৩০ জুলাই, ২০২২ ০১:৫৪ পিএম
আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

‘ডা. তৌফিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ভিত্তিহীন, লিকুর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হবে’

‘ডা. তৌফিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ভিত্তিহীন, লিকুর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হবে’
ডা. তৌফিক আহমেদ।

আলী হোসাইন: আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক আহমেদের বিরুদ্ধে করা এলাকাবাসীর অভিযোগের কোনো ভিত্তি পায়নি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডা. নির্মলেন্দু রায় আজ শনিবার (৩০ জুলাই) দুপুর ১২টায় মেডিভয়েসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘ডা. তৌফিক আহমেদের বিরুদ্ধে করা এলাকাবাসীর অভিযোগের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। অভিযোগটি তদন্ত করেছে স্বাস্থ মন্ত্রণালয়। অভিযোগ নামায় অভিযোগকারী ছিল ৮৪ জন। এর মধ্যে মাত্র চারজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে তাদের বক্তব্য দিয়েছেন। সেটির কপি আমার হাতে এসেছে। এসব বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই এবং অভিযোগের পক্ষে শক্তিশালী কোনো প্রমাণ নেই। দ্রুতই তৈরি করা হবে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন।’

এর আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বরাবর ডা. তৌফিক আহমেদের বিরুদ্ধে সরকারি টাকা আত্মসাৎ ও গাছ কাটাসহ বিভিন্ন অনিয়মের লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল এলাকাবাসী। অভিযোগনামায় নাম ছিল ৮৪ জনের। যেটিকে মূলত ডা. তৌফিক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক মাহাবুব আলম লিকুর ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। এদিকে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে মাহাবুব আলম লিকুর বিরুদ্ধেও ডা. তৌফিক আহমেদ সিভিল সার্জন বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ডা. তৌফিকের বিরুদ্ধে করা অভিযোগে জানা যায়, প্রায় ২ বছর পূর্বে জেলার আদিতমারী উপজেলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন ডা. তৌফিক আহমেদ। যোগদানের পরেই হাসপাতালের কর্মচারীদের দিয়ে অন্যায় কাজ করার চেষ্টা করেন। তার হুকুমে বিধিবহির্ভূত কাজ করতে না চাইলে প্রতিবাদী কর্মচারীদের হুমকি দেন। তার আচরণে হাসপাতালের সাধারণ কর্মচারীরা ডা. তৌফিক আহমেদের ওপর ফুঁসে উঠেন। ওই হাসপাতালের ৯ জন কর্মচারী স্বেচ্ছায় বদলির জন্য সিভিল সার্জনের নিকট লিখিত আবেদনও করেছেন। এ ছাড়াও নিয়মানুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অফিস শনিবার হতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত খোলার নিয়ম, কিন্তু তা মানেন না ওই কর্মকর্তা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরকে প্রতি শনিবার অফিস বন্ধ রাখেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ডা. তৌফিক আহমেদ সিবিএইচসি হতে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা পিট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ প্রদান করেন। স্থানীয় কোটেশনের মাধ্যমে নির্মাণের আদেশ প্রদান করেন। তবে আদেশ না মেনে তিনি বিনা কোটেশনে তার বন্ধু রংপুর গংগাচড়ার মাধ্যমে নামমাত্র কোটেশনে পিট নির্মাণের কাজ করেন। কাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে টাকা উত্তোলন করেন। ২০২১-২০২২ আর্থিক বছরের করোনার ৯ লাখ টাকা ভাউচার ব্যতিরকে নিজে ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে উত্তোলন করেন। অথচ এই অর্থ হাসপাতালের কোনো স্টাফদের মাঝে প্রদান করা হয়নি।

এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করে আসছেন ডা. তৌফিক আহমেদ। তিনি গত বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) মেডিভয়েসকে জানান, ‘আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সত্য নয়। মাহাবুল আলম লিকু এলাকাবাসীর নাম দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি পাঁচশ টাকা করে বহিরাগত লোক ভাড়া করে আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধনও করেছেন।’ 

‘হাসপাতালের সাথেই বাড়ি হওয়ায় আত্মীয়স্বজন নিয়ে সে আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। তবে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লিকুর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে চাচ্ছে, আমি থামিয়ে রাখছি। কারণ, সরকারি নিয়মানুযায়ী এগুলো করার সুযোগ নেই। প্রক্রিয়া অনুযায়ী অভিযোগ দিয়েছি, সিভিল সার্জন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবেন।’ 

লিকুর বিরুদ্ধে প্রায় ৫০টির মতো অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা অভিযোগ করছেন, তারা লোকাল হেনস্তার শিকার হবে তাই এসব এখন বলা যাবে না। লিকু আমাকেও নানাভাবে হয়রানি ও নাজেহাল করছে।’

‘সত্যিকারে এলাকাবাসী আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি। ভ্যাক্সিন নিতে আসা লোকদের থেকে ভ্যাক্সিনের তালিকা তৈরি করা হবে বলে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। সেটিকে এলকাবাসীর স্বাক্ষর বলে চালিয়ে দিয়েছেন লিকু।’ 

লিকুর বিরুদ্ধে অভিযোগ

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মাহাবুব আলম লিকু কর্মস্থলে স্টাফদের সাথে দুর্ব্যবহারসহ বিভিন্নভাবে ভীতি প্রদর্শন ও জিম্মি করে অর্থ আদায় করেন। তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। লালমনিরহাট শহরের প্রাণকেন্দ্রে তার বিলাসবহুল পাঁচতলা অট্টালিকা রয়েছে। পরিবারের ও নিজের নামে ব্যাংকে আর্থিক সঞ্চয়, নামে-বেনামে বিভিন্ন স্থানে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রয়, দায়িত্ব ও কর্তব্যের বাহিরে ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। প্রশিক্ষণের পাঁচ লক্ষ টাকা উত্তোলন করেছেন কিন্তু বিতরণ করেননি। এ অবস্থায় প্রশাসনিক ব্যবস্থাগ্রহণের সূত্রপাত করায় তিনি ডা. তৌফিক আহমেদকে অফিস পরিচালনায় অসহযোগিতা, অফিসের অন্যান্য স্টাফদের সাথে নিয়ে কুটকৌশল করা, আত্মীয়স্বজন ও স্বার্থান্বেষী মহল দ্বারা ডা. তৌফিককে নাজেহাল করছেন। এ ছাড়া সাংবাদিক পরিচয়দানকারী কতিপয় সাইবার সন্ত্রাসী দ্বারা তাকে বিভিন্নভাবে সাইবার আক্রমণসহ হাসপাতাল কার্যক্রমকে সার্বিকভাবে বিপদগ্রস্ত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত আছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুলাই সংশ্লিষ্ট অফিস নথিসমূহ ও লিকুকে তলব করা হয়। কিন্তু মাহাবুব আলম লিকু উপস্থিত হয়ে মেডিকেলের চিকিৎসক কর্মকর্তাদের সামনে ডা. তৌফিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অসদাচরণ করেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. এনামুল হক, ডা. সুব্রত চন্দ্র রায় ও ডা. বিক্রম রায়।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করছেন মাহাবুল আলম লিকু। নিজেকে ভালো মানুষ দাবি করে শুক্রবার (২৯ জুলাই) তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। ডা. তৌফিক একজন ভালো মানুষ হয়েও কেনো ইচ্ছাকৃতভাবে এসব কাজ করছেন, তা বলতে পারছেন না লিকু।

নিজের একশতক জমিও নেই দাবি করে তিনি বলেন, তার সর্বোচ্চ ব্যাংক ব্যালেন্স আছে দুই থেকে তিন হাজার টাকা। বিপুল সম্পদ বলতে আসলে কিছুই নেই বলে দাবি তার। কেউ অনেক সম্পদ আছে বললে তার কিছু করার নাই। সম্পত্তি কি পরিমাণ আছে তা দেখার জন্য তিনি এই প্রতিবেদককে অনুরোধ জানান।

কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানববন্ধনের বিষয়ে মাহাবুব আলম বলেন, যানবাহন গ্যারেজ নির্মাণের কথা বলে আদিতমারী হাসপাতালের ৩০টি মেহগনি গাছ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে কর্তনসহ ডা. তৌফিকের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী অভিযোগ করছেন এবং মানববন্ধন করেছেন। এসব বিষয়ে তার কোনো হাত নেই।

‘ওনি (ডা. তৌফিক) সন্দেহ বশবর্তী হয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। তিনি আমাকে দেখতে পারেন না, এজন্য আমার ভালো খারাপ কোনো কিছুই সহ্য করতে পারেন না। আমি তার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ করিনি। নাজেহাল করার ব্যবস্থাও করিনি। তার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিলো। ওনি কেনো যে আমার বিরুদ্ধে কেনো অভিযোগ লিখেছিন,তা বুঝতে পারছি না।’ 

‘ওনি যেহেতু লিখছেন তাহলে তদন্ত করা হোক আমার অনিয়ম, সম্পত্তিসহ আর কি কি আছে। ওনি আমার অফিসার, তার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। তিনি আমার ক্ষতি করলে করুক। আমি কারো ক্ষতি চাইনা,’ যোগ করেন মাহাবুব আলম।

ডা. তৌফিককে নিজের অভিভাবক সম্বোধন করে মাহাবুব বলেন, ‘প্রশিক্ষণের টাকা উত্তোলনতো দূরে থাক, এখনো চেক পায়নি। আমি অনেক অভিযোগ দিতে পারি, তবে দিবো না। ওনি যা খুশি করুক। ওনি আমার কর্মকর্তা ও অভিভাবক।’

লিকুর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মচারীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ মো. শফিক আহমেদ সুজা মেডিভয়েসকে বলেন, মাহবুব জামান লিকুর অফিসের কোনো সহকর্মীকে ভয়ভীতি দেখাতে বা জিম্মি করে টাকা আদায় করতে দেখি নাই, শুনিও নাই। সম্পদের বিষয়ে বলেন, এলাকায় লিকুর কিছু সম্পত্তি রয়েছে, তবে নামে বেনামে রয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই।

লিকুর সহকর্মী ফার্মাস্টি মো. মাহফুজুল আলম বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। যা বলার ডা. তৌফিক আহমেদ বলবেন। স্যার না বললে, তিনি কথা বলতে পারবেন না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মচারী বলেন, ‘আসলে বুঝতেছি না ওনারা কেনো একজন অন্যজনের নামে অভিযোগ দিচ্ছেন। তবে লিকু ভালো মানুষ, স্যারও (ডা. তৌফিক) ভালো মানুষ।    

মাহাবুব আলম লিকুর বিরুদ্ধে করা অভিযোগের বিষয়ে লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডা. নির্মলেন্দু রায় আজ শনিবার (৩০ জুলাই) মেডিভয়েসকে বলেন, অভিযোগটি পেয়েছি। তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান medivoice[email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি