১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৬:৪৩ পিএম

অন্যত্র মাইগ্রেশনের দাবি আইচি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের

অন্যত্র মাইগ্রেশনের দাবি আইচি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ছয় বছরেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন হাসিল করতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজধানীর বেসরকারি আইচি মেডিকেল কলেজ থেকে অন্যত্র মাইগ্রেশনের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি এতে অনাপত্তি পত্র দিলেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাইগ্রেশন ঠেকাতে নানা তালবাহানা শুরু করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

এদিকে কলেজ প্রশাসন বলছে, ‘গান পয়েন্টে’ অনাপত্তি পত্রে সই নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করতে বাধ্য করা হয়েছে অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরও।

জানা গেছে, ২০১৭-১৮ সেশন থেকে মেডিকেল কলেজটিতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে স্থগিতাদেশ দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু এরপরও উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করে শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ অটোমেশন পদ্ধতির কারণে গত দুই সেশনে ভর্তি সম্ভব না হলেও ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত চারটি ব্যাচে প্রায় দেড়শ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন কলেজটিতে।

কিন্তু, মন্ত্রণালয়ের স্থগিতাদেশ থাকায় এই কলেজ নেই বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তালিকায়। ফলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা চিকিৎসক হিসেবে বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন পাবেন না। ভবিষ্যতে চিকিৎসা পেশা চর্চার সুযোগ হারাবেন এসব শিক্ষার্থী। এর ফলে দীর্ঘদিন রেজিস্ট্রেশন আদায়ের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন তারা। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ এনে এখন এই মেডিকেল ছেড়ে অন্যত্র যেতে চান এসব শিক্ষার্থী।

আইচি মেডিকেল কলেজের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী শাফিন শাররাজ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বৈধ কলেজ হিসেবে বিভিন্ন ডকুমেন্ট দেখিয়ে আমাদের ভর্তি করিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পরে জানতে পেরেছি, আমরা শিক্ষার্থী হিসেবে বিএমডিসিতে নথিভুক্ত নই। এজন্য ২০২০ সাল থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করে আসছি রেজিস্ট্রেশন ইস্যুটা মীমাংসা করার জন্য। বারবার আশ্বাস দিলেও এ নিয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো কাজ করেনি।’

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘এবার জুনের শুরু থেকে আমরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করি। এখন পর্যন্ত শ্রেণি কার্যক্রম একেবারে বন্ধ। আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ জানালেন তারা আমাদের মাইগ্রেশনের ব্যবস্থা করে দিবেন। অনাপত্তি পত্রও ইস্যু করলেন। কিন্তু মাইগ্রেশনের কাজেও তারা গড়িমসি করছেন।’

শাফিন শাররাজ বলেন, ‘আমরা ধুম করে মাইগ্রেশন চেয়ে বসিনি। ২০১৭-১৮ সেশনের পর থেকে কোনো শিক্ষার্থীর ডকুমেন্ট বিএমডিসির কাছে নেই। এখন আমাদের মূল উদ্বেগের জায়গাটা হচ্ছে, আমরা এখান থেকে পাশ করে কোথাও প্র্যাকটিস করতে পারব না। বিএমডিসির অনুসারে তো আমরা মেডিকেল শিক্ষার্থী না।’

২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মাহজাবিন আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘শুধুমাত্র মালিকপক্ষের গাফিলতির কারণে মাইগ্রেশনটা বিলম্ব হচ্ছে। তারা আমাদের সাথে সহযোগিতামূলক আচরণ করছেন না। কিন্তু যেখানে আমাদের কোনো ফিউচার নেই, সেখানে আমরা থাকতে পারব না।’

তিনি বলেন, ‘আমি এখন পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী। এখন আমি যদি মাইগ্রেশন করতে না পারি, সামনে আমার ফাইনাল প্রফে বসার কথা ছিল, সেটি সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হবো। এমনকি অন্য কলেজে চলে গেলেও যে সাথে সাথে পরীক্ষায় অংশ নিতে দিবে, আমি তাও মনে করি না।’

একই বর্ষের শিক্ষার্থী আহসানউল্লাহ বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ কলেজ চালাতে ব্যর্থ এবং অপারগতা প্রকাশ করে ২৮ আগস্ট শিক্ষার্থীদের অন্যত্র মাইগ্রেশন করে দিতে অনাপত্তিপত্র জারি করেছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এই আবেদন গ্রহন করেন। ১৫০ জন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে দ্রুত মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষ চাই।’

‘শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হয়েছেন’

শিক্ষার্থীরা চাইলে অন্য কলেজে যেতে আপত্তি নেই আইচি মেডিকেল কলেজের মালিক পক্ষের। গত ২৮ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, বিএমডিসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অনাপত্তি পত্র পাঠান কলেজটির ভাইস চেয়ারম্যান রাকিব বিন জামান।

এ বিষয়ে কথা বলতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হয় মেডিভয়েসের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো পক্ষ জড়িত, সবার মতামত ছাড়া মাইগ্রেশন সম্ভব না। কারণ মাইগ্রেশনের বিষয়টি অধিদপ্তরের একার বিষয় নয়। বিএমডিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর অনুমতি লাগবে। কিন্তু বিএমডিসির কার্যক্রম এক রকম বন্ধ আছে। এজন্য এখনই এটির সমাধান হচ্ছে না।’

২০১৮-১৯ সেশন থেকে আইচি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নানাভাবে প্রতারণার মাধ্যমে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। যারা এভাবে প্রতারিত হয়েছে, তাদেরটা মীমাংসা করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর কেউ যেন প্রতারিত না হয়, সে ব্যবস্থাও করতে হবে। তবে গত দুই বছরে অটোমেশন পদ্ধতি চালু হওয়ায় তারা ইচ্ছামতো ভর্তি করতে পারছে না। এই অটোমেশন পদ্ধতি থাকলে শিক্ষার্থীরা আর প্রতারিত হবে না।’

‘কলেজ কর্তৃপক্ষ মব জাস্টিসের শিকার’

মাইগ্রেশনের বিষয়ে কথা বলতে মালিকপক্ষের কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আইচি কর্পোরেটের কলেজ সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলামকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তবে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. তানজিমা বেগম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের ভর্তি বন্ধ থাকলেও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চলছে। এখন শিক্ষার্থীরা নিজে থেকে চলে যেতে চায়। কারণ তাদের কাছে মনে হয়েছে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন আমরা কখনও পাব না, তারা এখান থেকে বের হলে প্র্যাকটিস করতে পারবে না। কিন্তু ত্রুটিযুক্ত কোনো মেডিকেল থেকে পাশ করার পরে কেউ রেজিস্ট্রেশন পায়নি এমন তো হয়নি। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যখন সবখানে স্বচ্ছতার সাথে কাজ হচ্ছে, তখন রেজিস্ট্রেশন আদায়ে আমরা কাজ করছিলাম। আমাদের কিছু ত্রুটি ছিল, কিন্তু আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী যে আইচি মেডিকেল কলেজ রেজিস্ট্রেশন পাবে।’

তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় মব জাস্টি হচ্ছে। এখানেও (কলেজ) সেটা ঘটেছে। আমরা সব শিক্ষক এবং স্টাফরা সেই মব জাস্টিস দেখছি। আমার কথা হলো, ওদের যত রাগই থাকুক, একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হবে। কিন্তু ২৮ তারিখের যে অনাপত্তি পত্র, সেটা গানপয়েন্টে সিগনেচার নেওয়া হয়েছে। দুইটা মানুষকে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে ডেকে নিয়ে এসে এতগুলো ছাত্রছাত্রী মিলে জোর করে সই নিয়েছে। ওই কাগজের ভাষা কি মালিকের ভাষা?’

ডা. তানজিমা বেগম বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছি। তাদের আশ্বস্ত করেছি। কিন্তু তারা আমাদের কথা শুনতে চায় না। তাহলে সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে? কিছু শিক্ষার্থী ক্লাস করতে চাইলে তারা ক্লাস করতে দেয়নি। নভেম্বরে কিছু ছাত্রছাত্রী প্রফ দিবে, তারা প্রফ দিতে দিবে না। এসব নিয়ে যেন দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি লেগে যাবে। সেজন্য আমাকে সেনাবাহিনীর সহায়তাও নিতে হয়েছে।’

তবে বিষয়টি অস্বীকার করে শিক্ষার্থীরা বলছেন, যারা ক্লাস করতে চায় তারা কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত। এ ছাড়া জোর করে সই নেওয়া ‘গানপয়েন্টে’ নেওয়া হয়নি বলেও দাবি তাদের।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে রাজধানীর উত্তরায় প্রতিষ্ঠা হয় আইচি মেডিকেল কলেজ। এটির মালিকানা ছিল ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের চেয়ারম্যান ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের। পরে এটির মালিকানা আসে স্কাইভিউ ফাউন্ডেশনের কাছে। কিন্তু ২০১৭ সালে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনা ও পরিচালনা নীতিমালা-২০১১ (সংশোধিত) এর বাস্তবায়নের জন্যে এই কলেজকে কিছু শর্তারোপ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ব্যর্থ হলে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্ট ডিভিশনে স্থগিতাদেশকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তার ভিত্তিতে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন না থাকায় শিক্ষার্থীরা তখন থেকেই আন্দোলন করে আসছিলেন। সর্বশেষ গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি এ নিয়ে আন্দোলনে নামলে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বহিরাগতরা।

রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. তানজিমা বেগম বলেন, ২০১৩ সালে রাজধানীর উত্তরায় মেডিকেল কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এর মালিকানা ছিল অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে। ওই সময়ে বিএমডিসির কিছু শর্ত লঙ্ঘন হওয়ায় এটির রেজিস্ট্রেশন হয়নি। পরে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা পরিবর্তন হয়ে ২০১৯ সালে ডেমরায় স্থানান্তরিত হয়। এখানে সবগুলো শর্ত পূরণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘২০২২ সালে শেষবার পরিদর্শনে এসেছিল মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু এরপর আর কোনো পরিদর্শনে আনতে পারিনি। এটা রাজনৈতিক কারণে হয়নি, নাকি অন্য কারণে হয়নি আমরা জানি না। তবে পট পরিবর্তনের পর আমরা নতুন করে সম্ভাবনা দেখছিলাম। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সেটি ঠিক মনে করছে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ওই মেডিকেলের বিষয়ে নানা তথ্য চেয়েছে। তবে আমরা এখনও প্রক্রিয়াটি শেষ করতে পারিনি। তা ছাড়া কলেজ কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ে আবারও পরিদর্শনের জন্য আবেদন করেছে। এটিও বিবেচনাধীন রয়েছে। এ ছাড়া স্থগিতাদেশ থাকা ছয়টি মেডিকেলের ব্যাপারে প্রতিবেদন তৈরির জন্য একটি কমিটি কাজ করছে।’

অনাপত্তিপত্র দেখুন

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত