জোটেনি ডব্লিউএফএমইর স্বীকৃতি
চিকিৎসকদের বহির্বিশ্বে চাকরি-প্রশিক্ষণ হুমকির মুখে
মেডিভয়েস রিপোর্ট: চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন বিল পাসের তিন মাসের মধ্যেও গঠিত হয়নি অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল। ফলে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের (ডব্লিউএফএমই) অ্যাক্রেডিটেশনের মানদণ্ড নির্ধারণে তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনাও থেমে রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ডব্লিউএফএমইর যৌথ টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বের সকল দেশের মেডিকেল শিক্ষা একটি অ্যাক্রেডিটেশনে চলে আসাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি নিশ্চিত না হলে এক দেশের চিকিৎসক অন্য দেশে চাকরি ও উচ্চতর পড়াশোনা করতে পারবেন না।
মেডিকেল শিক্ষার বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অ্যাক্রেডিটেশন অর্জিত না হওয়ায় এমবিবিএস সম্পন্ন করা বাংলাদেশি চিকিৎসকদের আগামী বছরের জুন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাকরি ও প্রশিক্ষণ বাধার মুখে পড়ছে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মো. জামাল সোমবার (২৭ নভেম্বর) রাতে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘তিন মাস আগে জাতীয় সংসদে চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন বিল পাস হয়েছে। এর আলোকে মেডিকেল অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠিত হলেই বাকি কাজটা সম্পন্ন হয়ে যাবে।’
কাউন্সিল গঠন করবে মন্ত্রণালয়
কাউন্সিল কবে গঠিত হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সরকারের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় যখন গঠন করে দেবে, তখন থেকেই কাজ শুরু হবে। যত তাড়াতাড়ি এটা হবে, তত তাড়াতাড়ি আমরা কাজ শুরু করতে পারবো।’
নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কাউন্সিল গঠিত না হলে চিকিৎসকদের কী কী সমস্যা হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক কথায়, আমরা পিছিয়ে পড়বো। পৃথিবীর সবাইকে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের স্বীকৃতি নিতে হবে। এটা ছাড়া মেডিকেল শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যাবে না। আমাদের চিকিৎসকরা বহির্বিশ্বে চাকরি করতে পারবেন না, প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন না।’
কাউন্সিল গঠনের বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. আজিজুর রহমানকে একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। ফোন ধরেননি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. টিটো মিঞা।
এ নিয়ে কথা হয় অ্যাসোসিয়েশন ফর মেডিকেল এডুকেশন বাংলাদেশের (এএমইবি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. হুমায়ুন তালুকদারের সঙ্গে। তবে তিনি এ বিষয়ে কথা বলার ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষ নন’ বলে জানিয়েছেন।
নতুন নিয়মের অন্তর্ভুক্ত যারা
কারা নতুন নিয়মের আওতায় পড়বেন—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মো. জামাল বলেন, আগে থেকে পাস করা চিকিৎসকরা এর অন্তর্ভুক্ত নয়। যারা নতুন করে পাস করবেন, তাদের বেলায় এটি প্রযোজ্য হবে।
চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন বিল
দেশে মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন বিল ২০২৩ সংসদে পাস হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে এটি পাস হয়।
গত ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগে বিলের ওপর আনীত জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে প্রেরণ ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিষ্পত্তি করা হয়।
স্বীকৃতির মানদণ্ড নির্ধারণে ১৯ সদস্যের কাউন্সিল
বিলে বলা হয়েছে, এই আইনের অধীনে একটি অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল থাকবে। ১৯ সদস্যের এই কাউন্সিলই অ্যাক্রেডিটেশনের বিষয়গুলো দেখভাল করবে, নীতিমালা প্রণয়ন করবে। এর জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে অ্যাক্রেডিটেশনের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবা নিশ্চিতকরণের জন্য চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন এবং প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি-বিধান প্রণয়নের বিষয়ে গত ২০১৪ সালের ১১ মার্চ ‘জাতীয় স্বাস্থ্য কাউন্সিল’ এর সভায় নির্দেশনা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসা শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ও উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের চিকিৎসা শিক্ষা কার্যক্রমকে অ্যাক্রেডিটেশন সনদ প্রদান এবং চিকিৎসা শিক্ষা প্রদানকারীদের মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন আইন, ২০২৩’ শীর্ষক বিল জাতীয় সংসদে আনা হয়।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন এবং এ সংক্রান্ত বিধি-বিধান করতে এই আইনটি অতি প্রয়োজনীয় ও যুক্তিযুক্ত।’
তারও আগে গত ১৪ জুন বিদেশে চিকিৎসকসহ মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের চাকরি ও উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন বিল, ২০২৩’ বিল জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর এটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ১৫ দিনের সময় দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।
প্রায় আড়াই বছর আগে ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর এই আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এক অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় সকল দেশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিক্যাল এডুকেশনের যৌথ টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে সব দেশকে একটি অ্যাক্রেডিটেশনের মধ্যে আসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মধ্যে যদি না আসে, তাহলে সে দেশের কোনো চিকিৎসক বা টেকনিক্যাল হেলথ পারসন অন্য দেশে স্বীকৃত হবেন না বা তাদের শিক্ষার্থীরা অন্য দেশে গিয়ে শিক্ষাও গ্রহণ করতে পারবেন না।
এএনএম/