মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ ও পদ সৃষ্টি সময়ের অনিবার্য দাবি
সুচিকিৎসার অন্যতম পূর্বশর্ত রোগ নির্ণয়। কারণ সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা কল্পনাতীত। এই রোগ শনাক্তকরণ বা ডায়াগনোসিস প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমেই চিকিৎসাসেবায় সাফল্য পেয়েছে উন্নত দেশগুলো।
রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পাদন করা স্বাস্থ্যকর্মীরাই হলেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। রোগ নিরাময়ে চিকিৎসক ও নার্সদের পাশাপাশি এসব অদৃশ্য নায়কদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন মেডিকেল টেকনলোজিস্ট থাকতে হবে। তবে সরকারি পর্যায়ে ৩০ হাজার চিকিৎসক ও ৪৮ হাজার নার্সের বিপরীতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংখ্যা মাত্র ৫ হাজার ২০০, যাদের সবাই ডিপ্লোমাধারী।
অন্যদিকে ১০ হাজারের বেশি গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকলেও সরকারি পর্যায়ে তাদের পদ সৃষ্টি বা নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নেই।
সূত্রে জানা গেছে, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ডিপ্লোমাধারীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া। পাশাপাশি কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের অনেকের চাকরির বয়সও শেষ হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারি হাসপাতালে এসব স্বাস্থ্যকর্মীদের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
স্বাধীনতা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদের (স্বামেপ) আহ্বায়ক সদস্য ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম এম শিবলুর রহমান (মহসীন শিবলু) মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডিপ্লোমা সম্পন্নকারী মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে কাজ করছেন। চাকরি না পেয়ে একই পদে আসছেন গ্রাজুয়েটরা। এতে ডিপ্লোমাধারীদের পদ নষ্ট হচ্ছে। গ্রাজুয়েট ও পোস্ট গ্রাজুয়েটদের জন্য কোনো নতুন পদ নেই। এ জন্য আমাদের দাবি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদের যে ২টা নিয়োগ স্থগিত রয়েছে (২০১৩ ও ২০২০ সালের নিয়োগ), সে নিয়োগ বাস্তবায়ন ও গ্রাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য নতুন পদ সৃষ্টি।’
স্বল্প সংখ্যক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চলছে সেবা কার্যক্রম। এতে দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া। আর মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ গতিহীনতা। এই অচলাবস্থা নিরসনে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ ও গ্রাজুয়েট টেকনোলজিস্টদের পদ সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ প্রসারিত করা সময়ের অনিবার্য দাবি।
কম সংখ্যক টেকনোলজিস্ট নিয়ে পরীক্ষা কার্যক্রম চালানোর জটিলতা তুলে ধরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (এসএসএমসিএইচ) জ্যেষ্ঠ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কাজী হারুনুর রশীদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের ডিপার্টমেন্ট কম পক্ষে ৩২ জন টেকনোলজিস্ট দরকার। কিন্তু আছে ৮ জন। তাদের মধ্যে আবার করোনায় তিনজন মারা গেছেন। ফলে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে।’
‘একটি সিটি স্ক্যান মেশিন ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হলে চারজন টেকনোলজিস্ট লাগবে। কিন্তু আমরা জনবল সল্পতার কারণে এই মেশির ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে পারছি না’, যোগ করেন এই রেডিওগ্রাফার।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগের প্রধান মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মিসেস হাসিনা মোমতাজ বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠানে থাকার কারণে আমরা হয়তো বুঝতে পারছি না, কিন্তু পেরিফেরিতে যারা আছেন, তারা ঠিকই টেকনোলজিস্টদের শূন্যতা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘টেকনোলজিস্টের অভাবে হাসপাতালে পুরো সময় কাজ হচ্ছে না, ফলে রোগীদের বাইরে গিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত পরিমাণ টেকনোলজিস্ট নেই। ফলে যে রকম সেবা দেওয়া উচিত, সে রকম দিতে পারছে না।’
এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে কয়েকগুণ বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে রোগীদের। এতে অনেকেই হয়ে পড়ছেন সর্বস্বান্ত।
বিষয়টি তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাসরিন সুলতানা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মোট হেলথ খরচের ৬৮.৫ বা ৬৯ ভাগ আউট অব পকেট, অর্থাৎ ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হচ্ছে। এখানে সরকারের ব্যয় মাত্র ২৩ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার সাথে এটি তুলনা করলে সবচেয়ে কম। কিন্তু আউট অব পকেট অনেক বেশি। এই আউট অব পকেট ৬৯ শতাংশের বড় অংশ যাচ্ছে ড্রাগে এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রায় ১২ শতাংশ খরচ যাচ্ছে প্যাথলজিক্যাল টেস্টে।’
এদিকে স্বাস্থ্যখাতের এসব অপরিহার্য কর্মীর অভাবে সেবা ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘যেসব জায়গায় সংকট আছে, জনবল নেই সেগুলো নিতে হবে। বাংলাদেশে টেকনোলজিস্টদের অনেক পদ শূন্য আছে, সেই শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় এক্সরে মেশিন পড়ে আছে, রেডিওলজিস্ট নেই। টেকনোলজিস্টের অভাবে আমাদের ইসিজি বন্ধ হয়ে আছে। শূন্য পদ পূরণ করতে হবে। আর পদ না থাকলে নতুন পদ সৃষ্টি করে টেকনোলজিস্ট নিয়োগের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ জরুরি।’
এ প্রসঙ্গে বিএসএমএমইউ প্রো ভাই চ্যান্সেলর (একাডেমি) অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। সেক্ষেত্রে আমাদের এখন ব্যাংকক, ভারত, সিঙ্গাপুর সাথে প্রতিযোগিতা হবে। যাতে আমাদের স্বাস্থ্য খাত, চিকিৎসা ব্যবস্থা, জনবলের দক্ষতা ও সংখ্যাসহ সব কিছুতে ওইসব দেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে সক্ষম হয়।’
তবে সমস্যা সমাধানে কাজ চলমান আছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ে টেকনোলজিস্ট নিয়োগের জট খুলবে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মো. জামাল মেডিভয়েসকে বলেন, ‘টেকনোলজিস্ট আমাদের সার্ভিসের অন্যতম গুরুপূর্ণ একটা অংশ। এটা আমরা নিজেরাই অনুভব করি যে, একজনের জায়গায় যদি পাঁচজন টেকনোলজিস্ট পেতাম, তাহলে অবশ্যই আরও সেবা বেশি দিতে পারতাম।’
স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে নার্স সংকট কাটিয়ে উঠার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নার্সের আনুপাতিক হার খুব খারাপ পর্যায় ছিল, সেটা আমরা মোটামুটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এখন সরকারিভাবে ডাক্তার থেকে নার্সের সংখ্যাই বেশি। টেকনিশিয়ান সংকটও আমার কাটিয়ে উঠবো।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রচুর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের ইমারজেন্সি রেসপন্স টিমের মাধ্যমে রিকুয়েটমেন্ট হচ্ছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে, কিছু মামলা আছে—সেগুলো আমরা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছি। আমাদের দিক থেকে জনবল বৃদ্ধির যা যা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, তার সবই একই সঙ্গে চেষ্টা করছি।’