২৯ জুন, ২০২২ ০৫:২৮ পিএম

ফুটপাতের খোলা খাবারে ক্যান্সার-হৃদরোগের ঝুঁকি 

ফুটপাতের খোলা খাবারে ক্যান্সার-হৃদরোগের ঝুঁকি 
চিকিৎসকরা জানালেন, রাস্তার পাশে খোলা খাবার গ্রহণের ফলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও কলেরা হয়। এ ছাড়াও লিভার, ফুসফুস ও ব্রেনের জটিল রোগ হতে পারে।

আলী হোসাইন: রাস্তার পাশে তৈরি ও পরিবেশিত খাবারকে বলা হয় স্ট্রিটফুড বা রাস্তার খাবার। রাজধানীতে বিভিন্ন সড়কের পাশে কিংবা ফুটপাতে রয়েছে অসংখ্য খোলা খাবারের দোকান। এসব খাবার একদিকে সহজলভ্য, অন্যদিকে সস্তা হওয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়। দেখতে খুবই আকর্ষণীয় হলেও এসব খাবার বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বেশিরভাগ পথ-খাবারেই হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।

ক্ষতি জেনেও খোলা খাবারে অভ্যস্ত তরুণ-তরুণীরা

সাধারণত শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা ফুটপাতের খোলা খাবারের প্রতি অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কারণ, এসব খাবার খেতে বেশ সুস্বাদু। প্রস্তুতে বেশি সময় লাগে না বলে অর্ডার দিলেই অল্প সময়ে সরবরাহ করা সম্ভব হয়। পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দ্রব্যসামগ্রী কিনতে বাজারে বা দোকানে যেতে হয় এবং রান্না বা প্রস্তুতে সময়ের প্রয়োজন। অনেকেরই এত সময় থাকে না। তাই অল্প বয়সী তরুণ-তরুণীরা রেডিমেড খাবারেই বেশি অভ্যস্ত।

রাস্তার পাশে দাড়িঁয়ে সিঙরা খাচ্ছেন তেজগাঁও কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জামিল হোসেন। খোলা খাবার কেন খাচ্ছেন, জানতে চাইলে এ শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, বন্ধুরাসহ এক সাথে জড়ো হলে সিঙরা, বেলপুরি, জালমুড়ি, ফুসকা ও চটপটিসহ ফুটপাতে খোলা খাবার খেতে ভালো লাগে। শখের বশবর্তী হয়ে তিনি রাস্তার এসব খোলা খাবার খান। এ শিক্ষার্থী বলেন, এসব খাবার স্বাস্থ্য সম্মত নয় তারপরও ভালো লাগার কারণে খান।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন বলেন, সিঙরা, সমুচা খেলে তারা গ্যাস্ট্রিক সমস্যা হয়। এরপরও সে নিয়মিত রাস্তার পাশে খোলা দোকানের এসব খাবার খেতে খুব পছন্দ করে। এগুলো তার কাছে মুখরোচক ও সুস্বাদু মনে হয়। এসব খাবারে সে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

একটি বেসরকারি কোম্পানির মার্কেটিংয়ে চাকরি করেন নকিব উদ্দিন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। ফলে এসব ফুটপাতের দোকানেই খেতে হয়। যদিও এটা খাওয়া ঠিক না। কারণ, অনেক ধুলোবালি থাকে। অনেক সময় ঠিকমত প্লেট ধুতে পারে না। আমরা হয়তো জেনে-শুনেই ময়লা খাচ্ছি। কারণ, কম টাকায় সিঙরা-সমুচা পেতে চাইলে ফুটপাতের দোকানই ভরসা।

রাস্তার পাশে বসা চেয়ারে বসে ফুচকা চটপটি খেতে খেতে অনেকেই বলছিলেন, রাস্তার ধারের এই খাবার ঘরে তৈরি করলেও এমন স্বাদ মেলে না।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে ফুটপাতের এক দোকানি বলেন, রাস্তার খাবারে টুকটাক ধুলাবালি থাকতে পারে। এরপরও আমরা যতটা সম্ভব, পরিচ্ছন্ন রেখে পরিবেশনের চেষ্টা করি।

স্বাস্থ্যঝুঁকি

রাস্তার পাশে খোলা খাবার স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী নয় জানিয়ে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান মেডিভয়েসকে বলেন, বাতাসের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে থাকে। খোলা খাবারের সাথে এসব রোগ জীবাণু প্রবেশ করছে মানুষের শরীরে। এ জন্য রাস্তার পাশে খোলামেলা খাবার স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এসব খাবার গ্রহণের ফলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও কলেরা হয়। এ ছাড়াও লিভার, ফুসফুস ও ব্রেনের জটিল রোগ হতে পারে।

রাস্তার পাশে খোলা খাবার মানুষের কেনো এতো পছন্দ—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাসার খবার এবং স্ট্রিট ফুডে স্বাদের মধ্যে পার্থক্যের কারণ টেস্টিং সল্টসহ আরো কিছু উপাদান। তবে মূল কারণ টেস্টিং সল্ট। অতিরিক্ত স্বাদের জন্য চাইনিজ ফুড ও বাহিরের খোলা খাবারে এসব যুক্ত করা হয়। অথচ এসব টেস্টিং সল্ট অতিরিক্ত পরিমাণ গ্রহণ করলে পাকস্থলির ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার ও পিত্তথলি ক্যান্সার হতে পারে।

পুষ্টিগুণ সামান্য, ক্ষতিই বেশি

রাস্তায় যেসব খাবার পাওয়া যায় এর মধ্যে রয়েছে সিঙরা, সমুচা, ছোলা ভাজা, বেগুনি, আলুর চপ, ডালপুরি, ফুচকা, চটপটি, ভেলপুরি, পাকুড়া, হালিম, ঝালমুড়ি, জিলাপি, লেবুর শরবত ও আখের রস ইত্যাদি। এ ছাড়া বাড়তি খাবার হিসেবে থাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলু সিদ্ধ, স্যুপ, পোড়া পেঁয়াজ ও মরিচ, সালাদ ও নুডলস।

এসব খাবারে পুষ্টিগুণ থাকে সামান্য, কিন্তু ক্ষতিকর প্রভাব থাকে অতি বেশি, এমনটি জানিয়ে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বলেন, সব খাবারে কিছু না কিছু পুষ্টিগুণ থাকে। তবে রাস্তার পাশে খোলা খাবারে পুষ্টিগুণের চেয়ে ক্ষতিকর দিকটা অনেক বেশি। তরুণ-তরুণীরা প্রিয় খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে ফাস্টফুডকে। ফলে, খুব অল্প বয়সে হার্টের রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। বিশেষ করে ফ্যাটি লিভার প্রচুর আলোচিত হচ্ছে।

ফুটপাতের আখের রসে হেপাটাইসিসের ঝুঁকি

ফুটপাতের আখের রসে হেপাটাইসিসের ঝুঁকি আছে জানিয়ে ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বলেন, হেপাটাইসিস, যেটিকে জন্ডিস বলা হয়, তা এসব খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। রাস্তায় তৈরি বিভিন্ন ফলের রসে থাকে অসংখ্য জীবাণু। যেসব যন্ত্রপাতি বা আনুষঙ্গিক ব্যবহার্য দিয়ে ফলের রস তৈরি করা হয় এবং যেসব গ্লাস বা পাত্রে তা পরিবেশিত হয়, সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ময়লা ও জীবাণুতে ভর্তি থাকে। ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানি দিয়ে বারবার একই গ্লাস ধোয়া হয়। বিক্রেতার হাতে গ্লাবস, মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ থাকে না। যে কারণে এ রোগগুলো ছড়িয়ে পড়ছে।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে খাদ্যদ্রব্যে রাসায়নিক দূষণ ও জীবাণু সংক্রমণ বিষয়ে এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ রাস্তার খাবারেই ই-কোলাই, সালমোনেলা ও ইস্ট মোল্ডের মতো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া গেছে।

দূষিত খাবারে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি  

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয় এবং প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ মারা যায়। এছাড়া, ৫ বছরের চেয়ে কম বয়সি শিশুদের ৪৩ শতাংশই অনিরাপদ খাবারজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে প্রতিবছর মারা যায় ১ লাখ ২৫ হাজার শিশু।

তাই স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ ও বাহিরের খোলা খাবার বর্জনের পরামর্শ দিয়ে ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বলেন, বেঁচে থাকার জন্য খাবারের প্রয়োজন রয়েছে। তবে শরীর সুস্থ রাখতে বাহিরের খোলা খাবার বর্জন করতে হবে। এসব খাবার তৈরিতে একই তেল বারবার পোড়ানো হয়। ফলে এসব তেলেভাজা মাংস খেলে কোলন ক্যান্সার হতে পারে। তাই নিজেকে সুস্থ রাখতে শাকসবজি-ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে। এতে শরীরের ওজন, হৃদরোগ, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টরেল নিয়ন্ত্রণে থাকবে। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে