০৭ অক্টোবর, ২০২১ ০২:৩৫ পিএম

পেশাগত দায়বোধ থেকেই মাসে একদিন বিনামূল্যে চিকিৎসা: ডা. হৃদয় 

পেশাগত দায়বোধ থেকেই মাসে একদিন বিনামূল্যে চিকিৎসা: ডা. হৃদয় 
ডা. হৃদয় রঞ্জন রায়

ছাত্রজীবন থেকে বিভিন্ন সেবামূলক কাজে তৃপ্তি খুঁজে পান ডা. হৃদয় রঞ্জন রায়। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে অনাবিল প্রশান্তি পান তিনি। সেই প্রশান্তিতে অবগাহনের চিন্তা থেকেই পেশাগত জীবনের পাশাপাশি অংশ নেন বিভিন্ন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইনে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সাল থেকে প্রতি মাসে এক দিন (নিজের জন্মদিন, শনিবার) রোগীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন এ চিকিৎসক। একই সঙ্গে এদিন সম্পাদন করেন একাধিক রোগীর অস্ত্রোপচার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সম্প্রতি রোগীবান্ধব এ চিকিৎসকের বদান্যতা ও মহানুভবতার খবরটি আসে পাদপ্রদীপের আলোয়। এর পর থেকেই চিকিৎসক সমাজসহ সকলের প্রশংসায় ভাসছেন ডা. হৃদয় রঞ্জন রায়। স্বাস্থ্যসেবার মানসিকতায় হৃদ্ধ এ চিকিৎসকের সঙ্গে গতকাল বুধবার (৬ অক্টোবর) কথা হয় মেডিভয়েস প্রতিবেদকের। জানালেন, স্রোতের বিপরীতে স্বাস্থ্যসেবা শুরুর প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য। কথা বলেছেন, মো. মনির উদ্দিন।

যে প্রেরণা থেকে এ দুঃসাহসী উদ্যোগ 

ডা. হৃদয় রঞ্জন রায় জানালেন, প্রকৃতপক্ষে ছাত্রজীবন থেকে সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলাম। কর্মজীবনে প্রবেশের পরও এই ধারা অব্যাহত ছিল। এর সুবাদে আমি বিভিন্ন সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের সূত্রপাত হয় ২০১৮ সাল থেকে। প্রতিবছর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীতে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) তরফ থেকে আমরা রংপুরে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করি। এর অংশ হিসেবে স্বাচিপের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় আমরা ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করেছি। প্রতিবারের ন্যায় ২০১৮ সালেও রংপুরে এ রকম একটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ছিল। সকালে ওই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করি। দুপুরের দিকে সোসাইটি অব সার্জন্স অব বাংলাদেশ (এসওএসবি) থেকে একটি ক্ষুদেবার্তা আসে। সংগঠনের তৎকালীন সেক্রেটারি বর্তমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশিদ আলমের পাঠানো ওই নির্দেশনায় বলা হয়, এসএসবির সদস্যগণ বিকেল বেলায় চেম্বারে বিনামূল্যে রোগী দেখবেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, বিকেল বেলা যতগুলো রোগী দেখেছি, তাদের কারো কাছ থেকে কোনো টাকা গ্রহণ করিনি। পরে এসএসবির নির্দেশনা পালনের বিষয়টি তাদের অবহিত করার লক্ষ্যে দুই-একটি ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের টাইমলাইনে পোস্ট করি। তখন আমার সিনিয়র-জুনিয়র অনেক সহকর্মী, অনেক বন্ধু এ কাজের প্রশংসা করলেন। তারা বললেন, এটা খুবই মহানুভব এবং ভালো একটি কাজ। আমি জানালাম, এটা আসলে আমার নিজস্ব কোনো চিন্তা না, বরং ১৫ আগস্ট উপলক্ষে সোসাইটি অব সার্জন্সের নির্দেশনা প্রতিপালনের লক্ষ্যেই আমি এটি করেছি। বিষয়টি শুনে তারা আমাকে প্রতি মাসে একদিন এ স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে কিছুটা সময় নেই। প্রায় সপ্তাহ দুয়েক বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করলাম। ভাবলাম, এটা আমার জন্য কতটুকু সম্ভব হবে? এটা চালিয়ে দিতে পারবো কি না! এ নিয়ে আমি আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বললাম। এভাবে দীর্ঘসময় বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে বোঝাপড়া করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমি মাসে একটি দিন বিনামূল্যে রোগী দেখবো। এজন্য আমি নিজের জন্মবার (০১.০৬.৬৯) শনিবার বেছে নিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রতি ইংরেজি মাসের প্রথম শনিবার আমি রোগীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেবো। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই আমি আমার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে চলেছি। এই জন্য আমাকে নিজের সঙ্গে কঠিন একটি লড়াই করতে হয়েছে। কারণ এ রকম একটা কঠিন কাজ সারাজীবন চালাতে পারবো কি পারবো না—এ নিয়ে আমার মধ্যে যথেষ্ট আশঙ্কা ছিল। 

খুঁজে পান প্রশান্তি 

এই কাজগুলো করে অনেক প্রশান্তি পাওয়া যায় উল্লেখ করে ডা. হৃদয় রঞ্জন রায় বলেন, নিজের কাছে অনেক ভালো লাগে। প্রকৃতপক্ষে এখানে আমি কোন লোকসান দেখি না। সারা দিনের উপার্জন ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ক্ষুদ্র চিন্তাও কখনো কখনো মনের মধ্যে আসে। কিন্তু এর মাধ্যমে মানসিক যে প্রশান্তি পাওয়া যায়, বা যে আত্মতৃপ্তি উপলব্ধি করি, দৃশ্যমান ক্ষতির চেয়ে সেটার মূল্য অনেক অনেক বেশি।

স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন 

তিনি বলেন, এটা আসলে বহুমুখী। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো একক বিষয় জড়িত নয়। প্রথমত আমি ইতিবাচক এ কাজের মাধ্যমে সোসাইটি অব সার্জন্সের চিন্তাকে ধারণ করলাম। দ্বিতীয়ত, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অতল ভালোবাসা প্রকাশ করলাম। একজন মানুষ এবং চিকিৎসক সমাজের সদস্য হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব পালন করলাম। সর্বোপরি চিকিৎসকদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে ভ্রান্ত ও বিব্রতকর ধারণা যুগ যুগ ধরে বাসা বেঁধে আছে, সেটা পাল্টাতে পারি, সাধারণ মানুষদের মনে চিকিৎসকের ব্যাপারে যে বিরূপ ধারণা, সেটা যেন দূর করতে পারি—এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সেটাও আমি গভীরভাবে চিন্তা করেছি। সাধারণ মানুষ চিকিৎসকদের দেখতে পারে না, তাদের নিয়েই বাজেভাবে সমালোচনা করে, কসাইসহ নানা নেতিবাচক অভিধায় অভিহিত করে। সেখান থেকে চিকিৎসা পেশায় জড়িতদের পরিত্রাণ দিতে আমি কিছু করতে পারি কিনা—সেটাও আমার মধ্যে দারুণভাবে কাজ করতো। 

যতদিন কর্মক্ষম ততদিন এ সেবা 

রংপুর মেডিকেল কলেজের ১৯৮৭-৮৮ সেশনের এ শিক্ষার্থী বলেন, যতদিন কর্মক্ষম থাকবো, শারীরিকভাবে সক্ষম থাকবো, মানসিকভাবে তৈরি থাকবো—তত দিন আমি এ স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাবো। নিজের সঙ্গে এ নিয়ে আমার এমনই প্রতিজ্ঞা রয়েছে। মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত কিংবা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে গেলে এটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। 

এ সেবা চিকিৎসক সমাজের জন্য বার্তা 

দেশের চিকিৎসক সমাজ তার এ কার্যক্রম একটি বার্তা হিসেবে গ্রহণ করবে বলে মনে করেন ডা. হৃদয়। তিনি বলেন, আমি মনে করি নবীন-প্রবীণ সকল চিকিৎসকের জন্য এটি একটি বার্তা। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। রংপুর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. বিধি বিধু আমাকে বলেছেন, হৃদয় তুমি চমৎকার, খুবই সাহসী ও অনুকরণীয় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছো। স্যারের কথায় বুঝতে পারলাম, আমার এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি হয়তো এটি শুরু করার চিন্তা-ভাবনা করছেন। সেজন্য তাঁর মনোভাবটা আমার কাছে এভাবে ব্যক্ত করেছেন। আমার বিশ্বাস, এ রকম আরও অনেকেই থাকতে পারেন। সুতরাং নিঃসন্দেহে এটি একটি বার্তা। আমি মনে করি, সকল চিকিৎসক—বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যদি জেলা জেলায় ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা চালু করেন, তাহলে জাতি উপকৃত হবে। তাঁরা চাইলে ১০ থেকে ১৫ জন রোগী দেখতে পারেন। কারণ দিনে এর চেয়ে বেশি তো সম্ভব না। আমিও সংখ্যা নির্ধারণ করে দেবো। যদি ৫০ জন রোগী এসে হাজির হয়, তাহলে তো সবার সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ শার‌ীরিকভাবে তৈরি থাকার ব্যাপার আছে। সেজন্য ভাবছি, ওই দিন ১০/১৫ জন রোগী দেখবো। এর বাইরে দেখবো না। ওই দিন বিনামূল্যে অপারেশনও করবো, তবে ২-৩টি। এর বেশি করলে শরীরে কুলাবে না। 

চিকিৎসক সমাজের প্রতি আহ্বান 

এই দেশটা আমার। এদেশের মানুষ, আমাদেরই মানুষ। তাদের সাথে আমাদের কোনো দূরত্ব তৈরি হোক, এটা কখনো কাম্য হতে পারে না। আমরা এ দেশ এবং দেশের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে একত্রিত হয়ে থাকবো। আমাদেরকে এমন কিছু কাজ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের সাথে আমাদের আত্মার বন্ধন তৈরি হয়। আমরা যেন পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে এ দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে পারি, এটাই নবীন চিকিৎসকসহ সবার প্রতি আমার আহ্বান। নিজস্ব আঙ্গিনায় এবং সামাজিকভাবে দেশের মানুষের জন্য কিভাবে কাজ করা যায়, এমন ভাবনা সবার থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা 

ডা. হৃদয় রঞ্জন রায়ের জন্ম রংপুর সদর উপজেলার যাদবপুর গ্রামে ১৯৬৯ সালের ১ জুন। শ্যামপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৬ সালে করমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এর পর ১৯৯৩ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। তিনি ছিলেন রংপুর মেডিকেলের ১৯৮৭-৮৮ সেশনের শিক্ষার্থী।

২০০৫ সালের জানুয়ারিতে জেনারেল সার্জারিতে এফসিপিএস সম্পন্ন করেন। কার্ডিয়াক সার্জারিতে এমএস কোর্সে থিসিস পরীক্ষা দিলেও নানা কারণে সম্পন্ন করা হয়নি। বর্ণাঢ্য জীবনে আমেরিকান কলেজ অব সার্জন্স থেকে ফেলোশিপ গ্রহণ করেন এ কৃতি শিক্ষার্থী।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

২০তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডার হিসেবে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে তিরনইহাট উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবনের শুরু। দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় অর্ধডজন প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান শেষে বর্তমানে কর্মরত আছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স