২৩ নভেম্বর, ২০২৪ ০৬:২৭ পিএম

‘স্বাস্থ্যখাতে বিদেশমুখিতা কমাতে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই’

‘স্বাস্থ্যখাতে বিদেশমুখিতা কমাতে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই’
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: আত্মবিশ্বাস ও গ্রাহক সন্তুষ্টির অভাবে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এতে যোগ হয়েছে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার অভাব। তবে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের এই বিদেশমুখিতা কমানো সম্ভব।

শনিবার (২৩ নভেম্বর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য খাতে বিদেশমুখিতা কমাতে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি’ বিষয়ক সেমিনারে এসব কথা উঠে এসেছে।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ডিসিসিআই সভাপতি আশরাফ আহমেদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বরাত দিয়ে আশরাফ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের ৪৯ শতাংশ মানুষই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পায় না। একই সাথে স্থানীয় সেবায় প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মান না থাকায় বিদেশে স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ খাতের উন্নয়নে বিশেষ করে উন্নত অবকাঠামো ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, বরাদ্দ বাড়ানো, আন্তর্জাতিক হাসপাতালগুলোর চেইন কার্যক্রম বাংলাদেশে চালুকরণ, বিদেশি ডাক্তার ও নার্সদের বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজিকরণসহ স্বাস্থ্যখাতের সকল ধরনের লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়নের প্রক্রিয়াগত জটিলতা নিরসন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেসরকারিখাতে হাসপাতাল কার্যক্রম চালু উৎসাহিতকরণে কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদানের উপর জোরারোপ করেন ডিসিসিআই সভাপতি।

তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান হারে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সম্প্রতি বিদেশে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে যাচ্ছে, যদিও অনেক চিকিৎসা স্থানীয়ভাবেও পাওয়া যায়। তুলনামূলকভাবে কম আত্মবিশ্বাস এবং গ্রাহকদের সন্তুষ্টির অভাবে বিদ্যমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গ্রাহক সন্তুষ্টি কেবল চিকিৎসা থেকে আসে না, বরং পুরো হাসপাতালের ইকোসিস্টেম এর সাথে সম্পৃক্ত। মানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য বিদেশি ডাক্তার, নার্স ও টেকনোলজিস্ট দেশে আসার প্রক্রিয়া আরো সহজতর করতে হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশের মাথাপিছু ব্যয় ১১০ মার্কিন ডলার, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে ব্যয় হয় ৪০১ মার্কিন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩০ হাজার ১২৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের শতকরা মাত্র ৩.৭৮ ভাগ।

তিনি জানান, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতার কারণে দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী বিশ্বের অন্যান্য দেশের সেবা নিয়ে থাকে। ২০১২ সালে বিদেশে স্বাস্থ্য সেবা নেওয়ায় বাংলাদেশিদের ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মালিক তালহা ইসমাইল বারী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে পাঁচ হাজার ৪৬১টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৮১০টিই আছে ঢাকা বিভাগে। পাশাপাশি ৩৬টি স্পেশালাইজড হাসপাতালের মধ্যে ১৯টি ঢাকাতে অবস্থিত। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ উন্নত স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সাথে ঢাকার উপর চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।

উন্নত স্বাস্থ্য সেবার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে অবকাঠমোর স্বল্পতা, দক্ষ ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানের অভাব, সরকারি হাসপাতলে সেবা প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, উন্নত সেবার জন্য ইন্স্যুরেন্স কভারেজের অনুপস্থিতি প্রভৃতিকে কারণ হিসেবে তুলে ধরেন ডিসিসিআই সহ-সভাপতি। বিদ্যমান অবস্থা উত্তরণে স্বাস্থ্য খাতের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার সহজীকরণ, সরকারিভাবে সকলের জন্য স্বাস্থ্য সেবা ইন্স্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসা, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট সহায়তা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, পিপিপি মডেলে ঢাকায় আন্তর্জাতিক হাসপাতালসমূহের কার্যক্রম শুরু, সহায়ক নীতি সহায়তা প্রদানের উপর জোরারোপ করেন মালিক তালহা ইসমাইল বারী।

সেমিনারে নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক এ কে খান আজাদ বলেন, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার স্বল্পতা, চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থার স্বল্পতা, সর্বোপরি কমফোর্টের অভাবে অসংখ্য লোক দেশের বাইরে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে, এগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের মাধ্যমে রোগীদের বিদেশমুখিতা হ্রাস করা সম্ভব।

তিনি বলেন, যেহেত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান সর্বদা পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া, ফলে বর্তমানে আমরা যা আমরা প্রত্যক্ষ করছি, আগামী ২৫ বছর পর এ ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। তাই সেরা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি গ্রহণ করার জন্য আমাদের একটি সঠিক পাঠ্যক্রম থাকা জরুরি। দেশে পরিচালিত ল্যাবরেটরিগুলোর মান উন্নয়ন ও বাজেট সহায়তা বাড়ানোর মাধ্যমে চিকিৎসাশাস্ত্রের গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) শক্তিশালীকরনের উপর জোরারোপ করেন তিনি।

বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্টার ডা. মো. লিয়াকত হোসাইন বলেন, বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারি, যার মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের মাধ্যমে রিজার্ভ বৃদ্ধি সম্ভব। উন্নত সেবা প্রদানে রোগীদের প্রতি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিকতা পরিবর্তন একান্ত অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশীয় ডাক্তার ও নার্সদের দক্ষতা উন্নয়নের আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট স্থাপনের কোন বিকল্প নেই।

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিদ্রত একটি মেডিকেল অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন ঢাবির ইন্সটিটিউট অব হেলথ ইকোনোমিক্সের প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। একই সাথে স্বাস্থ্য প্রশাসনকে দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য সিভিল সার্ভিস থেকে বাদ দিয়ে পৃথক স্বাস্থ্য ক্যাডার এবং জুডিশিয়ারি সার্ভিস কমিশনের মতো স্বাস্থ্যসেবা কমিশন গঠনের উপর জোরারোপ করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল বলেন, আস্থা এই সেক্টরের উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই আমাদের স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্যসেবা পর্যটনে রূপান্তর করতে হবে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে গ্রামীণ পর্যায়ে আরও বেশি মানের হাসপাতাল স্থাপন করা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মো. জামাল বলেন, বাংলাদেশ এখন ওষুধ উৎপাদনকারী দেশ। আমরা বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও করি, কিন্তু চিকিৎসাযন্ত্র উৎপাদনে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। এ খাতে আরও ভালো করতে হলে দক্ষ জনশক্তি ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।

তিনি জানান, বাংলাদেশে এক লক্ষ ৩৪ হাজার চিকিৎসক রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৩ হাজার সরকারি চিকিৎসক। তবে এটা সন্তোষজনক যে, এখানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ১০ হাজারের বেশি বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব ইমার্জেন্সি মেডিসিনের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. মীর সাদউদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনা মহামারির সময় কেউ চিকিৎসা নিতে বিদেশে যায়নি। মহামারীর সে সময়ে আমরা পরিস্থিতি সামলাতে পেরেছি, এটা স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমাদের সক্ষমতা প্রতিফলিত করে।

সেমিনারে বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এবং সমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এবিএম হারুনসহ ঢাকা চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দসহ উপস্থিত ছিলেন।

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক
সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

হামে চিকিৎসা ব্যর্থতা ও শিশু মৃত্যুর দায়

ড. ইউনূস-নুরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

হামে চিকিৎসা ব্যর্থতা ও শিশু মৃত্যুর দায়

ড. ইউনূস-নুরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক