জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ডা. মাহবুবের দাগবিহীন থাইরয়েড সার্জারি
সাখাওয়াত হোসাইন: ডা. মো. মাহবুব আলম, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের আবাসিক সার্জন। নাক, কান ও গলা রোগ বিষয়ে দেশ-বিদেশে নিয়েছেন নানা প্রশিক্ষণ। নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে। তাঁর হাত ধরে দেড় বছর আগে দেশে প্রথমবারের মতো শুরু হয় দাগবিহীন এন্ডোসকপি থাইরয়েড সার্জারি। এটি দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়। এর মাধ্যমে ব্যাপক উপকৃত হচ্ছেন রোগীরা। থাইরয়েড সার্জারির অপারেশন করার পরও রোগীর গলায় থাকে না কোনো দাগ। এতোদিন বাংলাদেশে এই চিকিৎসা পদ্ধতি না থাকার কারণে অনেকেই চিকিৎসা নিতে বিদেশ পাড়ি দিতেন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতি।
জানা গেছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ কোটি মানুষ থাইরয়েডজনিত রোগে আক্রান্ত। তিন কোটি মানুষ জানেন না, তাদের এই সমস্যা আছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৩-৫ শতাংশ মানুষ থাইরয়েড সমস্যা নিয়ে ভুগেন। এখন পর্যন্ত ৪০ জন রোগীর দাগবিহীন এন্ডোসকপি থাইরয়েড সার্জারি করা হয়েছে।
আরও জানা গেছে, এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেওয়া সবাই সুস্থ এবং ভালো আছেন। এই পদ্ধতি চিকিৎসা নিয়ে রোগীরাও খুঁশি। নতুন এই পদ্ধতিতে একটি সার্জারি করতে সময় লাগে সাড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। সরকারি হাসপাতালে এই পদ্ধতিতে রোগীদের সেবা কিছুদিন সময় লাগে, দুই বা তিন সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়, চেক-আপ, সিরিয়াল ইত্যাদির জন্য। এরপর হয় অপারেশন। আর বেসরকারিতে বেশিদিন সময় লাগে না। এ ছাড়া অপারেশন শেষে সিডিউল অনুযায়ী রোগীকে ফলোআপে থাকতে হয়। এটি রোগীদের জন্যেও সহজলভ্যও, যেতে হয় না বিদেশ। থাইরয়েডে আক্রান্ত রোগীরাও বেশ স্বচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করছেন এই চিকিৎসা পদ্ধতি।
জানতে চাইলে দেশে দাগবিহীন এন্ডোসকপি থাইরয়েড সার্জারির পথপ্রদর্শক ডা. মাহবুব আলম মেডিভয়েসকে বলেন, এখন বেশ ভালোই রোগীদের সাড়া পাচ্ছি। মানুষের মধ্যেও একটা সচেতনতা এসেছে, তারা নতুন পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিতে চায়। প্রথম শুরু করার সময় অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। নতুন পদ্ধতির সার্জারি কেমন হবে, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভীতি ছিল। কিন্তু অপারেশনের পর দেখেছেন, এই পদ্ধতিতে গলায় দাগ থাকে না। ঠোটের নিচের ফুঁটো করা দাগটাও কিছুদিন পর মিশে যায়। তাতে মানুষ সত্যি আনন্দিত হয়। দিন দিন দেশের মানুষের মধ্যে এই সার্জারি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। থাইরয়েডের রোগীরা এখন চিকিৎসকের কাছে গেলে, জিজ্ঞেস করে আপনারা দাগবিহীন করবেন নাকি কেটে করবেন? সবার মধ্যে একটি খবর চলে গেছে বাংলাদেশেই দাগবিহীন সার্জারি করা সম্ভব।
রোগীদের আগ্রহ
দীর্ঘ সময় বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর ডা. মাহবুব আলম ২০২২ সালের শেষের দিকে দেশে চালু করেন দাগবিহীন এন্ডোসকপি থাইরয়েড সার্জারি। রোগীদের আগ্রহ কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোগীরা এই পদ্ধতি আগ্রহ দেখাচ্ছে অনেক। এ ছাড়া অনেকের মধ্যে ভীতি কাজ করে নতুন পদ্ধতিতে অপারেশন করলে টিউমার আউট হবে কিনা। তারা ভালো ফলাফল পাবে কিনা। এ রকম অনেক ভীতি মানুষের মধ্যে ছিল।
জানতে চাইলে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুব আলম বলেন, নতুন এই পদ্ধতিতে রোগীরা ভালো ফলাফল পাচ্ছে। অপারেশনের পর টিউমার থাকে না এবং গলার অন্যান্য সমস্যাও থাকে না। এর মাধ্যমে রোগীরা উপকৃত হচ্ছে। দাগও থাকে না। রোগী সুস্থ হওয়ার পর রোগী এবং আত্মীয় স্বজনের প্রতিক্রিয়া দেখার মতো, এটি বেশ আনন্দদায়ক। সেইসঙ্গে একজন চিকিৎসকের পরম পাওয়া।
রোগীরাও সচেতন, যন্ত্রপাতি সহজলভ্য
দেড় বছর আগে এই চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করার সময় বাংলাদেশে যন্ত্রপাতির ব্যাপক সংকট ছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টায় দাগবিহীন থাইরয়েড সার্জারি করার যন্ত্রপাতি সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মাহবুব আলম বলেন, ‘শুরুতে যেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল, এখন সেগুলো নেই। মানুষের মধ্যে সচেতনতা এসেছে, তারা নতুন পদ্ধতিতে অপারেশন করতে চায়। কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল, অনেকগুলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে ছিল না। বাহিরের দেশে কথা বলে আমরা কিছু জিনিস পত্র নিয়ে এসেছি এবং সহজলভ্য করেছি। এখন সহজেই কাজ করা যাচ্ছে।’
এন্ডোস্কপিক ও রোবটিক সার্জারির স্বপ্ন
এবিষয়ে ডা. মাহবুব জানান, ‘দাগবিহীন থাইরয়েড সার্জারি, এটি শুধু থাইরয়েড সার্জারি নয়। এর মধ্যে মাধ্যমে আমরা গলার অন্যান্য অপারেশনও করতে পারি। যেমন আমরা গলার ক্যান্সারের সার্জারি করতে পারি। গলার অন্যান্য সার্জারি বিদেশে দাগবিহীন হচ্ছে। আমরা চাই শুধু থাইরয়েড সার্জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, অন্যান্য সার্জারিও করতে চাই। এন্ডোস্কপিক ও রোবটিক সার্জারিও বাংলাদেশে চালু করার স্বপ্ন আছে আমাদের।’
চিকিৎসকরাও শিখতে আগ্রহী
নতুন পদ্ধতি নিয়ে কৌতুহল আছে নাক, কান ও গলা নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী চিকিৎসকদের মাঝেও। অনেকেই দাগবিহীন ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চান।
ডা. মাহবুব আলম বলেন, ‘আমরা চাই নতুন যারা আছে, তারাও শিখুক। নতুন সার্জনরাও এবিষয়ে খুব আগ্রহী। তারা আমাদের কাছে আসে এবং দেখে যায়। আবার এর মধ্যে অপারেশন করতে ঢাকা মেডিকেলে গিয়েছি, এরপর নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউটেও গিয়েছি, ঢাকা সিএমএইচেও গিয়েছি অপারেশন করতে। এ ছাড়া সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজেও আমন্ত্রণিত অতিথি হিসেবে সার্জারির জন্য গিয়েছি। নাক, কান ও গলা বিষয় পছন্দ করার পেছনে নবীনদের অন্যতম কারণ নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার। এখন অনেকেই আসতে আগ্রহী।’
-
২৪ মার্চ, ২০২৪
-
১৩ জানুয়ারী, ২০২৩