ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
মেডিভয়েস রিপের্টি: ডেঙ্গু রোগীগুলো মৃত্যুর আগেই কতগুলো লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে রোগী নিজে নিজেই বুঝতে পারেন। আর কিছু কিছু লক্ষণ আছে, যা ডাক্তার দেখে বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে অনুমান করে নিতে পারবেন। এই লক্ষণগুলোর পর্যায়ে এলে অথবা আসার আগেই ডাক্তার বলতে পারেন, এই রোগী কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে আছে। বিষয়গুলো অজানা থাকার কারণে ডেঙ্গু রোগীরা অসচেতন থাকেন, আর বড় সমস্যা হওয়ার পর হাসপাতালে আসেন।
আমি একটা উদাহরণ দেই, একজন রোগী দুই দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন, তৃতীয় দিন হয়তো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার ডেঙ্গু ধরা পড়ছে। কিন্তু ওই মুহূর্তে তার কোনো খারাপ লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। রোগী চিন্তা করছেন, মাথাব্যথা, জ্বর—এগুলো ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ। শরীরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে না বা অন্য কোন স্থান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে না।
সুতরাং তিনি মনে করেছেন আমার গুরুতর কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না। কিন্তু ওই মুহূর্তে আরো কিছু লক্ষণ তাকে শিখিয়ে দেয়া যায়। আমরা যদি আমাদের প্রচারণার মাধ্যমে বলে দেই কতগুলা লক্ষণ রোগীর মধ্যে প্রকাশ পেলে বা সে অনুভব করলে, আমরা রোগীকে বলবো, তিনি যেন বাসায় না থেকে হাসপাতালে চলে আসেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো—বারবার বমি এবং পাতলাপায়খানা হওয়া। ডেঙ্গু রোগীর সারাদিনে তিনবার অথবা চারবার বা তারও অধিক বমি হচ্ছে, কোনো ওষুধে বন্ধ হচ্ছে না, সেই সাথে পাতলাপায়খানা হচ্ছে। এটা তিনের অধিকবার হচ্ছে। ওআরএস বা খাবার স্যালাইন খেয়েও রোগীর কোনো উপকার হচ্ছে না, তখন ধরে নিতে হবে যে কোনো সময় সে খারাপের দিকে চলে যাবে।
ডেঙ্গু রোগীর অনেক সময় পেট ফুলে যায়। রোগী নিজেও বুঝবে না, সে ভাববে পেটটা ভারভার লাগছে। কিন্তু আসলে পেটের ভিতরে পানিক্ষরণ হচ্ছে। রোগীরা অনেক সময় রক্তক্ষরণ নিয়ে চিন্তিত থাকে, আমরা সবাই মনে করি, ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার আগে রক্তক্ষরণ হবে। কিন্তু পানি ক্ষরণটা বাহির থেকে বোঝা যায় না। রোগীরাও বুঝবে না, এমনকি অনেক সময় ডাক্তারও বুঝতে পারেন না। এজন্য আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি, যেমন—বুকের এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাম ইত্যাদি। এর মাধ্যমে দেখি, রোগীর অবস্থা কি?
আরেকটি বিষয় হলো, রোগীরা যখন ডেঙ্গু পরীক্ষা করে রিপোর্ট নিয়ে আসেন, রোগীদের ভিতরে এতটুকু সচেতনা এসেছে যে, প্লাটিলেট কমে যাওয়াই বুঝি রোগীর অবস্থা খারাপ। কিন্তু ওইখানে যে হেমাটোক্রিট বেড়ে যাওয়া, অন্য রোগে আক্রান্তদের প্যারামিটার, যেমন—তার হিমোগ্লাভিন কেমন আছে, সেই জিনিসগুলো রোগীরা অনেক সময় ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। এই অবস্থায় ডাক্তারও যদি পুরো অবস্থার ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা না পান, তাহলে তিনিও কিন্তু ভুল করে ফেলতে পারেন।
সেই জন্য আমি বলবো, আমাদের সচেতনতার পাশাপাশি রোগীদের সচেতনতা দরকার। এর মধ্যে অন্যতম হল রোগী অতিরিক্ত দুর্বল অনুভব করলে, দুই থেকে চারদিন যাচ্ছে, এর মধ্যে অন্য কোনো সমস্যা নেই, জ্বর কমে গেছে। কিন্তু দুর্বলতা কমছে না, তাহলে বুঝতে হবে তার ভেতরে কোনো জটিলতা হচ্ছে।
রক্তক্ষরণ লক্ষণ যখন প্রকাশ পেয়ে যাবে, তখন তো সে নিজেই বুঝবে এবং সে নিজেই ডাক্তারের কাছে আসবেন, হাসপাতালে ভর্তি হবেন। সেজন্য আমাদের রক্তক্ষরণের আগে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এটা বুঝতে আমরা কিছু পরীক্ষা দিই, যেমন—টরনিকোয়েট টেস্ট। এই টেস্ট সম্পর্কে অনেক ডাক্তারও অবগত না। কিন্তু তাদের জানা উচিত। যদি ডেঙ্গু রোগীর রক্তক্ষরণের ধারণা করেন, তাহলে তার কর্নিকোয়েট পরীক্ষাটার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আগামী এক-দুই ঘণ্টা বা পাচ ঘণ্টা বা ২৪ ঘণ্টার ভিতরে রক্তক্ষরণের প্রবনতা রয়েছে। তাহলে এই রোগীগুলোকে হাসপাতালে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা
কোনো রোগীর এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে, যাকে আমরা বলি সতর্কতা চিহ্ন, রোগীগুলা খারাপ হয়ে যাবে। এই ধরনের রোগী মুখে খেতে পারলেও আমরা বলবো, তাদেরকে আইভি ফ্লুইড স্যালাইন, বিশেষ করে নরমাল স্যালাইন লাগিয়ে দেয়ার জন্য।
এই নরমাল স্যালাইন যদি ১০-১২ ফোটা বা ১৫ ফোটা করেও খাওয়ানো যায়, তাহলে দেখা যাবে ভিতরে পানিক্ষরণ হলেও রোগী আর খারাপ হয়ে কিডনি ফেল হয়ে বা লিভার ফেল হয়ে মৃত্যুর মুখে চলে যাওয়া—এগুলো আর হয় না। সুতরাং আমি রোগীর সচেতনতার সাথে সাথে আমাদের ডাক্তারদের কিছু কিছু জিনিস, যেমন—ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা একটু বুঝতে হবে। এটা খানিকটা আলাদা রোগ। রোগী খারাপ হয়ে যাওয়ার লক্ষণগুলো কীভাবে আসে, এই জিনিসগুলো আমাদের ডাক্তারদের আরেকটু সচেতনভাবে জেনে নেওয়া উত্তম।
এসআই/এমইউ