শিশু আয়ানের মৃত্যু: তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানি ৫ মার্চ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: খৎনা করতে গিয়ে শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের প্রতিবেদনের ওপর পূর্নাঙ্গ শুনানি আগামী ৫ মার্চ নির্ধারণ করেছেন উচ্চ আদালত। আজ বুধবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এর আগে মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর বাড্ডার সাতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুই চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় উচ্চ আদালতে। এদিন প্রতিবেদনে হাসপাতালের বিরুদ্ধে ‘সিরিয়াস এলিগেশন’ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন আদালত। পরে এ তদন্ত রিপোর্ট নথিভুক্ত করেন এবং এ সংক্রান্ত রুল শুনানির জন্য প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেন।
এদিকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সুন্নতে খৎনা করতে গিয়ে শিশু আয়ানের মৃত্যুতে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। চিকিৎসা কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি না থাকার সাথে সাথে হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচার করার পরিবেশ ছিল না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। একই সাথে অভিযুক্ত চিকিৎসক ও হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছেন কমিটির সদস্যরা।
যা আছে তদন্ত প্রতিবেদনে
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর জন্য ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়ী। কেননা, এই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটি একটি নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠান। এ মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন না থাকায় এটি বৈধভাবে চিকিৎসা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে না।
এতে বলা হয়েছে, অস্ত্রোপচারের পূর্বে নেবুলাইজ করা এবং অস্ত্রোপচার পরবর্তী ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকদের টিমের উচিত ছিল শিশু আয়ানের অভিভাবকদের কাছে বিস্তারিত ব্যখ্যা দেওয়া। এ ছাড়া অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট সৈয়দ সাব্বির আহম্মদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। তাকে সহযোগিতা করার জন্য সহকারীরও প্রয়োজন ছিল।
কমিটি মনে করে, হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচার করার পরিবেশ যেমন ছিল না, তেমনি অস্ত্রোপচার পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল না। উপরন্তু চিকিৎসাধীন থাকার সময়ে আয়ানের পিতা ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ডাক্তার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যবহার ছিল রূঢ়। সবশেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ লক্ষ ৭৭ হাজার ২৫৭ টাকার বিল পরিশোধ করে আয়ানের মৃতদেহ নিয়ে যেতে বলে ছিল অমানবিক—বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ
শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচটি সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য আরও সাতটি সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম পাঁচটি সুপারিশ হলো—
১. ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা উচিত। ক্ষতিপূরণের একটি অংশ আয়ানের পিতামাতাকে প্রদান করা এবং অন্য অংশ দিয়ে দুঃস্থ শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা।
২. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসা কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং শিশু আয়ানের মৃত্যুর জন্য ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৩. হাসপাতালের ডা. তাসনুভা মাহজাবীন ও অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট সৈয়দ সাব্বির আহম্মদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
৪. চিকিৎসা সংক্রান্ত লিখিত সম্মতিপত্রটি বাংলায় বড় বড় অক্ষরে স্পষ্ট ও বোধগম্যভাবে লিখতে হবে যাতে রোগীর বাবা-মা বা অভিভাবকরা সহজে পড়তে পারেন এবং চিকিৎসা ও তার পরবর্তী ফলাফল সম্পর্কে জেনে-বুঝে লিখিত সম্মতিপত্র স্বাক্ষর করতে পারেন। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সমগ্র বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য একটি ‘ইউনিফরম’ বা একই ধরনের সম্মতিপত্র প্রস্তুত করা।
৫. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া যে সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিক চিকিৎসা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, সেগুলো খুঁজে বের করে অবিলম্বে চিকিৎসা কর্মকাণ্ড বন্ধ করা এবং সে সকল হাসপাতালের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবহা গ্রহণ করা।
দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য যেসব সুপারিশ করা হয়েছে—
১. বাংলাদেশের সকল মানুষের সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যমান আইনসমূহের প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনের সংস্কার ও পরিমার্জন করা।
২. বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রেফারেল পদ্ধতির মাধ্যমে নিচ থেকে উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে। একজন জেনারেল ফিজিশিয়ানকে দেখানোর পরে তিনি যদি কোনো রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করেন, তাহলে তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। এতে চিকিৎসা পদ্ধতি সহজ হবে এবং রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে রোগীর চাপ কমবে।
৩. অপরিকল্পিত, মানহীন ডায়াগনোস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ বন্ধ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
৪. অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
৫. একমাত্র বিএমডিসি কর্তৃক নিবন্ধিত ব্যক্তির মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা।
৬. বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য বৈশ্বিকভাবে অনুসরিত জিডিপির পাঁচ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ও সেটি যথাযথভাবে ব্যবহার করা।
৭. চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাসহ অন্যান্য ব্যক্তিকে তাঁদের যোগ্যতা অনুসারে ক্ষেত্রমতো প্রণোদনা প্রদান ও ভালো প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা উৎসাহিত করা।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ছয় বছর বয়সী শিশু আয়ান আহমেদের সুন্নতে খৎনা করানোর জন্য বাড্ডার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে যান তার বাবা শামীম আহামেদ। ওই দিন সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে সুন্নতে খৎনার অপারেশন করা হয় আয়ানের। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর শিশু আয়ানের জ্ঞান ফিরে না আসা এবং নানা ধরনের চিকিৎসা জটিলতার প্রেক্ষিতে তাঁকে সাঁতারকূলে অবস্থিত হাসপাতাল থেকে গুলশানে অবস্থিত ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে গত বছরের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় আয়ানকে। ৭ জানুয়ারি রাতে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ৮ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়। ওই কমিটির তিনজনই মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক, অপর চিকিৎসক ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। ২০ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতের বিচারক মোস্তফা জামান ইসলাম ও মো. আতাবুল্লাহর দ্বৈত বেঞ্চ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিবেচনা করেন। আদালত রায়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনকে ‘মেনিপুলেট করে প্রস্তুত করা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ইউনাইটেড হসপিটাল লিমিটেড ও হাসপাতালের চিকিৎকদের দায় এড়ানোর জন্য এ প্রতিবেদন প্রদান করেছেন মন্তব্য করে হাইকোর্ট বিভাগ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বাতিলের আদেশ দেন। পরে অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট, শিশু বিশেষজ্ঞ ও আইনের একজন অধ্যাপকের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেন।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও অ্যানেসন্থেশিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এবিএম মাকসুদুল আলম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পেডিয়াট্রিক সার্জারির অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ডা. সুশংকর কুমার মন্ডল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আমিনুর রশিদ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাথী দস্তিদার। এ তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও এ্যানেসন্থেসিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এবিএম মাকসুদুল আলম এবং সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন।
এনএআর/
-
২৯ জানুয়ারী, ২০২৪