, স্বাস্থ্য খাত সংষ্কারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার গুনগত মানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব।
২. শতকরা ৬১ ভাগ চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপক মনে করেন যে, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের পরিবর্তে স্বতন্ত্র বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস গঠন করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত এবং তাদের নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কাজ সম্পাদনের জন্য আলাদা একটি স্বাস্থ্য সার্ভিস কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।
৩. শতকরা ৯৮ ভাগ চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপক মনে করেন যে, স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে স্বাস্থ্য প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তাদের আরো প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা প্রত্যর্পন করা প্রয়োজন।
৪. শতকরা ৮২ ভাগ চিকিৎসক তাদের কর্ম পরিবেশের উন্নতি ও নিরাপত্তা বিধানের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
৫. শতকরা ৮২ ভাগ চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপক মনে করেন যে, তাদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হলে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
৬. শতকরা ৯০ ভাগ চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপক মনে করেন যে, তাদেরকে সময়মত ও নিয়মিত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা উচিত।
৭. শতকরা ৭৮ ভাগ চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপক মনে করেন যে, তাদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
৮. উল্লেখ্য যে, শতকরা ৫৮ ভাগ চিকিৎসক মনে করেন যে, স্বাস্থ্য সেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
দেশব্যাপী ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপি চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চালুকরণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ শারীরিক নানা ধরনের ব্যথা, ব্যথাজনিত উপসর্গ ও প্রতিবন্ধিতার শিকার। তাদের সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি অন্যতম চিকিৎসাসেবা। ব্যথা ছাড়াও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বার্ধক্যজনিত সমস্যা, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস, সেরিব্রাল পালসি, অটিজম, মেরুদণ্ডে আঘাত, সড়ক দুর্ঘটনা, ক্যানসার, অবেসিটি, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ নানাবিধ অসংক্রামক রোগের কারণে বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক বড় একটি অংশ আংশিক বা পুরোপুরি প্রতিবন্ধিতায় ভুগছে। এই ব্যথা ও প্রতিবন্ধিতার প্রধান চিকিৎসা ব্যবস্থা হচ্ছে ফিজিওথেরাপি। সড়ক দুর্ঘটনা, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, বিকলাঙ্গতা, পক্ষাঘাত এবং বড় কোনো অস্ত্রোপচারের পর রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি ভালো ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগ, বাত-ব্যথা ও পক্ষাঘাতের রোগীরা ওষুধের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি নিয়ে ভালো ফল পান। শরীরের বিভিন্ন সমস্যার জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দরকার হয়। যেমন মাংসপেশি, জোড় ও হাড়ের সমস্যা। অনেক সময় দেখা যায়, ভেঙে যাওয়া হাড় জোড়া লাগার পর আঘাতপ্রাপ্ত অংশের মাংসপেশি ও হাড়-জোড় ঠিকমতো কাজ করে না। এ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন পড়ে। হাড়ের রোগ অস্টিওপোরোসিস, মাংসপেশির রোগ সারকোপেনিয়াতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা বিকল্পহীন। এ ছাড়া নানা ধরনের বাত যেমন স্পন্ডিলাইটিস, স্পন্ডাইলোসিস, স্পন্ডিলিসথেসিস; অর্থাৎ ঘাড়, কোমর ও মেরুদণ্ডের ব্যথায় এই চিকিৎসা বেশ কাজে দেয়। পাশাপাশি অস্থিসন্ধির বাত, হাঁটুর ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার বা কাঁধে ব্যথা এবং পায়ের গোড়ালির সমস্যায় আক্রান্তদের ফিজিওথেরাপি নিতে হয়।
এতে আরও বলা হয়, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনবাসনের উদ্দেশ্যে ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কমপ্লেক্সে ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপির উপর দুইটি ডিগ্রি কোস চালু করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন প্রতিকুলতার কারণে কোর্স দুটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার গুরুত ও প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করে ১৯৯৩-৯৪ শিক্ষাবর্ষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সুপারিশক্রমে ঢাকা বিশবিদ্যালয় চিকিৎসা অনুষদের অধীনে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে চার বছর মেয়াদি বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি কোর্স পুনরায় চালু করা হয়। বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশে নয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি কোর্স চালু রয়েছে এবং প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দক্ষ ছাত্র-ছাত্রী ফিজিওথেরাপিতে গ্রাজুয়েশন কোর্স সম্পন্ন করছে। এ পর্যন্ত দেশে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে প্রায় দশ হাজার ফিজিওথেরাপিস্ট স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তাদেরকে সরকারি চাকরি প্রদানের মাধ্যমে চিকিৎসা কাজে নিযুক্ত করা গেলে দেশের নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা খুবই উপকৃত হবে।
এনএআর/
-
০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
-
০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
-
০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
-
১৭ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
১৭ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
১২ অক্টোবর, ২০২৪