যে কারণে কয়েক দিনেও সরে না কুরবানির পশুর বর্জ্য
আবু নাঈম মনির: পবিত্র ঈদুল আজহার অন্যতম অনুষঙ্গ পশু কুরবানি। সারা বছর যত পশু জবাই হয় তার অর্ধেকই এই ঈদে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ঈদে প্রায় এক কোটি গরু কুরবানি হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় এবারও কোরবানির জন্য প্রস্তুত বিভিন্ন ধরনের এক কোটিরও বেশি পশু। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব পশুর বর্জ্যে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থেকে যায়। এজন্য কোরবানির পর সার্বিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে শেরেবাংলা কৃষি বিদ্যালয়ের (শেকৃবি) অ্যানিম্যাল প্রোডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের একটু খেয়াল রাখতে, যেন যত্রতত্র কুরবানি করা না হয়। এ ব্যাপারে সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু দিন পর হয় তো কেউ খোলা জায়গায় কুরবানি করতে পারবেন না। এখন যে ব্যবস্থাপনায় কুরবানি হচ্ছে, তা বড়ই চ্যালেঞ্জের। একটা সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন যদি শহরাঞ্চলে নির্দিষ্ট জায়গায় কুরবানি করার ব্যবস্থা করে দেয়, পাশাপাশি গ্রামেও যদি স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে করা সম্ভব হয়—তাহলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজতর হয়ে যায়। যত্রতত্র কুরবানি করলে বর্জ্য পরিষ্কার করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। যদিও সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকাগুলোর বর্জ্য তারা ২/১ দিনের মধ্যে পরিষ্কার করে ফেলে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। যদিও এটা ব্যাপক কষ্ঠসাধ্য।’
খোলা জায়গায় বর্জ্যে বাড়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকি
তিনি আরও বলেন, খোলা জায়গায় করা কুরবানির পশুর বর্জ্য কম সময়ের মধ্যে সরানো না হলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
পশু জবাইয়ের সময় বর্জ্য বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পশু জবাইয়ের সময় একটি গর্ত করে নিতে হবে। গর্তে রক্তটা ফেলে দিলে জবাইয়ের পর অনায়াসে মাটিচাপা দিয়ে দেওয়া যায়। এটা এজন্য করা জরুরি, রক্ত অনুজীবের (ব্যাকটেরিয়া) ব্যাপক মাধ্যম। মাটিতে পড়ে থাকা রক্ত তাৎক্ষণিকভাবে হয় তো বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে না, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকলে সেখানে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া জন্মাবে। এটা জন্মের হার খুব দ্রুতগতির। এ ছাড়া ভুঁড়ির বর্জ্য যদি যত্রতত্র না ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলা হয়, যেখানে মাছি বসতে পারবে না। এ রকম জায়গা ফেলতে হবে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পুকুরে ফেলা যাবে না। সেখানে মাছসহ অন্যান্য প্রাণী বিচরণ করতে পারে। এটাও যদি কোথাও গর্ত করে ফেলা যায়, তাহলে মাছি বসবে না। ভুঁড়ি বসত ভিটার অনেক দূরে ফেলে যদি ভাবেন, দুর্গন্ধ ও ময়লা কিছু আসবে না। সুতরাং আপনি নিরাপদ। কিন্তু বিষয়টি তা না। কারণ ওখানে মাছি বসার পর আপনার খাবার টেবিলেও চলে আসতে পারে। সুতরাং এসব বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলে রাখলে স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা থেকেই যায়।’
একাধিক দিনে কুরবানি করার আহ্বান
ঝুঁকি এড়ানোর পাশাপাশি বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সহজতর করতে ঈদের দিন সব কুরবানি না করে পরের দিনগুলো ভাগ ভাগ করে কুরবানির ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঈদের দিনই কুরবানি করতে হবে—এমনটি জরুরি না। পরের দিনও করা যাবে, এমনকি পরের তিন দিন পর্যন্ত করা যায়। ঢাকা শহরে কুরবানি করার মতো দুই লাখ লোক আছে, এক লাখ গ্রামে চলে যায়, এক লাখ ঢাকায় কুরবানি দেন। সিটি করপোরেশন চাইলে এই এক লাখের তিনটা গ্রুপ করতে পারে। সে অনুযায়ী, এক গ্রুপ ঈদের দিন, অন্য গ্রুপ পরের দিন এবং তৃতীয় গ্রুপটা তার পরের দিন কুরবানি করবে। এমনটি করা গেলে বর্জ্য অপসারণসহ সব কিছু সহজ হয়ে যায়।
বর্জ্য অপসারণে প্রস্তুত সিটি করপোরেশন
এদিকে বর্জ্য অপসারণে পূর্ণ প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বরাবরের মতোই ২৪ ঘণ্টায় সব বর্জ্য অপসারণে প্রতীজ্ঞ তাঁরা। এ ক্ষেত্রে নগরবাসীর সচেতনতা ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘ঈদের দিন সকাল ভাগে পশুর হাটের বর্জ্য অপসারণ করা হবে। এর পর দুপুর দুইটা থেকে শুরু হবে মূল কাজ। আমাদের ৭৫টি ওয়ার্ডে ৭৫টি প্রাইমারি কালেকশন সার্ভিস প্রোভাইডার (পিসিএসপি) আছে, যারা বাৎসরিক ভিত্তিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ময়লা সংগ্রহ করে। ময়লাগুলো তারা সিটি করপোরেশনের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে জমা করবে। পরে ৮-১০ ঘণ্টার মধ্যে এগুলো মাতুয়াইল ল্যান্ড ফিল্ডে মূল ভাগাড়ে স্থানান্তর করা হবে।’
যে কারণে কয়েক দিনেও সরে না পশুর বর্জ্য
শহরের কিছু কিছু জায়গায় কুরবানির পশুর বর্জ্য কয়েক দিন ধরে পড়ে থাকতে দেখা যায়—এমন প্রসঙ্গ তুললে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ সামান্য কষ্ট করে প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারীর হাতে ময়লার ব্যাগটা তুলে দেন না। এগুলো তারা বাসার আশপাশে রেখে দেন। ফলে এই বর্জ্যটা পিসিএসপি সদস্যদের অজ্ঞাতসারে থেকে যায়। এতে সৃষ্ট দুর্গন্ধে নগরবাসী দুর্ভোগে পড়েন। আমরা চেষ্টা করছি, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে। নাগরিকরা একটু সহযোগিতা করলে সিটি করপোরেশনের কাজটা সহজ হয়ে যায়।’
স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে যত্রতত্র কুরবানি না করে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে পশু জবাই করার আহ্বান জানিয়ে দক্ষিণ সিটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কাউন্সিলরের মাধ্যমে ওই এলাকার কসাই, ইমাম ও কুরবানীদাতাদের উদ্বুদ্ধ করেছি, এক জায়গায় কুরবানি দিতে। ওখান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা সুবিধাজনক। এতে সব জায়গার পরিবেশও দূষিত হয় না।’
সেই সঙ্গে অসুস্থ পশু চিহ্নিতকরণে হাটগুলোতে সিটি করপোরেশনের মেডিকেল টিম নিয়োজিত থাকার কথা জানিয়ে এ সংক্রান্ত যে কোনো প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতা নেওয়ার পরার্শ দেন ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী।
এমইউ