পাখি দেখা কমাতে পারে মস্তিষ্কের বার্ধক্য, ডিমেনশিয়া রোগীদের জন্যও উপকারী: গবেষণা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: পাখি দেখা শুধু অবসর কাটানোর আনন্দদায়ক উপায় নয়, এটি মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পাখি দেখার অভ্যাস মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে পারে। পাশাপাশি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের সক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রক্রিয়া ধীর করতে এটি সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি মানুষের স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, কথা বোঝা এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে এমন রোগে (ডিমেনশিয়া) আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতেও পাখি দেখা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। পরিচর্যাকেন্দ্রে পাখি দেখার ব্যবস্থা করে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন গবেষকেরা।
যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ফোর্জ মিল লেকে প্রতি সপ্তাহে একদল বয়স্ক মানুষ একত্রিত হয়ে পাখি দেখেন। তাঁদের অনেকেরই সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখতে কিংবা কথোপকথন অনুসরণ করতে অসুবিধা হয়। কিন্তু পাখি পর্যবেক্ষণের সময় তাঁদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। পাখি নিয়ে আলোচনা, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং অন্যদের সঙ্গে সময় কাটানো তাঁদের আনন্দিত করে।
৭৮ বছর বয়সী হ্যারল্ড নামের এক ব্যক্তি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর ক্রমেই গুটিয়ে যাচ্ছিলেন এবং উদ্বেগে ভুগছিলেন। তাঁর মেয়ে তাঁকে পাখি দেখতে নিয়ে গেলে প্রথমে তিনি কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন। পরে একটি রবিন পাখি দেখতে পেয়ে হাসতে শুরু করেন। পানিতে হাঁসের সাঁতার কাটাও উপভোগ করেন তিনি। তাঁর মেয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন পর বাবাকে সেদিন হাসতে দেখেন তিনি।
মস্তিষ্কের গঠনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
কানাডার টরন্টোর বেক্রেস্ট একাডেমি ফর রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশনের গবেষক এরিক উইংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় অভিজ্ঞ ও নবীন পাখিপ্রেমীদের মস্তিষ্কের তুলনা করা হয়। এ জন্য পাখি শনাক্ত করার সময় তাঁদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে ভিন্ন ধরনের স্নায়বিক সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মনোযোগ, দৃশ্যগত উপলব্ধি এবং চোখে দেখা কোনো কিছু শনাক্ত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বেশি সক্রিয়তা দেখা গেছে। অপরিচিত পাখি শনাক্ত করার সময় এই সক্রিয়তা আরও স্পষ্ট ছিল।
এ ছাড়া একই বয়সী নবীনদের তুলনায় অভিজ্ঞ পাখিপ্রেমীদের মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে বেশি সংগঠিত বিন্যাস লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের এই সংগঠন কমতে থাকে, যা জ্ঞানীয় সক্ষমতা হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষকদের ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে পাখি শনাক্ত করার মতো মনোযোগনির্ভর দক্ষতা চর্চা মস্তিষ্কের নমনীয়তা বা ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’র সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে মস্তিষ্কের গঠনগত পার্থক্য পাখি দেখার অভ্যাসের ফল কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ডিমেনশিয়া রোগীদের জন্যও আশাব্যঞ্জক
জার্মানির ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আইখস্ট্যাট-ইঙ্গোলস্টাডের অধ্যাপক এলিজাবেথ কালস পরিচর্যাকেন্দ্রে বসবাসকারী ব্যক্তিদের ওপর পাখি দেখার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তাঁর গবেষক দল ৬৫টি পরিচর্যাকেন্দ্রের বাইরে পাখিদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করে, যাতে বাসিন্দারা ঘরের ভেতরে বসেই পাখি দেখতে পারেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের সুস্থতা ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কথোপকথন অনুসরণ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ, পাখি চিনতে পারা এবং আশপাশের বিষয়ে সজাগ থাকার মতো দক্ষতায় উন্নতির লক্ষণ দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের উন্নতিও তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে লক্ষ করা গেছে বলে জানান গবেষক।
এই ফলাফলের পর জার্মানির বাভারিয়া অঞ্চলের ৪০০টিরও বেশি পরিচর্যাকেন্দ্রে পাখিদের খাবার দেওয়া এবং পাখি দেখার ব্যবস্থা তৈরিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও ‘বার্ড টেলস’ নামে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য একটি থেরাপি কর্মসূচি চালু রয়েছে। এতে পরিচর্যাকেন্দ্রে পাখির খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় এবং পাখির ডাকের অনুকরণ করতে পারে এমন খেলনা ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির সঙ্গে পরিচয় করানো হয়। অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, এই কার্যক্রম তাঁদের চিন্তাভাবনাকে সক্রিয় করে এবং অতীতের স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করে।স্ট্রোকের পর কথা বলা কিংবা ভাষা বুঝতে সমস্যায় ভোগা কিছু মানুষের জন্যও পাখি পর্যবেক্ষণভিত্তিক কার্যক্রম ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
কেন উপকারী পাখি দেখা?
গবেষকদের মতে, পাখি দেখার উপকারিতা কেবল পাখি শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির সান্নিধ্য, মনোযোগ, কৌতূহল, আনন্দ এবং অন্যদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে এটি মানুষের মানসিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
পোল্যান্ডে ৩৮৮ জন পাখিপ্রেমীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা পাখি দেখাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন এবং এতে বেশি আগ্রহী, তাঁদের মধ্যে মানসিক প্রশান্তি ও পুনরুজ্জীবনের অনুভূতি বেশি দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হওয়ার চেয়ে আগ্রহের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গবেষকদের মতে, নতুন কিছু দেখা ও শেখার আগ্রহ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করতে পারে। জীবনের মধ্যবয়স থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত থাকা তাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ঘরে বসেও মিলতে পারে উপকার
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত অনেক মানুষের জন্য যাতায়াত ও বাইরে যাওয়ার অসুবিধা পাখি দেখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে জানালা দিয়ে পাখি দেখা কিংবা বাড়ির আশপাশে পাখিদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করেও প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাখি দেখা সহজলভ্য একটি কার্যক্রম, যা বয়স্ক ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবনে আনন্দ, কৌতূহল ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
এমআর/
জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস
রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস
রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস
রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর