বিএসএমএমইউর বাজেট: উচ্চশিক্ষা বিস্তারে কতটা সহায়ক?
মো. মনির উদ্দিন: চলতি অর্থ বছরের জন্য ৬৪২ কোটি আট লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। বাজেটে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এছাড়া বেতন-ভাতা খাতে মোট ৩৫৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
তবে মেডিকেল শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীট হিসেবে প্রস্তাবিত এ বাজেট উচ্চশিক্ষা বিস্তারে পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য সেবা প্রদান ও হাসপাতাল নির্মাণে প্রচুর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ও রেডিডেন্ট চিকিৎসকদের ২৪ ঘণ্টা শিক্ষার পরিবেশে থাকা নিশ্চিত করার বিষয়টি বাজেটে অনুপস্থিত। এ ছাড়া এক বছর হয়ে গেলেও রেসিডেন্টদের বর্ধিত এবং ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের ঘোষিত ভাতার কোনো উল্লেখ নেই এতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রেসিডেন্ট চিকিৎসক বলেন, ‘রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের পড়াশোনা করানো, তাদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোলা এবং তাদের পড়াশোনার সার্বিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকায় যথেষ্ট শূন্যতা আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের জন্য আবাসনের কোনো ব্যবস্থা নাই। ফলে একেকজন একেক জায়গায় অবস্থান করেন। অথচ রেসিডেন্সি কোর্সের প্রাইমারি শর্তই হচ্ছে শিক্ষার্থীরা দিনের পুরো সময় কর্মস্থলে থাকবেন; রোগী দেখবেন এবং পড়াশোনা করবেন। কিন্তু তারা এ সুযোগ পাচ্ছেন না। এতে পড়াশোনায় শতভাগ মনোযোগ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টা প্রোগ্রামের মধ্যেই থাকবেন রেসিডেন্ট চিকিৎসকরা, সেটাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানে প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো সমাধানের উল্লেখ নেই। বাজেটে অনেক টাকা বরাদ্দ আছে, কিন্তু রেসিডেন্টদের আবাসনের জন্য কোনো বরাদ্দ নাই।
তিনি আরও বলেন, বিএসএমএমইউর অধীনে যারা কোর্স করছেন, রেসিডেন্সি কোর্সে এবং ডিপ্লোমা কোর্সে পঞ্চাশ ভাগ বেসরকারি কেন্ডিডেট অর্থাৎ এসব কোর্সের অর্ধেক বেসরকারি। এর মধ্যে ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী কোনো ভাতা পাচ্ছেন না। আর বেসরকারি রেসিডেন্টরা যা পাচ্ছেন, তা ঢাকা শহরে একজন খেটে খাওয়া মানুষের উপার্জনের চেয়েও অনেক কম। এক দিকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে না, অথচ তাদের কাছে ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করা হচ্ছে। আবার কোর্স চলাকালীন অন্য কোথাও কাজের বৈধতাও নাই। একজন রেসিডেন্ট চিকিৎসককে তো পুরো সময় পড়াশোনা, গবেষণা ও রোগী দেখা—এগুলো নিয়ে থাকার কথা। কিন্তু বেতন স্বল্পতার কারণে তারা সব সময় একটা মানসিক চাপে থাকেন। অর্থের সংস্থানের জন্য তারা অনেক সময় অন্য জায়গায় ডিউটি করতে বা রোগী দেখতেও বাধ্য হন। এতে তাদের কাঙিক্ষত অ্যাকাডেমিক অর্জন হচ্ছে না। এ জায়গায় প্রস্তাবি বাজেটের ভূমিকা নাই।
‘মেডিকেল উচ্চশিক্ষার জন্য বিএসএমএমইউ দেশে এখনো পর্যন্ত একমাত্র প্রতিষ্ঠান। এর লক্ষ্যই হচ্ছে, চাহিদার আলোকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি করা’, যোগ করেন এ রেসিডেন্ট চিকিৎসক।
আরও এক চিকিৎসকের অভিযোগ, ‘বিএসএমএমইউর বাজেটের একটা অংশ খরচ হচ্ছে আউটডোর, হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদিতে। এগুলো কোনোক্রমেই এ বিশ্ববিদ্যালয় মূল কাজ না। এ ছাড়া আউটডোরে কত রোগী দেখা হলো, আট হাজার না দশ হাজার—এটা কোনোক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ না। মূল কাজ হলো শিক্ষার্থীদের সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা। নতুন নতুন গবেষণায় মনোনিবেশের সুযোগ করে দেওয়া। এই জায়গায় তেমন কাজ হচ্ছে না।
বিএসএমএমইউতে বরাবরই গবেষণায় পর্যাপ্ত বাজেট দেওয়া হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি ভালো গবেষণায় কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে কিংবা ক্ষেত্র বিশেষ কম বেশি হতে পারে, কিন্তু এখানে একটি গবেষণায় হয় তো ৭০-৮০ হাজার টাকা দেওয়া, যা একেবারেই অপ্রতুল। সুতরাং গবেষণায় বাজেটের পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে।’
তিনি বলেন, পরীক্ষায় পাস করার জন্য প্রত্যেক রেসিডেন্টকে একটি গবেষণাপত্র জমা দিতে হয়। এই উদাহরণ বিরল যে, গত দশ বছরে বিএসএমএমইউর কোনো একটি গবেষণা দেশের স্বাস্থ্য খাতে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পেরেছে। তাহলে কেন হচ্ছে না? এর এক নম্বর কারণ হলো, বাজেট কম। একই সঙ্গে গবেষণাগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা-বিশ্লেষণ করা হয় না। এ জায়গায় আরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে।’
গবেষণা ও প্রশিক্ষণে বাজেটে বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘গবেষণার বিষয়ে সবাই জোর দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন, আমরাও চেষ্টা করছি। আগে বরাদ্দ কম ছিল, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়—দুই জায়গাতেই কম ছিল। এবার এখানে ১০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে এবং এগুলো যথাযথভাবে খরচ করতে পারলে, পরেরবার আমরা আরও ২০ বা ৩০ কোটি টাকা চাবো। যেহেতু আগে এই খাতে পাঁচ কোটির নিচে ছিল, সুতরাং এক সঙ্গে যদি তিন গুণ, চার গুণ বেশি চাওয়া হয়—তাহলে তো সরকার দিবে না। আর এখন করোনার পরিস্থিতিতে এতটুকু বাড়ানোই সম্ভব হয়েছে।’
বাজেটে গবেষণায় অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘মেডিকেলের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএসএমএমইউতে সবাই গবেষণায় জোর দিচ্ছেন। মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল, সিন্ডিকেট মিটিং ও মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল জায়গায় আলোচনা হয়েছে। আমরা এটা আরও বাড়াবো। গবেষণার সামনে একশ’ কোটি চাবো, কিন্তু আমাদেরকে সেই সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। তাহলেই সরকার এ বরাদ্দ দেবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সদয় আছেন। গবেষণায় বর্তমান কম বরাদ্দের তথ্যটি যথাযথই এবং তাই আমরাও সে দিকে নজর দিচ্ছি, যাতে গবেষণায় সন্তোষজনক বরাদ্দ পাই। এ বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ডের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে। তাই আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যেন আস্তে আস্তে সেই মানে পৌঁছায়। সেই সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যেই ইনশাল্লাহ আমরা কাজ করবো।’
রেসিডেন্সি ও ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আবাসনের জন্য ছয়তলা ডক্টরস ডরমেটরি আছে, এর সঙ্গে আরও চারটি ফ্লোর করা যাবে—এগুলে দ্রুতই আমরা করবো। লকডাউনের পর পরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নার্সদের জন্য নার্সিং হোস্টেল করা জরুরি। এটা তিনতলা করা হয়েছে আরও সাতটা ফ্লোর করা হবে। চিকিৎসকদের কোয়ার্টার, নার্সদের কোয়ার্টার—কোনো কিছুই কাঙিক্ষত মানের না। আগামী ছয় মাসের ভেতরে পাঁচটি স্থাপনার জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। আশা করি, সেই পরিকল্পনা মোতাবেক আমরা কাজ করতে পারবো।’
-
০৩ জুলাই, ২০২৩
-
২৬ জুন, ২০২৩
২০২৩-২০২৪ অর্থ বছর
বিএসএমএমইউর ৭৬৭ কোটি ২১ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন
-
০২ জুলাই, ২০২১
-
২৯ জুন, ২০২১
২০২১-২২ অর্থবছর
৬৪২ কোটি ৮ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা বিএসএমএমইউর