২৮ অগাস্ট, ২০২২ ০২:৪২ পিএম

ক্যারিঅন পুনর্বহাল ও জিপিএ পদ্ধতি বাতিল দাবি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের

ক্যারিঅন পুনর্বহাল ও জিপিএ পদ্ধতি বাতিল দাবি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মেডিকেলে নম্বর প্রদানে আদর্শ কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। একজন শিক্ষক পছন্দের শিক্ষার্থীকে ইচ্ছানুযায়ী নম্বর দিতে পারেন। শিক্ষকের অপছন্দের হওয়ায় অনেক ভালো শিক্ষার্থীকেও ফেল করিয়ে দেওয়ার বহু অভিযোগ আছে। এই অবস্থায় জিপিএ পদ্ধতিতে ফল প্রকাশিত হলে ভালো কিছু হবে না। জিপিএ রাখতে তাহলে পুরো পরীক্ষাটাই লিখিত করে দেওয়া হোক।

মো. মনির উদ্দিন: ক্যারিঅন পুনর্বহাল ও জিপিএ পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নতুন সিদ্ধান্তের কারণে মেডিকেল শিক্ষা ব্যাহত হবে, হুমকির মুখে পড়বে শিক্ষার্থীদের জীবন।

ভালো চিকিৎসক তৈরির যুক্তি দেখিয়ে ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ সমর্থন জানালেও অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এতে মেডিকেল শিক্ষার জটিলতা বাড়বে। আর জিপিএ পদ্ধতি মেডিকেল শিক্ষার সঙ্গে যায় না বলে মনে করেন বেশিরভাগ চিকিৎসক।

তবে বিএমডিসির দাবি, চিকিৎসা শিক্ষার সার্বিক ভালোর দিক বিবেচনা করে নতুন কারিকুলাম তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের চিন্তা-ভাবনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব না।

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের হতাশা বাড়বে

নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন হলে চ্যালেঞ্জ ও হতাশা বহুগুণে বেড়ে যাবে বলে মনে করেন মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। তারা জানান, মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ক্যারিঅন সিস্টেম বাতিল ও গ্রেডিং সিস্টেম চালু হলেও বিষয়টি হিতে বিপরীত হবে। এর ফলে চাপে ন্যুব্জ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিদারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী মো. আব্দুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমার পাস মার্ক হচ্ছে ৬০, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩। এ ছাড়াও সুনির্দিষ্ট নিয়মের ভেতর দিয়ে আমাদেরকে পাস করতে হয়। অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োক্যামিস্ট্রির মধ্যে অ্যানাটমির ফার্স্ট পার্ট, সেকেন্ড পার্টের ভাইভা হয়। এতে দুই পার্ট মিলিয়ে ৬০ মার্ক থাকতে হবে এবং লিখিত পরীক্ষায় ৬০ থাকতে হবে। একইভাবে ফিজিওলজির ভাইভাতে ৬০ ভাগ এবং লিখিত পরীক্ষায় ফার্স্ট পার্ট ও সেকেন্ড পার্ট মিলিয়ে ৬০ ভাগ নম্বর থাকতে হবে। বায়োক্যামিস্টিতেও একই পদ্ধতি। এই তিনটার পরে আবার অসপি ও প্র্যাক্টিক্যাল মিলিয়ে ৬০% থাকতে হবে। ফলে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ব্যাপক একটি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে প্রফ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়। প্রক্রিয়াটা ব্যাপক জটিল হওয়ায় মেডিকেল শিক্ষার্থীরা নানা চাপে ন্যুব্জ। এ অবস্থায় ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিল হয়ে গেলে তাদের হতাশা বহুগুণ বেড়ে যাবে।’

তিনি বলেন, কোনো কারণে কেউ অকৃতকার্য হলে, ব্যাচের সঙ্গে আর যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে না। তার এমবিবিএস কোর্স আরও প্রলম্বিত হবে। তার ব্যাচমেটরা ওয়ার্ডে যাবে, সেখানে রোগীর সঙ্গে কথোপকথনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, এই পদ্ধতি বাতিল করে দিয়ে তাঁরা মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি করতে চান। আমাদের প্রশ্ন হলো, তাহলে কি দেশে এ পর্যন্ত মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি হয়নি, যারা উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, বা নিচ্ছেন? আমাদের জানা মতে, তাদের অনেকেই একাধিক সাপ্লি খেয়েছেন, ক্যারিঅন পদ্ধতি থাকার কল্যাণে তারা অদম্য ইচ্ছায় আবার নিজেকে ফিরে পেয়েছেন। এই পদ্ধতি না থাকলে তো ওই শিক্ষার্থীর চিকিৎসক হওয়া কিংবা উচ্চশিক্ষা অর্জন কোনোটাই হতো না।

জিপিএ পদ্ধতির অপ্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে আব্দুল্লাহ বলেন, সিজিপিএ’র সুবিধা পাবে হাতেগুণা কয়েকজন শিক্ষার্থী, যারা পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য দেশের বাইরে যাবেন। অথচ বেশির ভাগ চিকিৎসকই দেশে থাকবেন। দু-চারজন শিক্ষার্থীর সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে এ রকম পক্ষপাতদুষ্ট পদ্ধতিতে ফল প্রকাশ করা হলে বহু শিক্ষার্থী অবমূল্যায়নের শিকার হবেন। আমরা বলবো, সিজিপিএ যদি চালু করতে হলে হয়, তাহলে পাস মার্ক ৩৩ করতে হবে, সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শুধু লিখিত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করতে হবে। তাহলে কোনো শিক্ষার্থী পক্ষপাতিত্বের শিকার হবে না।

নতুন কারিকুলাম নিয়ে ঢামেক ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী মো. সৌভিক ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মেডিকেল শিক্ষা এমনিতেই চাপের। এর মধ্যে যখন ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিলের মতো বিষয় সামনে আসবে, তখন পড়াশোনা গতিশীল নয়, বরং আরও বিঘ্নিত হবে। সুতরাং আমাদের দাবি হলো, পূর্ব থেকে চলে আসা ক্যারিঅন সিস্টেম আবার চালু করা হোক।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, যেই শিক্ষার্থী ফেল করেছে, তাকে যদি একটু সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে নিজেকে ভালো চিকিৎসক হিসেবে তৈরির সুযোগ পাবে। ভালো চিকিৎসক তৈরির যুক্তি দিয়ে ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিল করা হচ্ছে, অথচ সেই চিকিৎসক তৈরির মূল যাত্রা শুরু হয় তৃতীয় বর্ষ থেকে। তখন ওয়ার্ড শুরু হয়। এর আগে তো সব পুঁথিগত বিদ্যা।’

জিপিএ পদ্ধতির কারণে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়বে জানিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ সেশনের আরেক শিক্ষার্থী রিজভী আহমেদ ভূইয়া মেডিভয়েসকে বলেন, এ পদ্ধতি চালু হলে মেডিকেলগুলোতে পক্ষপাতিত্বের চর্চাও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।

এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ নর্থবেঙ্গল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী মো. আল হাফিজ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মেডিকেলে সিজিপিএ চালু হওয়া মানে এই কমিউনিটিকে দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া। এমনিতেই হাজারো ভাগ, এবার একদম খণ্ডখণ্ড করে দেওয়া হবে।’

‘আর ক্যারিঅন সিস্টেম তুলে নেওয়া মানে হলো, আপনি এখন ডু অর ডাই পরিস্থিতিতে পড়ে গেলেন। না পারবেন গিলতে, না পারবেন উগড়ে দিতে’, যোগ করেন তিনি।

একে নির্মমতা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনি মানুষের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে মেডিকেলে পড়বেন, কিন্তু নিজের স্বাস্থ্য বলে কিছু থাকবে না।’

বিএমডিসির নতুন পদ্ধতি নিয়ে ফরিদপুর ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন মেডিকেল কলেজের হাবিবা আফরীন তিমা মেডিভয়েসকে বলেন, এতে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। মেডিকেল পাস ফেল বিশেষ করে ভাইভা তো একেবারেই ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। অনেক ভালো প্রস্তুতি নেওয়ার পরও অনেক সময় পরীক্ষা ভালো হয় না। আবার অল্প প্রস্তুতিতে অনেক সময় ভাইভা ভালো হয়ে যায়। ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিল হলে পাঁচ বছরের মেডিকেল পরিক্রমা আরও দীর্ঘায়িত হবে। এমনিতে আমাদের অনেক সময় লেগে যায়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা অনেক আগেই বের হয়ে যায়। এটি বাতিল হলে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যাবে।  

এ ছাড়াও গ্রেডিং সিস্টেম চালু হলে চিকিৎসকদের মধ্যে বৈষম্য দেখা দেবে বলে মন্তব্য করে একই মেডিকেলের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী রাহুল শিকদার বলেন, ‘এর ফলে মানুষের মধ্যে আলোচনা হবে, ও ভালো চিকিৎসক, আর ও অত ভালো না। এতে রোগীরা অপেক্ষাকৃত কম গ্রেডধারীর কাছে যেতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। অথচ ভালো ফল করা শিক্ষার্থী মাত্রই ভালো চিকিৎক না। এতে মুখস্থ পড়াশোনায় ঝোঁক বাড়বে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য কখনোই গুরুত্বপূর্ণ না।

শিক্ষার মানোন্নয়নে কিছু বিকল্প 

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিওরোসার্জারিতে রেসিডেন্সি কোর্সে অধ্যয়নরত ডা. মো. মাসুদ রানা মেডিভয়েসকে বলেন, মেডিকেলে পছন্দ না হলে প্রায়ই শিক্ষার্থীকে ফেল করিয়ে দেওয়া হয়। নতুন পদ্ধতির ফলে সে আর উপরের ক্লাসে উঠার সুযোগ পাবে না। জুনিয়রদের সঙ্গে ক্লাস করতে হবে, এতে সে হতাশ হয়ে যাবে। মেডিকেল শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য একজন শিক্ষার্থীকে মানসিক চাপে ফেলার দরকার নেই। এর অনেক বিকল্প আছে, সেগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন: ক্লাসগুলো প্রাণবন্ত করে তোলার নিরন্তর চেষ্টা চালানো, ক্লাসের প্রতি তাদেরকে আগ্রহী করে তোলা। কারণ গতানুগতিক ক্লাসে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এ ব্যাপারে মনোযোগী হতে পারেন। অনেক কিংবদন্তি চিকিৎসক ছিলেন, যাঁদের ক্লাসে আসন ফাঁকা থাকতো না। আবার অনেক স্যারের নাম শুনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার। একজন শিক্ষার্থী কেন ক্লাসে আসে না, এ ব্যাপারে শিক্ষক তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তার সমস্যা জানার চেষ্টা করা যেতে পারেন। সুতরাং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিল নিষ্প্রয়োজন’, যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, মেডিকেলে আসার পূর্বে একজন শিক্ষার্থী বাবা-মায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিল। এটা মেডিকেলে নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে টিউটোরিয়াল শিক্ষক ও ব্যাচ ভাগ করে দেওয়া থাকে। সে মোতাবেক, ক্লাসে অনুপস্থিত এবং পড়াশোনায় পিছিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে এর কারণ খুঁজে বের করেন, তাহলে তারা পড়াশোনায় বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। তাদের মধ্যে দায়বদ্ধতা তৈরি হবে।

তিনি বলেন, এসব না করে ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিল করা হলে দুর্ভাগ্যবশত দুইবার ফেল করা কোনো শিক্ষার্থীর হতাশার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাবেন। তিনি পুরোপুরি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবেন। এ শক্তি একবার হারিয়ে ফেললে তার পক্ষে আর এগুলো সম্ভব না। অথচ মেধার প্রমাণ দিয়েই সে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। 

এমবিবিএসে বারবার তিক্ততার মুখোমুখি হয়েও উচ্চশিক্ষায় একবারে নিওরোসার্জারিতে পড়ার সুযোগের কথা জানান বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের এই সাবেক শিক্ষার্থী। বলেন, ‘আমি মেডিকেলের সবগুলো পরীক্ষাতেই সাপ্লির মুখোমুখি হয়েছি। তাতে কী হয়েছে? আমি প্রথমবারেই পোস্ট গ্রাজুয়েশনে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। ক্যারিঅন পদ্ধতি না থাকলে আমার পক্ষে এখানে আসা সম্ভব হতো না।’

সুতরাং এ সুযোগ না থাকলে সংকটে পড়া শিক্ষার্থী আরও গভীরতায় নিপতিত হবে। তাই ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিল না করে কোন কোন বিকল্প উপায়ে মানোন্নয়ন করা যায়, এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

মেডিকেল শিক্ষার সঙ্গে ‘গ্রেডিং যায় না’ 

মেডিকেলে জিপিএ পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের অযৌক্তিকতা তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফরেনসিক মেডিসিনে এমডি কোর্সে অধ্যয়নরত আরেকজন রেসিডেন্ট ডা. মো. সারোয়ার জাহান।

তিনি বলেন, যারা চিকিৎসক হবেন তারা রোগীদের চিকিৎসা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করবেন। আমার জিপিএ কত ভালো ছিল, সেটা দিয়ে কী আমি রোগী ডায়াগনোসিস করতে পারবো? ধরেন, প্রিন্সিপালের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে ভাইভায় ব্যাপক ভালো করলাম, ভালো সিজিপিএ অর্জন করলাম। তাই বলে আমার একাডেমিক মান অনেক ভালো? ভালো চিকিৎসক হওয়ার সঙ্গে সিজিপিএ’র কোনো সম্পর্ক নেই। মার্ক ভালো হলেই ভালো রোগী দেখতে সক্ষম হবো, বিষয়টি এ রকমও না। তাই মেডিকেল শিক্ষার সঙ্গে গ্রেডিং কিছুতেই যায় না। 

‘এত দিন যারা দেশের বাইরে গেছেন, তাদের তো কোনো সমস্যা হয়নি। যারা মেধাবী তারা তো বাইরে যাচ্ছেন। তারা যে দেশে গেছেন সেই দেশের লাইসেন্স এক্মাম দিয়ে পাস করে, তবেই সেখানে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। জিপিএ কোনো বিষয় ছিল না’, যোগ করেন তিনি। 

বিশেষজ্ঞদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া 

এ প্রসঙ্গে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রিদওয়ানুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেছেন, ‘মেডিকেল শিক্ষায় রোগীর নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো চিকিৎসকের কারণে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এটা রোগীর অধিকার, অর্থাৎ রোগীকে ভালোভাবে প্রেসক্রাইব করা। এসব বিবেচনায় শিক্ষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, শিক্ষার্থীরা কতগুলো মৌলিক জিনিস না জানা অবস্থায় মেডিকেল থেকে বের হতে পারবে না। কারণ এতে রোগীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। অন্যান্য পেশার শিক্ষার তুলনায় মেডিকেল শিক্ষায় অনেক বেশি মান নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এই কথাগুলো সফল বাস্তবায়ন চাইলে ক্যারিঅন সিস্টেম নামে কোনো জিনিস মেডিকেল শিক্ষায় থাকা উচিত না। এটা মেডিকেল শিক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ পদ্ধতি বাতিলের ফলে হয় তো ১০ ভাগ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যারা প্রকৃতই মেধাবী কিন্তু পরীক্ষায় খারাপ করেছে। তবে বেশিরভাগ খারাপ শিক্ষার্থী ভালো করার ব্যাপারে মনোযোগী হবে। ক্যারিঅন পদ্ধতিতে যারা পাস করছে, তারাই যথেষ্ট কোয়ালিফাইড না। সেখানে যারা ফেল করছে, তাদেরকেও যদি একই কাতারে রেখে তাদের সুবিধা নিশ্চিত করি, যেন পাঁচ বছরের মধ্যে পাস করে বের হতে পারে ...। শুধু তাদের সুবিধার দিকে তাকালে হবে না। জনস্বাস্থ্য ও জনগণের অধিকারের কথাও মাথায় আনতে হবে। দুনিয়ার কোথাও মেডিকেল শিক্ষায় ক্যারিঅন পদ্ধতি নেই।’

শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিবেচনায় ক্যারিঅন পদ্ধতি চালু হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মেডিকেল শিক্ষার বিবেচনায় এটা হতে পারে না। কারণ মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা আর দশটা শিক্ষার মতো না। সুতরাং সে পাস করেই পরের স্তরে যাক। শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করে মেডিকেল শিক্ষা হবে না। ওকে সেফ ডাক্তার হয়ে বের হতে হবে। তাদের সুবিধা নিশ্চিত করার চেয়ে সেফ চিকিৎসক বানানো অনেক বেশি জরুরি। মানুষ ভয় পাচ্ছে, তারা চিকিৎসকদের ব্যাপারে আস্থা হারাচ্ছে। এর সঙ্গে মেডিকেল শিক্ষার দৈন্যতা সরাসরি জড়িত। মেডিকেল শিক্ষার দুর্বলতাগুলোর অন্যতম হলো অটোপ্রমোশন অর্থাৎ ক্যারিঅন পদ্ধতি।’

তবে গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশকে পুরোপুরি অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ডাক্তারিতে কোনো গ্রেডিং থাকা উচিত না। পাস অথবা ফেল হবে। কেউ পাস করলো মানে, আমি তাকে স্বীকৃতি দিচ্ছি যে, সে সাধারণ রোগীদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সে যোগ্য। এখানে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ হওয়া উচিত না। এ পদ্ধতি যথেষ্ট ন্যায্য নয়। যেখানে আমার পরীক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট ন্যায্য না। প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়, অসপিগুলো ফাঁস হয়ে যায়। সেখানে গ্রেডিং দিয়ে ভালো কিছু হবে না। শিক্ষার্থীরা অবমূল্যায়নের শিকার হবে।’

বিদেশে পড়তে গেলে গ্রেডিং পদ্ধতি দরকার পড়ে, বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে, তিনি বলেন, ‘যারা দেশের বাইরে যাচ্ছে কিংবা যাবে, তাদের জন্য গ্রেডিং পদ্ধতিই গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্ব হলো, মেডিকেল শিক্ষায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আর তা হলো: পাস অথবা ফেল। পাস মানে সে কিছু জিনিস জানে, ফেল মানে জানে না। এখানে কোনো গ্রেডিং থাকা উচিত না।’

ক্যারিঅন পদ্ধতি বাতিল হলে মেডিকেল শিক্ষার জটিলতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মেডিসিন অনুষদের ডিন ডা. শাহরিয়ার নবী।

এ প্রসঙ্গে মেডিভয়েসকে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী কোনো কারণে পরীক্ষায় খারাপ করতেই পারে। ক্যারিঅন পদ্ধতিতে সে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতো। এই সুযোগ না পেলে সে পিছিয়ে যাবে। আবার আমরা বলছি, পাঁচ বছরের কোর্স নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় সে কোর্স থেকে বাদ হয়ে যাবে। ক্যারিঅন পদ্ধতি না থাকলে তার জন্য আরও জটিল হয়ে যাবে। এটা নিয়ে পর্যালোচনা হতে পারে। যেহেতু কথা উঠেছে। বিএমডিসির কারিকুলাম নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারা এটা নিয়ে এসেছেন। আমরা বলেছি, এটা জটিলতা তৈরি করতে পারে। নতুন পদ্ধতি আমরা শুরু করেছি। যদি মনে হয়, তাতে জটিলতা বাড়বে, তাহলে বিএমডিসি এ নিয়ে বিবেচনাও করতে পারে। এমন না যে এটা পরিবর্তন করা যাবে না।’

জিপিএ পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এখন সব ফলাফল জিপিএ পদ্ধতিতে প্রকাশিত হয়। বিশ্ববিদ্যায়ের সকল পরীক্ষা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), কুয়েট—সবগুলোর ফলাফলই এ পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হয়। এটা না হলে শিক্ষার্থীদের বিদেশে গিয়েও জটিলতায় পড়তে হয়। কারণ কোন গ্রেডে পাস করলো, তা চিহ্নিত করা যায় না। গ্রেডিং করলে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এতে তাদের ডিগ্রির মূল্যও বেড়ে যায়। এ নিয়ে নেগেটিভ চিন্তা করার সুযোগ নেই। এমনটি আমাদের মেট্রিক, ইন্টারমিডিয়েটেও অনুসরণ করা হচ্ছে। সুতরাং এখন এমবিবিএসে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা না হলেও পরবর্তীতে এটা বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে যাবে।

বিএমডিসির ব্যাখ্যা 

নতুন কারিকুলামে ক্যারিঅন বাতিল ও গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি তুলে ধরলে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. লিয়াকত হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, এমবিবিএসের নতুন কারিকুলাম ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টদের হাতে পৌঁছে গেছে। ২০২১-২২ সেশন থেকে এ কারিকুলাম কার্যকর হবে। শুধুমাত্র নতুন সেশনের শিক্ষার্থীরাই এ কারিকুলামের অধীনে পড়াশোনা করবে। যারা পূর্বের কারিকুলাম অনুসরণ করছিলেন, তারা সেটাই অনুসরণ করবেন। নতুন কারিকুলামে যে নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেটাই বাস্তবায়ন হবে।

এতে শিক্ষার্থীরা ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কে কী ভাবছেন, সেটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কারিকুলাম তৈরি হয় না। এটা প্রস্তুত করা হয়, সার্বিক বিবেচনা থেকে, অর্থাৎ যে চিকিৎসা শিক্ষা সবার জন্য ভালো হবে, সেভাবেই তৈরি করা হয়। শিক্ষার্থীদের চিন্তা-ভাবনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তো কারিকুলাম তৈরি করা সম্ভব না।’ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত