১৪ জানুয়ারী, ২০২২ ০২:০৪ পিএম

বাড়ছে করোনা: শিশুদের স্কুল বন্ধের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

বাড়ছে করোনা: শিশুদের স্কুল বন্ধের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
শিশুদের করোনাকালীন শিক্ষা নিয়ে নতুন নীতি নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যার মাধ্যমে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পথ উন্মুক্ত থাকবে।

মো. মনির উদ্দিন: বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ফের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে সংক্রমণ বেড়েছে প্রায় ২০০ ভাগ। এ অবস্থায় অতি সংক্রমণশীল অমিক্রন ধরন থেকে সুরক্ষায় শিশুদের স্কুল বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, পরিণত বয়সের মানুষ মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারলেও এদিক থেকে শিশুরা ভিন্ন। অসতর্কতাবশত তারা একই সময়ে অনেকের সঙ্গে ঘনিষ্ট সাহচর্যে চলে যায়। আর এতে তাদের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে ভাইরাসটি। এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য নতুন নীতি নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যার মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পথ উন্মুক্ত থাকবে।

তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে আরও হিসাব-নিকাশ করার পরামর্শ দিয়ে কোনো কোনো স্বাস্থ্য প্রশাসক বলেছেন, অতি উৎসাহী হয়ে এখনই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করাটা বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়। প্রয়োজন হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেবেন।

জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু মেডিভয়েসকে বলেন, অমিক্রন করোনার নতুন একটি ভ্যারিয়েন্ট। মিউটেশনের ফলে এরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু উপসর্গগুলো ডেল্টার মতো ভয়াবহ না। অমিক্রনে আক্রান্তদের এখনো পর্যন্ত ফুসফুসে তেমন গুরুতর সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। হালকা দুর্বলতা, সর্দি-জ্বর-মাথা ব্যথা—এ রকম হচ্ছে। কিন্তু মুখে স্বাদসহ অন্যান্য শারীরিক অবস্থা সবই স্বাভাবিক আছে। খানিকটা নিয়মের মধ্যে থাকলেই এ থেকে মুক্তি মেলে।

অস্তিত্ব রক্ষায় দ্রুত মিউটেশন

অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু বলেন, আমাদের দেশে কম হলেও বিশ্বের বড় একটি অংশ ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে। এর ফলে ডেল্টার মতো গুরুতর স্ট্রেইনগুলো চাপে পড়েছে। অর্থাৎ টিকার কল্যাণে মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যাওয়ায় স্ট্রেইনগুলো একটি বড় চাপে থাকে। এ অবস্থায় নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় সে মিউটেশন করতে থাকে। এক পর্যায়ে এই জীবাণুগুলো এমন অবস্থায় আসে, যখন তাদের পক্ষে হয় তো বেঁচে থাকা সম্ভব হবে, কিন্তু সে শক্তিমত্তা হারায়। ফলে মানব দেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারে না। করোনার নতুন ধরনটি সেই অবস্থারই একটি রূপ। কিন্তু বেঁচে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা থেকে তারা দ্রুত ছড়াতে থাকে। যেমন: একজন মানুষকে যদি পানিতে বা কোনো ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে সে বাঁচার জন্য অন্তহীন চেষ্টা চালায়। হয় তো তার চোখ হারিয়ে গেলো কিংবা পা হারিয়ে গেলো। কিন্তু বাঁচার চেষ্টা চালাবে। একইভাবে এই স্ট্রেইনটা দ্রুত ছড়াবে। কারণ এক অবস্থায় তারা বেশিক্ষণ থাকতে পারছে না। একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ করার ক্ষমতাও তার নেই। তবে এখনো পুরোপুরি শক্তিহীন হয়নি।

মহামারীর অবসান ঘটে যেভাবে

ঢামেক হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বলেন, ‘নতুন এ ধরনটি যদি এভাবে ছড়াতে থাকে, আর আমরা যদি মাস্ক পরা কিংবা সাবধানতা অবলম্বন করা বাদ দিয়ে দিই, তাহলে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যেমন: শিশু এবং যারা আগে থেকে ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত—তাদের দেহে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এর ফলে সে আবারও আগের মতো ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। এ জীবাণু বিস্তারের পথগুলো রুদ্ধ করে দিলে এক পর্যায়ে সে দুর্বল ভাইরাসে পরিণত হবে। অর্থাৎ গুরুতর সংক্রমণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। সেটা হলে মহামারী নিয়ন্ত্রণ হওয়ার একটা উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হবে। আর এভাবেই একটি মহামারীর অবসান ঘটে। মহামারী নির্মূল করতে লড়াই করতে হয় কমপক্ষে দুই থেকে পাঁচ বছর।’

অমিক্রন হতে পারে আশির্বাদ কিংবা অভিশাপ

করোনাভাইরাস ধ্বংসে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে আরও আন্তরিক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই ইনফেকশাস ডিজিজ স্পেশালিস্ট বলেন, ‘জীবাণুটা মরে যাওয়ার সময় দিতে হবে। সেই সময়টুকু পর্যন্ত আমাদেরকে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। একটু কষ্ট করতে হবে। অথচ দেখেন, করোনা একটু কমে যাওয়ার পরই আমরা কিন্তু আবার পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনযান শুরু করে দিয়েছিলাম।

মনে রাখতে হবে, করোনার নতুন এ ধরন আশির্বাদও হতে পারে কিংবা জীবন-যাপনে উদাসী হলে এটি আমাদের জন্য অভিশাপ কিংবা হুমকির কারণও হয়ে যেতে পারে।’ 

শিশুদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ সময়ের দাবি

অধ্যাপক সুলতানা শাহানা বানু বলেন, সরকার যদি শিশুদের প্রতিষ্ঠান বন্ধের পদক্ষেপ নেয়, তাহলে নিতেই পারে। কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় লকডাউন চলছে। কানাডা, ব্রিটেনসহ অনেক জায়গায় এ পথ অনুসরণ করা হচ্ছে। মহামারী নির্মূলের স্বার্থে এ রকম সিদ্ধান্ত যৌক্তিক এবং সময়ের দাবি।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, করোনা শিশুদের ওপর যতটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে, অন্যদের ওপর অতটা না। যারা পরিণত, তারা নানাভাবে এর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পেরেছে। অনেক শিশু ভয়ঙ্কর পথে চলে গেছে, কেউ ভিডিও গেমসে আসক্ত হয়ে গেছে। বসে থেকে থেকে কেউ মুটিয়ে যাচ্ছে। তাদের মানসিক ও শারীরিক ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। এসব দিক বিবেচনায় যদি আপনি স্কুল খোলা রাখেন—তাহলে কয়টা স্কুল, পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে পারবে? কয়টি প্রতিষ্ঠান শিশুদের শারীরিক দূরত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারবে? শিশুরা তো মাস্ক পরতে চায় না। সুতরাং কিছুটা সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রেখে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাচ্চাদের শারীরিক ও মানসিক কার্যক্রম যেন চলমান থাকে, সেদিকে মনোযোগী হতে হবে। দূরত্ব বজায় রেখে বড় মাঠে খেলাধূলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ নিয়ে প্রয়োজনে নতুন কোনো নীতি নির্ধারণ করা যেতে পারে।

জানতে চাইলে সোসাইটি অব সার্জন্স অব বাংলাদেশের (এসওএসবি) সাধারণ সম্পাদক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. নুর হোসেন ভূঁইয়া (শাহীন) মেডিভয়েসকে বলেন, ‘করোনার নতুন ধরন অমিক্রন খুবই সংক্রমণশীল। বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি আমাদের দেশেও বুস্টার ডোজ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে হয় তো মৃত্যুর সংখ্যা কম। কিন্তু এ ধরনটি দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে। স্কুল-কলেজের সকল শিক্ষার্থী ভ্যাকসিনেটেড না হলে আমার মনে হয়, সেখানে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। প্রতিরোধের অংশ হিসেবে আগের মতো অনলাইনে চলে যাওয়া উচিত, যাতে আমাদের সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজনদের নিরাপদে রাখতে পারি। সুতরাং সুরক্ষার জন্য অনলাইনে চলে যাওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।’

চট্টগ্রাম মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রুমানা আফরোজ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘করোনা যে হারে বাড়ছে, আমার মতে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ শিশুদেরকে আমরা সেভাবে সুরক্ষা দিতে পারি না। আমরা বড়রা হয় তো একজন থেকে আরেকজন দূরে থাকি। ঘনিষ্ট সাহচর্য এড়িয়ে চলি। কিন্তু ছোটরা বিষয়টি বুঝতেও পারে না, দূরত্ব মেনেও চলে না। দুই দিন ক্লাস হচ্ছে, কিন্তু এই দুই দিনই তারা একজন আরেকজনের কাছাকাছি সংস্পর্শে যাচ্ছে। এতে ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এজন্য সশরীরে ক্লাস বন্ধ করে দিয়ে, অনলাইনে নিলেই অধিকতর ভালো হবে।’

মহামারীতে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের

তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে আরও হিসাব-নিকাশ করার পরামর্শ জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধান (ল্যাব) ও উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. জয়নাল আবেদীন টিটোর। 

এ স্বাস্থ্য প্রশাসক বলেন, অতি উৎসাহী হয়ে এখনই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করাটা বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ (আইন) ২০১৮ অনুসারে, মহামারীর সময়ে কী করতে হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা এবং দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। পরিষ্কার করে বললে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের। যার দায়িত্ব, তিনিই তা পালন করুন। তাঁর পরামর্শ ছাড়া অতি উৎসাহী হয়ে কোনো আদেশ জারি করা আইনের লঙ্ঘন, বুদ্ধিমত্তার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

এগিয়ে চলছে স্কুল শিক্ষার্থীদের টিকাদান 

সংক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় টিকাদান কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। 

বুধবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীতে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্স (বিসিপিএস) প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ৮ কোটির বেশি প্রথম ডোজের ভ্যাকসিন দিয়েছি, পৌনে ৬ কোটি দ্বিতীয় ডোজ আমরা দিয়েছি। ছাত্রদের ভ্যাকসিনও অগ্রগতি লাভ করেছে। প্রায় ৬৫ লাখ হয়ে গেছে এবং আমাদের ১ কোটি ২৮ লাখ দিতে হবে। আশা করি, এ মাসের মধ্যে আমরা কাভার করে ফেলবো যদি ছাত্র-ছাত্রীরা আসে। ভ্যাকসিন ছাড়া স্কুলে যেতে পারবে না—এমন ঘোষণায় তারা ভ্যাকসিনের জন্য আসছে। 

এইচএসসি পরীক্ষার্থী যারা উচ্চ শিক্ষা নিতে কোচিং করার জন্য ১ জেলা থেকে অন্য জেলায় যাচ্ছেন তাদের টিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিয়ম হলো যে স্কুল থেকে শিক্ষার্থী প্রথম ডোজ নিয়েছে, সেখান থেকেই দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। তা না হলে হিসাব রাখা সম্ভব হবে না, বিশৃঙ্খলা হবে। তারপরও টিকা কার্ড নিয়ে এলে বিশেষ ক্ষেত্রে দেখা হবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি