ডা. মো. আহাদ হোসেন

ডা. মো. আহাদ হোসেন

এমবিবিএস, বিসিএস, এমডি (বিএসএমএমইউ)
কনসালটেন্ট ও পেইন ফিজিশিয়ান
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।


২২ নভেম্বর, ২০২০ ০১:৩২ পিএম

গাউট এর ব্যথা: সতর্ক হোন ও সুস্থ থাকুন

গাউট এর ব্যথা: সতর্ক হোন ও সুস্থ থাকুন

গাউট বা গেঁটেবাত আমাদের দেশে খুব সাধারণ একটি সমস্যা। গেঁটেবাত এর কথা শুনলে অনেকেই ভয়ে ভীত হয়ে পড়েন এই ভেবে যে এবার মনে হয় আর রক্ষা নেই। বিষয়টি কী আসলে তাই? আজকের লেখায় আমরা গাউটের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করবো।
 
গাউট আসলে জয়েন্ট এর একটি সমস্যা বা আর্থাইটিস। এই ব্যথাটি হঠাৎ করে আসে। যেকোনো একটি জয়ন্ট বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলের জয়েন্ট বেশি আক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে জয়েন্টটিতে তীব্র ব্যথা হয়, ফুলে যায় এবং লাল হয়ে যেতে পারে।

গাউট এর লক্ষণ সমূহ:
১. জয়েন্টে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। সাধারনত পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির জয়েন্ট বেশি আক্রান্ত হয়। অন্যান্য জয়েন্ট ও আক্রান্ত হতে পারে যেমন: হাঁটু, হাতের কব্জি, কনুই ও হাতের আংগুল।

২. আক্রান্ত জয়েন্টটি ফুলে যায় ও লাল হয়ে যায়।

৩. জয়েন্ট এর নাড়াছাড়া ক্ষমতা কমে যায় বা তীব্র ব্যথা সম্পন্ন হয়।

গাউট এর কারণ কি?
গাউটে সাধারণত ইউরেট নামক এক ধরনের ক্রিস্টাল জয়েন্ট এর ভেতরে জমা হয় এবং জয়েন্টের ভেতরে ইনফ্লামেশন করে ও ব্যথা হয়।
সাধারণভাবে আমাদের শরীরে ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়। যা আমাদের স্বাভাবিক মেটাবলিজম প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। তৈরি হওয়া ইউরিক এসিড আবার রক্তের সাথে মিশে কিডনি দিয়ে শরীরের বাইরে নির্গত হয়। কিন্তু যদি কোনো কারণে শরীর অধিক পরিমাণে ইউরিক এসিড উৎপন্ন করে অথবা ইউরিক এসিড বেড়ে যায় এমন ধরনের খাবার দীর্ঘদিন ধরে খাওয়া হয় অথবা শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড বের হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়। এ সকল কারণের যে কোনটির জন্যই আমাদের শরীরে ইউরিক এসিড বেড়ে যেতে পারে। ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে তা রক্তের মাধ্যমে আমাদের জয়েন্ট ক্যাভিটিতে পৌঁছায়। সেখানে এক ধরনের ক্রিস্টাল তৈরি করে সেগুলো সুচালো আকৃতির। আর এর কারণেই জয়েন্ট তীব্র ব্যথা হয় যখনই আমরা হাঁটতে যাই বা অন্য কোন কাজ করতে যাই।

যেসব করনে গাউটের ঝুঁকি বেড়ে যায়:
খাদ্যাভ্যাস:
কিছু খাবার আছে যেগুলোতে রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাংস বিশেষ করে লাল মাংস, ভেড়ার মাংস ও শুকরের মাংস, বিভিন্ন অঙ্গের মাংস যেমন লিভার, কিডনি, থাইমাস ও প্যানক্রিয়াস, সামুদ্রিক খাবার ও মাছ যেমন, লবস্টার, সেলফিশ, মিষ্টি ফল সমূহ যেগুলোর মধ্যে ফ্রুক্টোজ থাকে, বিভিন্ন ধরনের বেভারেজ বা ড্রিংকস, ফাস্টফুড, আইসক্রিম ও ক্যান্ডি, অ্যালকোহল বা অ্যালকোহল জাতীয় ড্রিংকস যেমন বিয়ার ইত্যাদি।

শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া: 
শরীরের ওজন অত্যাধিক বেড়ে গেলে শরীরে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড কে শরীর থেকে বের করে দেয়ার জন্য কিডনির উপরে চাপ তৈরি হয়। তাই অতিরিক্ত ওজন গাউটের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্যান্য রোগের উপস্থিতি: 
কিছু কিছু রোগ আছে যেগুলো থাকলে তাদের গাউটের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।তাদের মধ্যে অন্যতম উচ্চরক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, কিডনি এর সমস্যা জনিত রোগ ও হৃদরোগ।

কিছু ঔষধ সেবন:
কিছু কিছু ওষুধ সেবনের কারণে ইউরিক এসিড বেড়ে যেতে পারে। তাদের মধ্যে অন্যতম থায়াজাইড ডাই ইউরেটিক ও এসপিরিন জাতীয় ঔষধ। এই ওষুধগুলো সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে। তাই যারা এ সকল ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করেন তাদের ক্ষেত্রে গাউট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের গাউট জাতীয় সমস্যা থাকা:
পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের গাউট এর সমস্যা থাকলে পরিবারের যে কারোরই এই গাউটে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বয়স ও লিঙ্গ ভেদ: 
গাউট সাধারণত পুরুষদের বেশি হয়ে থাকে। কারণ এদের ইউরিক এসিডের মাত্রা মহিলাদের থেকে স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। যে কারণে পুরুষদের ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে গাউট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মহিলাদের ক্ষেত্রে সাধারণত মেনোপজের পরে ইউরিক এসিডের মাত্রা পুরুষদের সমান হয়ে যায়। যে কারণে মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪৫ বা ৫০ বছরের পরে গাউটের সম্ভাবনা থাকে।

সম্প্রতি কোন অপারেশন বা আঘাত পাওয়া:
অতি সম্প্রতি কোন অপারেশন হলে বা বড় কোনো আঘাত পেলে সেখান থেকেও গাউট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গাউট থেকে নিরাপদ থাকার উপায়:
১. প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা

২. বেভারেজ ও চিনি যুক্ত ড্রিংকস এড়িয়ে চলা

৩. অ্যালকোহল বাদ দিয়ে চলা

৪. কম চর্বিযুক্ত ডেইরি উপাদান থেকে প্রোটিন জাতীয় খাবার সংগ্রহ। যেমন: দুধ।

৫. পরিমিত মাছ ও মাংস খাওয়া।

৬. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।

৭. যারা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেছেন বা খেলাধুলা করেছেন তারা হঠাৎ করেই তা বন্ধ করে না দেওয়া।

রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষাসমূহ:
CBC
S. Uric acid 
X ray 
Ultrasonography
Joint fluid analysis
Dual energy CT Scan

গাউট এর চিকিৎসা পদ্ধতি:
সাধারণত গাউট সমস্যায় দুই ধরনের চিকিৎসা ব্যবহৃত হয়। প্রথম হচ্ছে একিউট অবস্থা বা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা এরমধ্যে অন্যতম এন এস এ আই ডি জাতীয় ওষুধ। যেগুলো আমরা বিভিন্ন দোকান থেকে হরহামেশাই কিনে থাকি। এক্ষেত্রে কিছু অসুধ ভালো কাজ করে। যেমন: Etoricoxib( Etorix 120mg), Naproxen sodium (Napsod 550mg) জাতীয় ওষুধ গুলো ৩ থেকে ৫ দিন খাওয়া যেতে পারে। 

তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে খালি পেটে খাওয়া যাবেনা। তাতে প্রচন্ড এসিডিটি হতে পারে। যাদের পূর্ব থেকেই এসিডিটির সমস্যা আছে তাদের আরও বেশি এসিডিটি হতে পারে এবং পেটে ব্যথা হতে পারে। এছাড়াও যাদের বয়স বেশি এবং প্রেসার ও কিডনির সমস্যা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলো খুবই সতর্কতার ব্যবহার করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ এক্ষেত্রে জরুরি। 

তাৎক্ষণিক চিকিৎসার মধ্যে আরও যে কয়েকটি বিষয় করা যেতে পারে তা হচ্ছে যদি জয়েন্ট ফুলে যায় তাহলে আক্রান্ত অঙ্গটি উঁচুতে রাখলে কিছুটা আরামদায়ক হতে পারে। আক্রান্ত জয়েন্ট এ বরফ কম্প্রেশন দেয়া যেতে পারে। তাতে কিছুটা আরাম অনুভূত হতে পারে।
যাদের এই গাউট বা জয়েন্টের ব্যথা দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে বা বারবার হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।

চিকিৎসক প্রয়োজন মতো আরও বেশ কিছু ঔষধ যোগ করে দিতে পারেন যাতে করে গআউট বারবার হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। অনেক সময় জয়েন্টে ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই কাজ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বা বারবার গাউট এর প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য ঔষধ সেবনের পাশাপাশি সাধারণ কিছু সতর্কতা তা মেনে চলা খুবই জরুরি।
১. যে সকল খাবারে গাউটের ঝুঁকি আছে সেগুলো এড়িয়ে চলা।

২. ডায়াবেটিস বা অন্যান্য রোগ থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা।

৩. নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।

৪. যারা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করে অভ্যস্ত বা খেলাধুলা করে অভ্যস্ত হঠাৎ করে সেগুলো বন্ধ করে না দেওয়া।

অনেকে মনে করে থাকেন গাউট একবার হলে এর থেকে রেহাই পাবার উপায় নেই। এই ভেবে ভীত থাকেন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। বিষয়গুলো আসলে সঠিক নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, নিজের ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখা ও প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা। এসকল বিষয় মেনে চললে গাউট তেমন কোন সমস্যা করে না। কোন রোগ থেকে সুস্থ থাকার পূর্ব শর্ত হচ্ছে সেই রোগ সম্বন্ধে একটি প্রাথমিক ধারণা নেয়া এবং সেই বিষয়গুলো মেনে চলা। আজকে গাউট নিয়ে যে আলোচনা করা হলো আশা করি আপনাদের কাজে লাগবে। সবাই ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে