ডা. শরীফ উদ্দিন
এমবিবিএস (সিএমসি), সিসিডি (বারডেম) ডি-অর্থো (নিটোর),
হাড়-জোড়া, বাত ও ব্যথা বিশেষজ্ঞ অর্থোপেডিক ও ট্রমা সার্জন
০১ মার্চ, ২০২২ ১১:২৩ এএম
চিকিৎসা পেশায় সৎ ও স্বচ্ছল জীবনের প্রতিশ্রুতি
জীবনে সততা এবং স্বচ্ছলতা খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটো বিষয়। এ দুটো জিনিস কেউ যদি এক সঙ্গে পেয়ে যান, তাহলে মোটের উপর তাকে সফল মানুষ বলা যায়। সমস্যা হচ্ছে, এ দুটো মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ বিষয়। আপনি যদি সৎ হন, তাহলে স্বচ্ছলতা জানালা দিয়ে পালাবে। যদি স্বচ্ছল থাকতে চান, সততার কথা আপনাকে ভুলে যেতে হবে।
ফরাসি নৈরাজ্যবাদী Pierre-Joseph Proudhon বলেছেন, Property is theft. মানে সম্পত্তি হচ্ছে চোরাই মাল। আধুনিক যুগ তাঁর এই স্লোগানকে অমরত্ব দান করেছে।
এই সমাজ ব্যবস্থা আপনাকে খুব অল্প ক্ষেত্রেই সততার সঙ্গে স্বচ্ছলতার জীবন পালন করতে দিবে। আপনি ব্যবসা করতে যান, সৎ থাকলে টিকতে পারবেন না। আপনি সরকারি চাকরি করতে যান, সৎ থেকে চাকরি করতে গেলে পরিবার চালাতে হিমশিম খাবেন, বান্দরবান সুন্দরবনে পোস্টিং হয়ে যাবে। এর মাঝে ব্যতিক্রম থাকতে পারে। কিন্তু সৎভাবে স্বচ্ছল থাকা বাংলাদেশে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।
এ রকম আর্থ-সামাজিক অবস্থার মধ্যে একমাত্র চিকিৎসা পেশায় আপনি এই দুটোর মধ্যে সমন্বয় করতে পারবেন। আপনি যদি চিকিৎসক হোন, তাহলে দুর্নীতি না করে, কমিশন না খেয়ে, অযথা রোগীকে হয়রানি না করে এবং সর্বোপরি নিজের প্রতি সৎ থেকে মোটামুটি একটি স্বচ্ছল জীবন আপনি কাটিয়ে দিতে পারবেন। এ পেশায় চ্যালেঞ্জ, ঝুঁকি ও কষ্ট অনেক বেশি এবং আপনার স্যাক্রিফাইসও অনেক বেশি। কিন্তু তার বিনিময়ে সৎ এবং স্বচ্ছল জীবনের যে প্রতিশ্রুতি, সেটা কিন্তু মিথ্যে নয়।
আপনি হয়তো আপনার সঙ্গে একই বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে পুলিশে যাওয়া বন্ধুর ক্ষমতা আর প্রশাসনিক ক্যাডারের যাওয়া বন্ধুর ঠাটবাট দেখে হতাশ এবং ক্ষুদ্ধ হন; কিন্তু আপনার মনে রাখা উচিত, সরকার তাদের এ রকম সুবিধা দেয়, কারণ বিভিন্ন উপায়ে সরকারের কাজগুলো তাদের দ্বারা করিয়ে নেয়। আপনি সেই ঝামেলাগুলো থেকে মুক্ত। এটি আল্লাহর অনেক বড় একটা নেয়ামত।
পুলিশ কিংবা প্রশাসনেও অনেক ভালো এবং সৎ লোক আছেন। কিন্তু ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখবেন, তাদের অবস্থা কেরোসিন। তাই, আপনি যদি চিকিৎসক হয়ে থাকেন, তাহলে শত সমস্যার মাঝেও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করুন।
পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে চিকিৎসা পেশা চ্যালেঞ্জিং। আমাদের দেশে এর পাশাপাশি চিকিৎসকদের বাড়তি অনেক ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, নবীন ডাক্তারদের আত্মপরিচয়ের সংকট, জ্যেষ্ঠদের অসহযোগিতা, সাংবাদিকদের সিন্ডিকেট শয়তানি—চিকিৎসা পেশাকে আরো চ্যালেঞ্জিং করেছে। একজন নবীন চিকিৎসক হিসেবে এই হতাশার চিত্র আমি জানি। কিন্তু তারপরও আমি জানি, আমি খুব ভাগ্যবান।
টাইম মেশিনে চড়ে আমি যদি আমার ছেলেবেলায় চলে যেতে পারতাম এবং সেখানে যদি আমাকে আবার জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের সুযোগ দেয়া হতো, তাহলে কিছুক্ষণের জন্য দ্বিধায় পড়ে যেতাম। পুকুরে ভেসে উঠা চিকিৎসক মুরাদের মৃতদেহ, সাতক্ষীরায় লাঞ্ছিত ডা. শম্পা রানীর অসহায় চেহারা, বগুড়ায় বিনা অপরাধে কারাগারে যাওয়া ডা. আল্লামা মোস্তফা, কিডনি চুরির হাস্যকর মিথ্যা অভিযোগে থানায় আটক ডা. হান্নান স্যারের চেহারাগুলো কিছুক্ষণের জন্য আমাকে দ্বিধায় ফেলে দিবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি আবার চিকিৎসকই হতে চাইবো। আমার ধারণা, সব চিকিৎসক এ রকমই চাইবেন। তাই চিকিৎসা পেশার এতো হতাশার চিত্র জানা থাকার পরও চিকিৎসক দম্পতি খুব বড় ব্যতিক্রম ছাড়া নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিকিৎসকই বানাতে চান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েপড়া হতাশায় আক্রান্ত চিকিৎসক সমাজের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। ফেসবুকে ঢুকলে দেখি, আপামর জনসাধারণ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে খেপে আছে, চিকিৎসকরা রোগীদের বিরুদ্ধে খেপে আছে। অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা এগুলোকে পুরোপুরি সত্য বলে না। পেরিফেরিতে ক্ষেপ মেরেছি, একটা ব্যস্ত সরকারি ইনস্টিটিউটে কোর্স শেষ করলাম। এই নাতিদীর্ঘ সময়ে আমার কখনোই মনে হয়নি, রোগীরা ডাক্তারদের মারার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। এখনো বাংলাদেশের অধিকাংশ লোকজন ডাক্তারদের প্রচণ্ড সন্মান করে।
তাই ফেসবুকে যেসব আঁতেল ‘ডাক্তারদের স্যার কেনো ডাকবো’ কিংবা ‘এটা কলোনিয়াল মানসিকতা'—টাইপের তর্ক জুড়ে দেয়, এরা বাংলাদেশ না। এদের সঙ্গে তর্ক করে সময় এবং মেজাজ নষ্ট করাটা বোকামি।
নিজের পেশা নিয়ে তৃপ্ত হোন, নিজের ডিগনিটি নিয়ে সচেতন হোন। আপনি একজন 'আরোগ্য শিল্পী '। হতাশা ঝেড়ে ফেলুন। নিজেকে আরো দক্ষ এবং যোগ্য করুন। যদি সম্ভব হয়, আবার জেনেভা ডিক্লারেশন পড়ে নিন। নিজের কোনো সহকর্মীর বদনাম করবেন না। কোনো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি থেকে বাড়তি সুবিধা নেবেন না। ডায়াগোনস্টিক সেন্টার থেকে কোনো কমিশন খাবেন না। আমি জানি, খুব অল্প সংখ্যক ডাক্তার এগুলো করে। সেই অল্প সংখ্যকের একজন আপনি হবেন না। এটা শুধু অসততার ব্যাপার না, আপনার মহান পেশার ডিগনিটির সাথে এটা যায় না।
খুব অসৎ হওয়ার ইচ্ছা থাকলে এক বছর কষ্ট করে ভালোভাবে প্রিপারেশন নিয়ে বিসিএস পুলিশ বা প্রশাসনে যান। ওখানে দুই নাম্বারি জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে জনগণের ঐকমত্য আছে।
রোগীর সাথে হাসিমুখে কথা বলুন, ভালো ব্যবহার করুন। আপনি যদি ধার্মিক হোন, তাহলে মনে রাখুন হাসিমুখে কথা বলা ইবাদত। আর যদি ধার্মিক না হোন, তাহলে ভালবাসার শক্তিতে বিশ্বাস রাখুন।
এর পাশাপাশি নিজেদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হোন। নিজেদের নেতাদের ঠিক করুন। জীবন অনেক চমৎকার। একজন চিকিৎসকের জন্য জীবন আরো বেশী বর্ণিল।
প্রিয় আরোগ্য শিল্পী, নিজের পেশাকে উপভোগ করুন। আপনার শৈশব, কৈশোরে দেখা চমৎকার স্বপ্নটি কখনোই ভুল ছিল না। আর হ্যাঁ, এই মহাবিশ্বের একজন ভাগ্যবান মানুষ হিসেবে অভিনন্দন গ্রহণ করুন।