০৭ মে, ২০২১ ০৬:০৭ পিএম

পরীক্ষায় ‘অস্বাভাবিক’ অকৃতকার্য: বিসিপিএস চেয়ারম্যানের কাছে শিক্ষার্থীর খোলা চিঠি

পরীক্ষায় ‘অস্বাভাবিক’ অকৃতকার্য: বিসিপিএস চেয়ারম্যানের কাছে শিক্ষার্থীর খোলা চিঠি
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) এফসিপিএস জানুয়ারি ২০২১ সেশনের সার্জারি পার্ট ওয়ান (পেপার-২) পরীক্ষায় প্রথম থেকে টানা ৪৪১ জনের অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, প্রথম ৪৪১ জনের কেউ পাস করেনি। অথচ তারা প্রথম ও তৃতীয় পেপারে ৭০-৮০ নম্বর পেয়েছেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, যে পরীক্ষায় নেগেটিভ মার্কিং নেই, সেই পরীক্ষায় পেপার-টুতে ৩০ এর ঘরে নম্বর পাওয়াটা অসম্ভব।

বিসিপিএস’র প্রকাশিত ফলাফলকে ‘অস্বাভাবিক’ আখ্যা দিয়ে ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এত কষ্ট করে পরীক্ষা দিলাম, সঠিক ফলাফল পাওয়াটা ছিল আমাদের অধিকার। ফলাফল দেখে আমরা আশাহত। যখন আমরা কয়েকজন মিলে স্যারদের সাথে কথা বলেছিল, তখন স্যাররা এই ফলাফলের অস্বাভাবিকতার ব্যাপারে স্বীকার করেছিলেন। এতো পরিষ্কার অসামঞ্জস্যতা দেখে আসলে তা অস্বীকার করারও কিছু ছিল না। স্যাররা বললেন, টেকনিক্যাল সমস্যার জন্য হতে পারে, এটার সমাধান সম্ভব। আপনাদের নির্দেশনা মতোই আশায় বুক বেঁধে আবেদনপত্র লিখে জমা দিলাম। অবশেষে নিরাশ হয়ে ফিরলাম।’

বিসিপিএস চেয়ার‌ম্যানের কাছে ওই শিক্ষার্থীর পাঠানো এ সংক্রান্ত খোলা চিঠিটি মেডিভয়েস পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

বিসিপিএস বরাবর খোলা চিঠি

শ্রদ্ধেয় স্যার,

প্রথমেই সংযুক্ত ছবিতে দেখুন। আশা করি চিনতে পেরেছেন। এটা বিগত জানুয়ারি ২০২১ সেশনের সার্জারি পার্ট-ওয়ান পরীক্ষার ফলাফল। কিছু ছাত্র-ছাত্রীর মার্কস এর নমুনা:

১. প্রথম ৪৪১ জনের মধ্যে কেউ পাস করেনি। (রোল ৪৮০০০১-৪৮০৪৪১) এর অনেকের এই ধরনের মার্কস দেখা গিয়েছে ( পেপার-১ ও ৩ এ ৭০-৮০ নম্বরপ্রাপ্ত কিন্তু পেপার-টুতে ৩০-৪০ নম্বর প্রাপ্ত)।

২. যে পরীক্ষায় নেগেটিভ মার্কিং নেই, সেই পরীক্ষায় ৩০ এর ঘরে নম্বর পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব। এছাড়াও দুটি পেপারে ৭০+ মার্ক, সেখানে একটি পেপারে এতজন ছাত্রছাত্রীর পেপার-টুতেই শুধু ৩০-৪০ মার্ক, ব্যাপারটি অস্বাভাবিক।

অত্যন্ত দুঃখের সাথেই জানাচ্ছি, এই সমস্যার সমাধানে আপনাদের ভূমিকাতে আমরা সবাই আশাহত। আমাদের তো কোনো অযৌক্তিক দাবি ছিল না স্যার, এত কষ্ট করে পরীক্ষা দিলাম। সঠিক ফলাফল পাওয়াটা আমাদের অধিকার ছিল। আপনাদের সাথে যখন আমাদের কয়েকজন কথা বলেছিল, তখন আপনারও স্বীকার করেছিলেন এই রেজাল্টের অস্বাভাবিকতার ব্যাপারে।

স্বীকার না করারও কিছু ছিল না আসলে, এত পরিষ্কার অসামঞ্জস্যতা দেখে। আপনারা মেনেও নিলেন, টেকনিক্যাল সমস্যার জন্য হতে পারে। এটার সমাধান সম্ভব। আপনাদের নির্দেশনা মতোই আশায় বুক বেঁধে আবেদনপত্র লিখে জমা দিলাম। কিন্তু বরাবরের মতই আশায় গুড়ে বালি। কি যে রিভিউ হল এবং আমাদের অফিশিয়াল আবেদনপত্রের উত্তরে আপনারা আনঅফিশিয়ালি একটা ফোন কলে জানিয়ে দিলেন ‘আমাদের কোনো ভুল খুঁজে পাওয়া যায়নি। আপনারা সবাই একটানা ৪৪১ জন পরীক্ষা খারাপ দিয়েছেন।’

কি কাকতালীয় একটা ব্যাপার! রোল ০০১-৪৪১ এর সবাই খারাপ পরীক্ষা দিয়েছে। অদ্ভূতভাবে এদের সবাই পেপার-টুতেই ৩০-৪০ পাওয়ার মত পরীক্ষা দিয়েছে। এই কাকতালীয় ব্যাপারটা ৪৪১ এর পর থেকে কারো মাঝে দেখা যায়নি।

একটু পরিষ্কারভাবেই বলি স্যার, এই পরীক্ষাটার জন্য আমরা একেকজন ১০০০০/১১০০০ টাকা করে দিয়েছি। আমরা আপনাদের থেকে কোন দয়া-ভিক্ষা চাইনি। সঠিক ফলাফল জানাটা আমাদের প্রাপ্য। আপনাদের ভুলের মাশুল আমরা দিচ্ছি। তারপর ভুলটা যখন ধরিয়ে দিয়ে আবেদন করলাম, তখনও আপনারা চূড়ান্ত কপটতা দেখালেন। এমন অসামঞ্জস্যতা আমাদের বলার আগেই তো আপনাদের খেয়াল করা উচিত ছিল এবং সমাধান করা উচিত ছিল।

এবারে তো পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর দুইদিন সময়ও পেয়েছিলেন রেজাল্টের আগে। কেউই কি খেয়াল করলেন না? তারপর ১.৫ মাস পার হয়ে যখন আমরা আমাদের মার্ক্স উঠানো শুরু করলাম, তখন নজরে আসল এই কাহিনী যেটা জানার পরও আপনারা দায়িত্বহীন আচরণই দেখিয়েছেন। আপনাদের একটা পরীক্ষা বোর্ড আছে। সেটার কাজটা কি আসলে? ছয়মাস পর পর গতানুগতিক পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি কপি পেস্ট করে শুধু ছেড়ে দেওয়া আর কোন মতে একটা তিন দিনের পরীক্ষার ব্যবস্থা করে মেশিনে রিড করানো? আপনাদের আর দায়িত্ব নেই? আপনারা পরীক্ষার রেজাল্ট গুলো বিচার বিশ্লেষণ কিছু করেন না? পর্যাপ্ত মনিটরিং করেন না?  আমাদের একেকজনের এতগুলা কষ্টের টাকা কি হালাল হচ্ছে আপনাদের জন্য? এখন এসে আপনারা বলছেন, রিভিউ এপলিকেশন করার নিয়ম পরীক্ষার তিন সপ্তাহের মাঝে। আমরা দেরী করে ফেলেছি ,তাই আর,রিভিউ হবে না।

আপনারাই বলুন, বিসিপিএস থেকে কি পরীক্ষার তিন সপ্তাহের মধ্যে মার্ক্স উঠানো যায়? কিভাবে তখন এপ্লাই করতাম আমরা? আর যখন আপনাদের সাথে দেখা করলাম,তখনও তো এই অযৌক্তিক নিয়মের কথা বলেননি। তার মানে আপনারা নিজেই এই অদ্ভুত নিয়মের ব্যাপারে জানতেন কিনা সন্দেহ। আমরা কিভাবে জানব? আর আমাদের এই সব নিয়মের দোহাই দিয়ে আপনাদের ভূলটা ঢাকতে চাওয়া অনৈতিক লাগছে না? অনেকে আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন কনফিডেন্স থাকলে রিট করার জন্য। কনফিডেন্ট ছিলাম আমরা ঠিকই, কিন্তু বাস্তবতা যদি চিন্তা করি, রিট করা আমাদের জন্য উচ্চাভিলাষী একটা ব্যাপার। পরীক্ষার ১০০০০ টাকা যোগাড় করতে যাদের হিমশিম খেতে হয়, রিটের জন্য এত টাকা যোগার করা আমাদের লেভেলে নিঃসন্দেহে অনেক কঠিন।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা, আপনারা একেক সময় যে কপট আচরণ দেখালেন তাতে এটুকু পরিস্কার যে এই রেজাল্ট পরিপূর্ণ রিচেকের ব্যাপারে আপনাদের সদিচ্ছা নেই। সুতরাং আমাদের উত্তরপত্র গুলো যেখানে এখনো আপনাদের  হাতে, রিট করার পর সেগুলো যে ম্যানিপুলেটেড হবে না সেই ভরসা হারিয়ে গিয়েছে। ভুল টা আপনাদের যার মাশুল এতগুলো ছাত্র ছাত্রী দিল। এটা জানামাত্র আপনাদের তো ক্ষমাপত্রসহ শুধরে নেওয়া উচিত ছিল যদি নূন্যতম এথিক্স থাকত।

আপনারা আমাদের মত জুনিয়র  ছাত্র-ছাত্রীদের দৃষ্টান্তের সহিত শিখিয়ে দিয়ে গেলেন যে  আমার ভুল হলেও আমি যেন কখনো দুঃখিত না হই, নিজের ভুল/ দায়িত্বহীনতা যেকোনো  অনৈতিক উপায়ে চেপে দিয়ে যাই। কিন্তু আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে যাব পরবর্তী  জেনারেশন যেন আপনাদের মত নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত না হয়।

আপনারা আপনাদের সম্মানের জায়গাটা এতগুলো ছাত্রছাত্রীর কাছে ধরে রাখতে পারেননি। আপনারা একেকজন বিসিপিএস নীতি নির্ধারক ছাড়াও আরো অনেক বড় বড় পোস্টে আছেন, অনেক ব্যস্ত সবাই জানে। কিন্তু স্যার, এত রাজনীতি করে পোস্টগুলো শো পিসের মত দখল করে রেখে কি লাভ যদি ঠিকমত দায়িত্ব পালন নাই করতে পারেন! যে ঠিকমত দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং নূন্যতম নৈতিকতা আছে  যার তার হাতে ছেড়ে দিন।

অন্ততপক্ষে এতগুলো ছাত্র-ছাত্রী আপনাদের ভুলের ভুক্তভোগী হত না। একেকজন ছাত্রের কত কষ্ট, ত্যাগ, সময়, মানসিক চাপ, সামাজিক চাপ এই একটা পরীক্ষার পিছে একটু স্মৃতি  হাতরালেই তো বোঝার কথা।  আপনাদের যদি এখন বলা হয় ‘আপনাদের এফসিপিএস  ডিগ্রী বাতিল। আবার পরীক্ষা দিন’।  দিবেন? এত অন্যায় করে আপনারা আসলেই ভালো থাকেন স্যার? ভালো থাকা সম্ভব?  এতগুলো ছাত্রছাত্রীর ক্ষমা পাবেন তো?

ইতি,

জনৈক ভুক্তভোগী।

বিসিপিএসের বক্তব্য 

জানতে চাইলে বিসিপিএস’র তৎকালীন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, এফসিপিএসের রেজাল্টে সব কিছু নিখুঁত, পরিষ্কার থাকে। ভুল হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। শিক্ষার্থীরা টানা ফেল করতেই পারে। শিক্ষার্থীরা যখন আবেদন করেছে, তাও আমরা নিখুঁতভাবে দেখেছি। ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগেও আমরা পঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করার পর রেজাল্ট প্রকাশ করেছি।

টানা কয়েকশ’ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়াকে স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, একেকটা পেপারে একেক ধরনের গ্রুপ প্রশ্ন থাকে। এক পেপারে প্রশ্ন সহজ হয়, আরেক পেপারে প্রশ্ন কঠিন হয়। প্রত্যেকটা পেপারের প্রশ্ন আলাদা আলাদাভাবে থাকে। মোট পাসের হার অন্যান্য পরীক্ষার চেয়ে কম থাকে। টানা একসাথে ৪৪১ বা তার চেয়ে বেশি অকৃতকার্য হতেই পারে।

তিনি বলেন, এফসিপিএস পরীক্ষায় এমনিতেই একটু কড়াকড়ি হয়। তাতে পরীক্ষার্থীরা খারাপ করে। বিসিপিএসের এমনও ইতিহাস রয়েছে, এফসিপিএস পরীক্ষায় মাত্র একজন পাস করেছে।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা যখন আবেদন করেছে, তখন আমরা (চেয়ারম্যান, পরীক্ষা কমিটি চেয়ারম্যান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ) বিষয়গুলো খুব গুরুত্বের সাথে দেখেছি। ফলাফল ঠিকই আছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তারা দাপ্তরিকভাবে আবেদন করলেও বিসিপিএস আনঅফিশিয়ালি জবাব দিয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিসিপিএসের নিয়ম হলো একসাথে ১০ বা ৪০০ জন আবেদন করতে পারবে না। তারা সবাই আবেদন করেছে আনঅফিশিয়ালি, তাই আমরা তাদেরকে উত্তর দিয়েছি টেলিফোনে। জানুয়ারিতে পরীক্ষা হয়েছে, আমরা ফেব্রুয়ারিতে ফলাফল প্রকাশ করেছি। এত মাস (মার্চ, এপ্রিল, মে) পর ফলাফল পরিবর্তনের দাবি তোলা অযৌক্তিক।’

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : এফসিপিএস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি