ডায়াবেটিসে আশীর্বাদ ইনসুলিন
ডায়াবেটিস খুব পরিচিত অসুখ। এখন প্রায় প্রতিটি ঘরেই একজন দুইজন ডায়াবেটিস রোগী পাওয়া যাবে। দিনদিন এ রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ছে। ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, এ কথা ধরেই নেওয়া যায়। ডায়াবেটিসের বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে। এদের মধ্যে টাইপ-১ এবং টাইপ-২ অন্যতম। আমাদের দেশে টাইপ-২ এর প্রচুর রোগী দেখা যায়।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের একমাত্র চিকিৎসা ইনসুলিন। এক্ষেত্রে ট্যাবলেট খেলে কোনো কাজ হয় না। আমাদের অগ্নাশয় বা প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন তৈরি হয়। বিটা কোষ থেকে এই ইনসুলিন বের হয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে বিটা কোষ সব নষ্ট হয়ে যায়। ফলে শরীরে কোনো ইনসুলিন থাকে না এবং ইনসুলিন দিয়েই চিকিৎসা করতে হয়। এক্ষেত্রে ভয়-ভীতি করে কোনো লাভ নেই। এসব রোগীর শরীরে ইনসুলিন তৈরি হয় না বলে প্রথম থেকেই ইনজেকশন নিতে হয়। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৯৫ শতাংশেরও বেশি ভোগেন টাইপ-২ ডায়াবেটিসে। সাধারণত কম বয়সে টাইপ-১ ডায়াবেটিস হয়।
মধ্যবয়সের পরে ডায়াবেটিস হলে রোগের পর্যায়ের উপর নির্ভর করে লাইফস্টাইল মেনে ও ওষুধ খেয়ে অনেকটা ভালো থাকা যায়। নিয়ম মেনে চললে অসুখ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে এদের অনেকের জীবনের কোনো না কোনো সময় ইনসুলিন লাগে। আমাদের দেশে বেশিরভাগ রোগীই ইনসুলিন নিতে চান না। অনেকেই সুঁই ভয় পান। ইনসুলিনের কথা শুনে অনেকেই কেঁদেও ফেলেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইনসুলিন নিলে অনেক ভালো থাকা যায়। ওষুধ খেলে বেশি ইনসুলিন নিঃসরণ হয়। কিছু ওষুধ আবার ইনসুলিনের কাজ বাড়ায়। কিন্তু ইনসুলিন ইনজেকশন আকারে নিলে সরাসরি কাজ হয়। বর্তমানে যেসব উন্নতমানের সিরিঞ্জ পাওয়া যায়, সেসবে ব্যথা হয় না বললেই চলে।
ইনসুলিন শুরু হলে থামানো যায় না?
ইনসুলিন শুরু করলেই অনেকে ভেবে বসেন, ডায়াবেটিস খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। ব্যাপারটা সবসময় সত্য নয়। অনেকে ভাবেন, ইনসুলিন একবার শুরু করলে আর থামানো যায় না। এ কথাও সত্য নয়। অনেক সময় সাময়িকভাবে ইনসুলিন ব্যবহার করে পরে ট্যাবলেট খাওয়া যায়। কেউ কেউ ইনসুলিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয় পান।
কেউ আবার ইনসুলিন নিচ্ছেন বলে নিয়ম-কানুন সব ভুলে গিয়ে অনিয়ম শুরু করেন। বর্তমানে যেসব ইনসুলিন পাওয়া যায় নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে সমস্যা খুব কম হয়। তেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এসবের।
ইনসুলিনে সুগার কমে ওজন নয়
ইনসুলিন নিলেও খাবারে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ইনসুলিন নিলে ওজন বাড়তে পারে। এর সাথে অতিরিক্ত খাবার খেলে ওজন আরও বাড়বে এবং নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হবে। মনে রাখতে হবে ইনসুলিনে সুগার কমে, কিন্তু ওজন কমে না।
অনেক সময় পর্যাপ্ত ইনসুলিন নেওয়া সত্ত্বেও সুগার ঠিকভাবে কমে না। একে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলে। এ রকম হলে অর্থাৎ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হলে কিছু ওষুধ খেলে বা ব্যায়াম করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজ হয়।
বিভিন্ন রকম ইনসুলিন পাওয়া যায়। কোনোটা একবেলা আবার কোনোটা দুইবেলা বা তিনবেলা দেয়া যায়। কার জন্য কোনটা উপযুক্ত বা কার কোনটা লাগবে—সেটা একজন চিকিৎসকই ঠিক করবেন। বর্তমানে পেন সিস্টেমের ইনসুলিন পাওয়া যায়। এসবের ব্যবহার খুব সহজ, আবার খরচও নাগালের মধ্যেই।
ইনসুলিন ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ নয়
বাড়িতে ফ্রিজ না থাকলেও ইনসুলিন রাখতে সমস্যা নেই। গরমকালে পাত্রে পানি নিয়ে তার মধ্যে ইনসুলিনের ভায়াল রাখা যায়। শীতে এমনিতেই রাখা যায়। ঘরের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির কম হলে একমাস ইনসুলিন ভাল থাকবে। তবে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, ইনসুলিন ডিপ ফ্রিজে রাখা যাবে না৷
হঠাৎ রক্তের গ্লুকোজ কমে যাওয়া বিপজ্জনক
নিয়ম মেনে ইনসুলিন নিলে হঠাৎ রক্তের গ্লুকোজ খুব কমে না। তবে এই অবস্থা বেশ বিপজ্জনক। এই সময় নানারকম শারীরিক সমস্যা হয়। এ রকম হলে চিনি বা গ্লুকোজ পানি খেতে হবে। তাহলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাল হয়ে যাবে। এরপরেও যদি ভাল না হয় বা সমস্যা থাকে, তবে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। দেরি করলে বড় বিপদে পড়তে হবে।
ইনসুলিন বর্তমান সভ্যতার একটি আশীর্বাদ। ডায়াবেটিস রোগীর কোনো ইমারজেন্সি হলে ইনসুলিন দিয়েই চিকিৎসা করা হয়। এই সময় ট্যাবলেট খেয়ে লাভ হয় না, বরং জটিলতা হয়। ইনসুলিন নিলে নিয়ম করে খেতে হবে। চিকিৎসক যেভাবে বলেন সেভাবে চলতে হবে। তবেই পরিপূর্ণভাবে সুস্থ থাকা যাবে।
এমইউ