চিকিৎসকদের প্রেষণাদেশ নিয়ে ধোঁয়াশা, কোভিড ইউনিটগুলো সংকটে পড়ার শঙ্কা
মো. মনির উদ্দিন: করোনাভাইরাসের কারণ দেখিয়ে প্রেষণ বিলম্বিত করার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবে চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমই) ও অধিভুক্ত ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত চিকিৎসকরা কোভিড ইউনিটগুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন। সুতরাং কোডিভ নিবেদিত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে তাদের ওপর নির্ভরশীল এসব ইউনিট চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়াও প্রেষণাদেশে বিলম্বের কারণে কোর্স আউটেরও আশঙ্কা করছেন তারা! তবে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।
গত এক এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক আদেশে প্রেষণে থাকা চিকিৎসকদেরকে কোর্সের পাশাপাশি করোনা নিবেদিত হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে অপেক্ষায় থাকা চিকিৎকদের প্রেষণাদেশ না দিয়ে স্ব স্ব কর্মস্থলে কোভিড-১৯ রোগীদের সেবা দানের নির্দেশ প্রদান করে অধিদপ্তর।
কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদান প্রসঙ্গে জারি করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, উপরোক্ত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, বিভিন্ন স্নাতকোত্তর প্রতিষ্ঠানে এমডি/এমএস ফেজ-‘এ’/ফেজ-‘বি’ এবং এফসিপিএস কোর্সে অধ্যয়নের নিমিত্তে জানুয়ারি থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখ ও স্মারকের মাধ্যমে মোট ৬৭১ (ছয়শত একাত্তর) জন চিকিৎসকের প্রেষণ/শিক্ষা ছুটি প্রদানের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারী আকার ধারণ করায়, কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানের স্বার্থে ইতিমধ্যে যে সকল চিকিৎসকের প্রেষণ/ছুটি প্রদান করা হয়েছে, তাদেরকে কোর্সের পাশাপাশি কোভিড-১৯ আক্রান্ত হাসপাতালে সাময়িক সময়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ প্রদানের জন্য অথবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ন্যাস্ত এবং যে সকল চিকিৎসকদের প্রেষণ আদেশ জারি করা হয়নি, সে সকল চিকিৎকগণকে প্রেষণ আদেশ প্রদান না করে যার যার কর্মস্থলে থেকে কোভিড-১৯ রোগীদের সেবা দানের নির্দেশ প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো। একই সাথে যে সকল চিকিৎসক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রেষণের আবেদন দাখিল করেছেন, তাদের আবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে কিনা—এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো।
কোভিড হাসপাতালে স্থানান্তর ‘অর্থহীন’
এ আদেশের ফলে কর্মস্থল নিয়ে বিভ্রান্তি ও কোর্স আউটের শঙ্কায় পড়েছেন অধ্যয়নরত ও প্রেষণাদেশের অপেক্ষায় থাকা চিকিৎসকরা।
তারা বলছেন, প্রেষণে থাকা সকল চিকিৎসক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে করোনা রোগীদের সরাসরি চিকিৎসা দিচ্ছেন। এ অবস্থায় তাদের অন্য হাসপাতালে আলাদা কোভিড রোস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা অর্থহীন।
জানতে চাইলে বিএসএমএমইউর ফেজ-‘বি’র রেসিডেন্ট ডা. মিলি দে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘যেসব চিকিৎসক প্রেষণে আছেন, তারা সবাই নিজ নিজ ইনস্টিটিউটে কোভিড রোগীদের সরাসরি চিকিৎসা দিচ্ছেন, রোস্টার ডিউটি করছেন। তাহলে কেনো অন্য হাসপাতালে আলাদা কোভিড রোস্টার করতে হবে? আর সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশে চিকিৎসকদের প্রেষণ বিলম্বিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একটা কোর্সে চান্স পেতে কি পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়—সেটা আমরা সবাই জানি। তাহলে কেন এই অবিচার? এটা কেন আমরা মেনে নিবো?’
এ প্রসঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানের নিওনেটোলজির ফেজ-‘বি’র রেসিডেন্ট ডা. আহমাদ হাবিবুর রহীম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বিএসএমএমইউর মেডিকেল অফিসারের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। আর বেসরকারি রেসিডেন্টের সংখ্যাও কম। ফলে ডেপুটেশনপ্রাপ্ত চিকিৎসকরাই কঠোর সময়ানুবার্তিতা ও নিয়মানুবার্তিতা অনুসরণ করে করোনাসহ অন্যান্য রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একটি ভুল ধারণা আছে যে, প্রেষণে থাকা এই চিকিৎসকদের কোনো কাজ করতে হয় না। অথচ বাস্তবতা হলো, এখানে তাদের অনেক ডিউটি করতে হয়। পড়াশোনা বলা চলে গৌন।’
ডেপুটেশনে সৃষ্ট এ ধরনের জটিলতায় দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির ধারা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলেও মনে করেন তিনি।
কোর্স আউটের শঙ্কা
এ ছাড়া এ আদেশের ফলে কোর্স আউটের শঙ্কা প্রকাশ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকোলজি বিভাগের ফেজ-‘বি’র রেসিডেন্ট ডা. ফাতেমা আক্তার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডেপুটেশন আটকে দিয়ে কোর্স আউটের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে! চাকরির যথাযথ নিয়ম মেনে ডেপুটেশনে এসেছিলাম, অথচ ডেপুটেশন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন নিয়মের বালাই দেখছি না। ডেপুটেশন আমাদের অধিকার, অধিকার বঞ্চিত করার কোনো যথাযথ কারণ ও কেউ দেখাচ্ছেন না! আর বারবার যে দুই মাসের কথা বলা হচ্ছে, দুই মাস পর কোভিড সিচুয়েশনের কি ম্যাজিক্যাল উন্নতি হবে—তা আমার ক্ষুদ্র মাথায় আসছে না! বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের, অধিদপ্তর আমাদের, কিন্তু আমরা আসলে কারোরই না! অদ্ভুত অসহায় লাগছে!’
যা বলছেন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) মহাসচিব ডা. জাকির সুমন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অনেকেই বেসরকারিতে রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলেন। পরে সরকারি চাকরি হওয়ার পর সরকারই তাদেরকে দুই বছরের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। এখন এর আগেই যদি তাদেরকে কোর্স ছেড়ে দিতে বলেন। ফেজ-‘বি’তে অধ্যয়নের সুযোগ না দেন, তাহলে তার ভবিষ্যৎ কী হবে? সুতরাং যেসব প্রাইভেট ক্যান্ডিডেট প্রেষণ নীতিমালায় আটকে গেছেন, তাদের বসে থাকলে চলবে না।’
এ বিষয়ে নিজেদের পদক্ষেপ জানতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরীকে একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি।
বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য
শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে উল্লেখ করে বিএসএমএমইউ ভাইস-চ্যান্সেল (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ মেডিভয়েসকে জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিভুক্ত ইনস্টিটিউটগুলোতে অধ্যয়নরত রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের কোভিড ইউনিটে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।
এ ছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে বিদ্যমান নানাবিধ সংকটের কারণে অপেক্ষায় থাকা রেসিডেন্টদের চিকিৎসকদের ডেপুটেশনে বিলম্ব হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বিএসএমএমইউর ভিসি বলেন, কম সময়ের মধ্যে এ সমস্যাও কেটে যাবে।