ডা. রিফাত আল মাজিদ
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ক্যান্সার কেয়ার এন্ড রিসার্চ ট্রাস্ট, বাংলাদেশ।
ক্লিনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর, র্যামফিট মেডিকেল কনসাল্টেশন সেন্টার, মগবাজার, ঢাকা।
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ০২:৪৯ পিএম
দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা: প্রত্যাশা ও প্রতিবন্ধকতা
দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। চিকিৎসক স্বল্পতা থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নিয়ে অভিযোগও নতুন কিছু নয়। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপে দিন দিন পরিস্থিতি আরো নাজুক হচ্ছে। সেই সাথে রয়েছে প্রাইভেট স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা ও ব্যবসায়িক মনোভাব। চিকিৎসা সেবা অসহায় মানুষের জন্য অধিকার থেকে আজ করুণার বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে সবচেয়ে অবহেলিত হচ্ছে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা ব্যবস্থায় কারোরই যেন অবহেলার অন্ত নেই। দেশে সার্বিক ভাবে ক্যান্সার চিকিৎসায় যথোপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ অপ্রতুল। রোগীর ভারে আজ সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হচ্ছে না। কারণ, ক্যান্সার চিকিৎসা একটি জটিল পদ্ধতি তার থেকেও জটিল ক্ষেত্র বিশেষ ক্যান্সার নির্ণয় করা।
ক্যান্সার রোগটি অন্যান্য সকল রোগ থেকে অনেকটাই আলাদা। এখানে ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী চিকিৎসার বিভিন্ন স্তর নির্ধারিত হয় এবং একেক স্তরে চিকিৎসা পদ্ধতিও ভিন্ন হয়। সকল ক্যান্সার এক রকম নয়, এই ধারণাটা সবার আগে বুঝতে হবে। আবার একই জাতের ক্যান্সারের মাঝেও অনেক রকমভেদ রয়েছে। সেগুলোর উপরেও চিকিৎসা ভিন্ন ধরনের হয়। সার্জারি, কেমোথেরাপি কিংবা রেডিওথেরাপি কোন অবস্থায়, কখন, কিভাবে দিতে হবে? সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া চিকিৎসকদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রোগীদের একের পর এক পরীক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিন্তু চিকিৎসা শুরু করা যাচ্ছে না। পরীক্ষাগুলো অনেক ব্যয়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ। এসবের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও রোগীদের পর্যাপ্ত কাউন্সেলিংয়ের অভাবে তাদের মধ্যে ভুলবুঝাবুঝি নিত্য দিনের চিত্র।
উন্নত দেশের মত আমাদের দেশে একজন রোগীর জন্য মাল্টিডিসিপ্লিনারি মেডিকেল বোর্ড যেন আকাশকুসুম কল্পনা। যার কারণে, এখান থেকে সেখানে ছুটোছুটি করতে করতেই দীর্ঘায়িত হয় সঠিক চিকিৎসা। ক্যান্সার সনাক্তকরণের জন্য শুরুতে প্রয়োজন হয় বায়প্সি পরীক্ষা। আক্রান্ত স্থান থেকে মাংস কেটে এনে বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট চিকিৎসক সেটি পরীক্ষা করেন। আরো আছে এফ এন এ সি পরীক্ষা যেটি সুই দিয়ে করা হয়। এসব ক্ষেত্রে সবসময় সঠিক রোগ নির্ণয় করা যায় না। তবে একটা ধারণা পাওয়া যায় এবং অনেকক্ষেত্রে এর মাধ্যমেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ঝুকি বিবেচনায় চিকিৎসকরা এটা করে থাকেন। কিন্তু রোগী ও তার স্বজনরা সঠিক কাউন্সেলিং ও জ্ঞানের অভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এ ছাড়া আর্থিক জটিলতা ক্যান্সার চিকিৎসায় অন্যতম বাধা ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
ক্যান্সারের ধরন সনাক্ত করার জন্য করা হয় ইম্যুনো হিস্ট্রোক্যামিস্ট্রি। এই পরীক্ষা ক্যান্সারের প্রকৃত অবস্থা উদ্ভাবন করে এমনকি কোন ধরনের মেডিসিন প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ নিরাময়ে সবচেয়ে বেশি উপযোগী হবে সেটার প্রমাণ দেয়।
এ ছাড়াও ক্যান্সার চিকিৎসায় স্ট্যান্ডার্ড স্টেইজিং ইনভেস্টিগেশন লাগতে পারে, যা সিটি স্ক্যান, এম আর আই, পেট সিটি স্ক্যান ইত্যাদির মাধ্যমে করা হয়। এর বাইরে স্ক্রিনিং টেস্ট আছে অনেক, সেগুলোও সহজলভ্য নয় সব যায়গায়। অথচ স্ক্রিনিং টেস্টগুলো অনেকের জীবনে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে। প্রতিকার থেকে প্রতিরোধ বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্ক্রিনিং টেস্ট এর পাশাপাশি ডায়াগনস্টিক টেস্টগুলোও সহজলভ্য ও সহজসাধ্য করা জরুরী।
এতোগুলো পরীক্ষা করার মূল উদ্দেশ্য হলো- সঠিক চিকিৎসার দিকে ধাবিত করা এবং ক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থায় চিহ্নিত করা। বিশ্বের সব দেশে এ সকল পরীক্ষা করার পরই ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু করা হয়। কাজেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পেতে হলে অবশ্যই একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং এতেই যথার্থ চিকিৎসা এবং ফলাফল পাওয়া যাবে। এখন কথা হচ্ছে, এই ধাপগুলো আমাদের দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষদের জন্য কতটা সহজলভ্য ও সহজভাবে বোধগম্য করার ব্যবস্থা করা হয়েছে? এসব জটিল হিসেব সাধারণ মানুষ করতে না পেরে চিকিৎসায় অবহেলা করেন এবং দিন দিন পরিস্থিতি যে খারাপের দিকে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল থাকে না। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের জন্য সেসব নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাবতে হবে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এএইচ