১৫ জানুয়ারী, ২০২২ ০২:৪৭ পিএম

নারায়ণগঞ্জে নতুন মেডিকেল কলেজ, নাম নিয়ে ধোঁয়াশা

নারায়ণগঞ্জে নতুন মেডিকেল কলেজ, নাম নিয়ে ধোঁয়াশা
এক প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে ‘শেখ রেহানা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জ’, আরেক প্রজ্ঞাপনে রয়েছে ‘নারায়ণগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’।

মো. মনির উদ্দিন: নারায়ণগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সরকারি মঞ্জুরি জ্ঞাপন করে দুই রকমের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এক প্রজ্ঞাপনে মেডিকেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে ‘শেখ রেহানা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জ’, আরেক প্রজ্ঞাপনে রয়েছে ‘নারায়ণগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’। 

উভয় প্রজ্ঞাপনই ৪ জানুয়ারি জারি করা হলেও এক প্রজ্ঞাপনে একই তারিখে সদ্য সাবেক সচিব আলী নূরের স্বাক্ষর রয়েছে। আরেক প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে তাঁর স্থলাভিষিক্ত মো. সাইফুল ইসলাম বাদলের স্বাক্ষর, যা করা হয়েছে ১৩ জানুয়ারি।

স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগে নতুন যোগ দেওয়া সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘এতদ্বারা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের আওতায় নারায়ণগঞ্জ জেলায় ‘নারায়ণগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার সরকারি মঞ্জুরি জ্ঞাপন করা হলো। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এ আদেশের অনুলিপি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রিপরিষদের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে ৪ জানুয়ারি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. আলী নূর স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘এতদ্বারা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের আওতায় নারায়ণগঞ্জ জেলায় শেখ রেহানা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জ’ প্রতিষ্ঠার সরকারি মঞ্জুরি জ্ঞাপন করাপ হলো। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।’

দুই প্রজ্ঞাপনে মেডিকেল কলেজের ভিন্ন ভিন্ন নাম উল্লেখ থাকায় নারায়ণগঞ্জে হতে যাওয়া দেশের ৩৮তম মেডিকেল কলেজের নাম নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। 

কলেজের নামটি পরিবর্তন করা হয়েছে কিনা—জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. এ কে এম আহসান হাবিব মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রজ্ঞাপন দেখে তো নাম পরিবর্তনের বিষয়টিই জানতে পারছি। এটা নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনার সুযোগ হয়নি। নিশ্চয় তাই-ই হবে। নতুন চিঠি যেটা, সেটাতে আবার শেখ রেহানা নাই, নারায়ণগঞ্জের কথা লেখা আছে।’

তবে নাম পরিবর্তনের এই অন্তর্নিহিত কোনো কারণ জানা নেই বলে জানান তিনি।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের নতুন সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বাদল মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এটা পরিবর্তন হয়েছে কি হয়নি, সেটা সংবাদের বিষয় না।’

দেশের মেডিকেল শিক্ষা

বর্তমানে দেশে ৩৮টি সরকারি ও ৭২টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি অনেক মেডিকেলের পড়ার মান নিয়েও রয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন। এ পরিস্থিতিতে নতুন মেডিকেল প্রতিষ্ঠা না করে দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে মেডিকেল শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মেডিকেল কলেজে ভালো মানের শিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতি থাকা জরুরি। যদি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার পর্যাপ্ত পরিবেশ না থাকে, তবে ব্যাঙের ছাতার মতো কলেজ করে লাভ নেই। প্রতিষ্ঠান যদি মানসম্মত হয়, তবে ভালো চিকিৎসক তৈরি হয়। এলাকার মানুষ ভালো সেবা পায়, সর্বোপরি দেশ উপকৃত হয়। মেডিকেল কলেজে ভালো চিকিৎসক তৈরির যথাযথ সুযোগ থাকতে হবে। তা না হলে এই চিকিৎসক দিয়ে লাভ নেই। এ বিষয়ে সকলের নজর দেওয়া উচিত।’

‘মেডিকেল কলেজ বিশেষত সরকারি মেডিকেলগুলোতে ভালো চিকিৎসক তৈরি করতে হবে। তা না হলে চিকিৎসক সমাজ গালি খাবে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। শুধুমাত্র বানানোর জন্য মেডিকেল না বানিয়ে মানের দিকে নজর রাখতে হবে’, যোগ করেন অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ।

স্বাধীনতা পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরী বলেন, ‘সময় একটু বেশি লাগলেও আমরা চাই দেশে কেবলমাত্র এমন চিকিৎসক তৈরি হোক যারা যে কোনো মাপকাঠিতেই অন্যান্য দেশের চিকিৎসকের চেয়ে নিম্নমানের হবেন না। দেশে গত কয়েক দশকে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে অনেক মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেগুলোর অধিকাংশই মুনাফাভিত্তিক, যাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো এই মেডিক্যাল কলেজগুলো আপন করে এর মাধ্যমে টাকা রোজগার করা, সমাজের উন্নতি করা নয়। অনেক মেডিকেল কলেজে সত্যিকারের চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নাই, শিক্ষক নাই, রোগী নাই। অথচ পাসের হার ৮০-৯০%। বেশ কিছু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে মেডিকেল শিক্ষা দেওয়ার নাম করে যদি আমরা নিম্নমানের চিকিৎসক তৈরি করি এটা কি ঠিক হবে? প্রশ্ন উঠতে পারে, এই সমস্ত মেডিকেল কলেজ থেকেও শেষ পর্যন্ত ভাল বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বের হয়েছে। সেটা হয়েছে ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব প্রচেষ্টায়। বেশ কিছু মেডিকেল কলেজ এ শিক্ষার মান এতটাই নিচু যে সেখান থেকে পাস করা ডাক্তারদের যোগ্যতা নিয়ে আমাদের নিজেদের মনেই সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে।’

তাই নতুন করে প্রতিষ্ঠা না করে বিদ্যমান কলেজগুলোর মানোন্নয়নের বিষয়ে পরামর্শ দেন বাংলাদেশের গাইনোকোলজি এন্ড অবস্টেটিক্স বিষয়ের কিংবদন্তী অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আপাতত নতুন মেডিকেল কলেজ না করে যেগুলো আছে সেগুলো মানসম্মত করার চেষ্টা করা উচিত। আমার মতে, দেশে এখন যে শতাধিক মেডিকেল কলেজ আছে তা আমাদের চিকিৎসকের প্রয়োজন আপাতত মিটাতে সক্ষম।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত