ডা. এম. কামরুজ্জামান মজুমদার 

ডা. এম. কামরুজ্জামান মজুমদার 

সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ,
ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


০৮ এপ্রিল, ২০২২ ০৩:১২ পিএম

রোজায় ডায়াবেটিস রোগীর খাবার ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

রোজায় ডায়াবেটিস রোগীর খাবার ও স্বাস্থ্য সচেতনতা
রোজায় ডায়াবেটিস রোগীদের খাবার ও ওষুধ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগীরা অবশ্যই রোজা রাখতে পারবেন। তবে রোজার এক বা দুই মাস পূর্বে তাদেরকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে জেনে নিতে হবে, তার ডায়াবেটিসের অবস্থা, নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়, ডায়াবেটিস নিয়ে রোজা রাখার নিয়ম। রোজা রাখার জন্য শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ ঠিক আছেন কিনা, এজন্য পরীক্ষা করে নিতে হবে। বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস আক্রান্ত ৫০ কোটির বেশি মানুষ রোজা পালন করছেন। তবে কিছু ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা রাখতে নিষেধও করা হয়। কখন রোজা ভাঙতে হবে, রোজায় কিভাবে ডায়াবেটিস মাপতে হবে, এসব বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।  

খাবার

রোজার মাসে শরীরের খাবারের চাহিদা অন্যমাসের মতো একই। কিন্তু খাবারে কিছুটা পরিবর্তন করতে হবে। খাবারের মূল জিনিসটা হলো ক্যালরি। ক্যালোরির চাহিদা একই থাকে। একজন ৬০-৭০ কেজি ওজনের ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির রোজায় ইফতারে খাবারের তালিকায় যা থাকবে- ছোলা এক কাপ, পেয়াজু ৩ টা, বেগুনি ৩টা, মুড়ি ২ কাপ। এ ছাড়া কম মিষ্টি ফল খাবেন। যেমন: নাসপাতি, সবুজ আপেল, বরই, জাম্বুরা ও আমলকি। এর বাহিরে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেতে হবে। কেউ চাইলে ইফতারে স্বাভাবিক খাবার খেতে পারেন। যেমন: রুটি ৩টা, সঙ্গে মাছ বা মাংস এক থেকে দুই পিস, এক কাপ ডাল ও পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি। সালাদ এবং যেসব খাবারে ক্যালরি কম, সে ধরনের খাবার খেতে পারেন। সাহরিতে ঠিক একই রকম খাবার খেতে পারেন । যদি ভাত খান, তাহলে দুই থেকে তিন কাপ, সঙ্গে মাছ বা মাংস এক থেকে দুই পিস ও শাকসবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবেন। এই দুইটা মিলের মাঝেও অর্থাৎ সাহরি ও ইফতারের মাঝে এক থেকে দুই বার হালকা নাশতা খেতে পারেন। 

ওষুধের নির্দেশনা

রোজার মধ্যে খাবারের নিয়ম পরিবর্তন হয়ে যায়। এজন্য ইনসুলিনও সেভাবে পরিবর্তন করে নিতে হবে। ইফতারের সময় ইনসুলিনটা বেশি নিতে হবে। ওষুধের ডোজগুলো ইফতারে সময় বেশি হবে। সাহরির পর লম্বা সময় খাবার খাওয়া হয় না। এজন্য ইনসুলিন এবং অন্য ওষুধের পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন: যে ওষুধগুলো স্বল্প সময় কাজ করে সেগুলো পরিবর্তন করে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে এমন ওষুধ নিতে হবে। প্রয়োজনে সাহরির সময় ইনসুলিনের পরিমাণ কমাতে হবে।

ঝুঁকি

রোজায় ডায়াবেটিস রোগীরা যে ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, তা হলো-সুগার অত্যাধিক মাত্রায় কমে যাওয়া, যেটিকে বলা হয় হাইপোগ্লাইসেমিয়া। যদি কারও রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ প্রতি লিটার ৪ মিলিমোলের (প্রতি ডেসিলিটারে ৭০ মিলিগ্রাম) কম হয়ে যায়, তবে এটিকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। আবার কারও যদি রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে ৩০০ মিলি গ্রামের ওপরে উঠে যায় তবে সেটিকে বলে হাইপারগ্লাইসেমিয়া।

রোজার মাসে মানুষের খাদ্যাভাসে আমূল পরিবর্তন হয়। অনিয়ন্ত্রিত খাবারে সুগার বেড়ে যেতে পারে। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর বাহিরে আরো কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে। মানুষ সাধারণত বছরের ১১মাস দিনের বেলায় বেশি খাবার খায়, রাতের বেলায় কম খাবার খায়। রোজার মধ্যে সব খাবার রাতে খাওয়া হয়। ফলে, দীর্ঘসময় খাওয়া হতে বিরত থাকতে হয়। পানি না খেয়ে থাকতে হয়, এজন্য পানি শূন্যতা তৈরি হয়। এতে মানুষের রক্ত জমাট বাধার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

যখন রোজা ভাঙা যাবে

ডায়াবেটিসের কারণে কিডনি, হার্ট, ব্রেন ও লিভারের সমস্যা হয়। রোজায় এ ধরনের সমস্যা মারাত্মক আকার হলে ডায়াবেটিস রোগীর রোজা রাখা জরুরি না। তখন রোগীর সুস্থতা বেশি প্রয়োজন। রমজান মাসে ডায়াবেটিস রোগী রোজা রাখতে চাইলে রোজার পূর্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। রোজার আগের মাস অর্থাৎ শাওয়াল মাসে দুই বা তিনটা রোজা রেখে দেখবেন যে, আপনি রোজা রাখতে পারবেন কিনা? রোজার মাসে আপনাকে ৩০টা রোজা রাখতে হবে। এজন্য আগে শারীরিক সক্ষমতা দেখতে হবে। 

অতিরিক্ত ক্ষুদা লাগা মানুষের একটি খারাপ দিক। দুইটি কারণে এ সমস্যা হয়- এক. সুগার যদি অস্বাভাবিক বেড়ে যায় তখন প্রস্রাবের সাথে সুগার বের হয়ে যায়। ফলে রোগী বারবার খেতে চাইবে। দ্বিতীয় কারণ. সুগার যদি অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে যায় তখনও এ লক্ষণটা দেখা দেয়। এ অবস্থায় দ্রুত সুগার পরীক্ষা করতে হবে। এ বিষয়ে শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধান হলো-রোজা রাখা অবস্থায় সুগার চেক করতে পারবেন। প্রয়োজনে ইনসুলিন নিতে পারবেন। 

সুগার যদি প্রতি ডেসিলিটারে ৭০ মিলিগ্রাম এর নিচে নেমে যায়, তাহলে রোজা ভাঙতে হবে। আবার সুগার যদি প্রতি ডেসিলিটারে ৩০০ মিলি গ্রামের ওপরে উঠে যায় সেক্ষেত্রেও রোজা ভাঙতে হবে। বাইতুল মোকারমের সাবেক খতিব মাওলানা ক্বারী ওবায়দুল হক এ বিষয়ে একটি ফতুয়া দিয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবেও একটি ফতুয়া আছে। এখানে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া দৈনিক ৫ থেকে ৭ বার সুগার পরীক্ষা করতে পারবেন। সাহরির পূর্বে, সকালে ও বিকালে এবং সন্ধ্যায় ইফতারে পূর্বে ও দুই ঘণ্টা পরে পরীক্ষা করতে পারবেন। রোজা অবস্থায় অস্বাভাবিক ক্ষুদা লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে সুগার পরীক্ষা করতে পারেন, এতে রোজা ভাঙবে না। 

ব্যায়াম

রোজায় ব্যায়ামেরও পরিবর্তন হয়। তারাবিহ নামাজ ব্যায়াম হিসেবে গণনা করা হবে। কারণ, প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত নামাজ হয়, এতে শারীরিক ব্যায়াম হয়ে যায়। এজন্য রোজা রেখে ব্যায়াম না করাই ভালো। এর পরেও যদি কেউ ব্যায়াম করতে চান, তাহলে সাহরি খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে করলে ভালো হয়। ব্যায়ামের মূলত কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। যখন সুযোগ হয় তখন করবেন। দিনে হোক, রাতে হোক। তবে হালকা ব্যায়াম করবেন। যেমন: হেঁটে বাজারে যাওয়া। 

সাধারণ মানুষের খাদ্যাভাস

ডায়াবেটিস রোগী এবং সাধারণ মানুষের খাদ্যাভাসের ক্ষেত্রে মূল জায়গাটা একই থাকবে। শরীরের ওজন অনুযায়ী ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে। ডায়াবেটিসে যেহেতু সুগার কমে বা বেড়ে যাওয়ার ব্যাপার আছে, তাই ডায়াবেটিস রোগীদের কিছু অতিরিক্ত বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। সবার উচিতৎ অতিরিক্ত সুগার না খাওয়া। যেসব খাবার খাবেন-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যেমন: বাদাম, মাছ, শাক সবিজি ও ফলমূল। এ ছাড়া ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কার্বোহাইড্রেট, ২০ থেকে ৩০ ভাগ প্রোটিন যুক্ত খাবার ও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেতে হবে এবং ভারী খাবার ত্যাগ করতে হবে।

পরামর্শ

ডায়াবেটিস রোগীদের প্রথম কাজ হলো-জানতে হবে কিভাবে বিভিন্ন অবস্থায় খাবার এবং ওষুধের পরিবর্তন করতে হয়। তারপর তার কোনো শারীরিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে কিনা। যে যতো ভালোভাবে বুঝবেন তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ তত সহজ হবে এবং জটিলতা কম হবে। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন। ডায়াবেটিসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রোজা যখন শুরু হবে ওষুধ, ব্যায়াম ও খাবারে পরিবর্তন করতে হবে। ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পেলে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। জীবন-যাপন পদ্ধতি ঠিক করলে এটি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এজন্য নিয়ম মেনে খাবার খেতে হবে, পর্যাপ্ত তরল খাবার খেতে হবে, শাকসবজি ও ফলমূল খেতে হবে এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার ত্যাগ করতে হবে। 

এএইচ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত