ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো

ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো

২১তম বিসিএসের একজন সদস্য
সাবেক লাইন ডিরেক্টর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর


২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:১৩ পিএম

আদর্শ উপজেলা হাসপাতালের কাঠামো ও জনবল (দ্বিতীয় কিস্তি)

আদর্শ উপজেলা হাসপাতালের কাঠামো ও জনবল (দ্বিতীয় কিস্তি)
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সম্পাদিত

বাংলাদেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং বর্তমান সময়ের উপযোগী একটি আধুনিক মডেল হাসপাতালে রূপান্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন। একটি মানসম্পন্ন হাসপাতালে মানসম্মত চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি গতিশীল প্রশাসন ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

আধুনিক মডেল হাসপাতালের বিভাগসমূহ

যদি আমরা বর্তমান এবং ভবিষ্যতের আলোকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সাজাতে চাই, তাহলে উপজেলা হাসপাতালকে বেশ কয়েকটি বিভাগে ভাগ করতে হবে। ২০২৬ সালের উপযোগী আধুনিক ও মানসম্পন্ন উপজেলা হাসপাতাল গড়তে যেসব বিভাগ থাকা অপরিহার্য, সেগুলো হলো—প্রশাসন বিভাগ, অর্থ ও ক্রয় বিভাগ, পাবলিক হেলথ ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিভাগ, জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, অন্তঃবিভাগ, অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স, ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগ, ফরেনসিক মেডিসিন ও টক্সিকোলজি ও মেডিকোলিগ্যাল বিভাগ, রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ, স্টোর এবং ইনফেকশন প্রিভেনশন ও ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ (যার অধীনে থাকবে স্টেরিলাইজেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা)।

এই নিবন্ধে আধুনিক উপজেলা হাসপাতালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'প্রশাসন বিভাগ' এবং 'অর্থ ও ক্রয় বিভাগ'-এর রূপরেখা, দক্ষ জনবল কাঠামো ও নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।

দক্ষ স্বাস্থ্য প্রশাসকের ভূমিকা

যেহেতু দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাই এই হাসপাতালগুলো নিয়ে স্বপ্ন দেখার এবং সঠিক পরিকল্পনা করার জন্য একজন দক্ষ স্বাস্থ্য প্রশাসকই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

একজন হাসপাতাল প্রশাসকের কাজ বা দায়িত্ব দেশভেদে পার্থক্য হতে পারে। বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। এ দেশের মানুষের স্বভাব, চরিত্র, আমানতদারিতা, রুচি-পছন্দ, পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে আলাদা। তাই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য প্রশাসন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে আলাদা হবে—এটাই স্বাভাবিক।

স্বাস্থ্য প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো বিবেচনায় জেলা ও উপজেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ প্রশাসনের সাথে স্বাস্থ্য প্রশাসনের মূল পার্থক্য হলো, স্বাস্থ্য প্রশাসন পরিচালনায় সাধারণ প্রশাসনিক জ্ঞানের সাথে মেডিকেল এবং টেকনিক্যাল জ্ঞান প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয়। স্বাস্থ্য প্রশাসনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়—পাবলিক হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, জেনারেল হসপিটাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং স্পেশালাইজড অর সুপার স্পেশালাইজড হসপিটাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।

প্রশাসন বিভাগের জনবল কাঠামো

সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও হাসপাতাল প্রশাসকের তীব্র সংকট রয়েছে। একজন যোগ্য এবং দক্ষ হাসপাতাল প্রশাসককে যদি হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেই হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মান অনেক উন্নত হয়। আমার প্রস্তাবনা হলো, হাসপাতাল প্রশাসন বিভাগে থাকবেন উপপরিচালক পদের একজন ৪র্থ বা ৫ম গ্রেডের একজন অফিসার—স্বাস্থ্য বিভাগে যার অন্তত ১২ বছর কাজের অভিজ্ঞতা আছে। উপপরিচালকের অধীনে থাকবেন একজন প্রধান সহকারী, তিনজন উচ্চমান সহকারী, একজন পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট অথবা কনফিডেনশিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট, একজন অ্যাকাউন্টেন্ট।

যোগ্য প্রশাসকের গুণাবলি ও প্রয়োজনীয়তা

যেহেতু হাসপাতাল প্রশাসন একটি কারিগরি ও বিশেষায়িত প্রশাসন, তাই মেডিকেল সাইন্স ও রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসকের ভালো ধারণা থাকতে হবে। একই সাথে তিনি স্বাস্থ্য বিষয়ক আইনকানুন জানবেন, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা করবেন, ক্রয় সংক্রান্ত নিয়মাবলী (প্রকিউরমেন্ট রুলস) বিষয়ে দক্ষ হবেন এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে ভালো জ্ঞান রাখবেন। তাঁর সাথে কর্মরত সকল কর্মচারীদের নাম, দায়িত্ব-কর্তব্য ও স্বভাব সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। তিনি সকল ডিপার্টমেন্টের সাথে চমৎকার সমন্বয় সাধন করবেন এবং সহকর্মী ও অধীনস্থদের সামনে সততা ও কর্মদক্ষতার রোল মডেল হবেন। তাঁর যোগাযোগ দক্ষতা হবে স্পষ্ট, কার্যকর ও ফলপ্রসূ। তিনি দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন, এবং উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করবেন। এ কারণেই ১২ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গ্রেড-৪ এর কর্মকর্তাকে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের প্রধান করা যুক্তিযুক্ত হবে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের পার্থক্য

অবকাঠামো, পরিকল্পনা, রোগীদের অর্থনৈতিক অবস্থা, বাজেট প্রাপ্তি ও বাজেট ব্যয়, চিকিৎসক-নার্স ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগ, যন্ত্রপাতি ক্রয়, রোগীদের প্রত্যাশা—এই বিষয়গুলো বিবেচনায় সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় বিস্তর পার্থক্য আছে। আমি এখানে বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া উচিত—এ নিয়ে আলোচনা করব।

দক্ষতা বিকাশ ও পদায়ন নীতি

হাসপাতাল পরিচালনায় যার দক্ষতা এবং আগ্রহ—কোনোটিই নেই, তাঁকে এই পদে পদায়ন করা মোটেও উচিত নয়। দক্ষ প্রশাসক পেতে চাইলে প্রতিভা অনুসন্ধান (ট্যালেন্ট হান্ট) করতে হবে এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।

হাসপাতাল প্রধানের (উপপরিচালক) সাথে থাকবেন ৬ষ্ঠ গ্রেডের তিন জন সহকারী পরিচালক—সহকারী পরিচালক (প্রশাসন), সহকারী পরিচালক (অর্থ, পরিকল্পনা ও ক্রয়) এবং সহকারী পরিচালক (পাবলিক হেলথ)। প্রত্যেক সহকারী পরিচালকের সাথে একজন করে উচ্চমান সহকারী এবং একজন অফিস সহায়ক থাকবেন।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও গুরুত্ব

যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ, পরিকল্পনা ও ক্রয় বিভাগের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। হাসপাতালের বার্ষিক এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজেট প্রণয়ন, উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি, ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও রিয়েজেন্ট ক্রয়, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান, সেবামূল্য (ইউজার-ফি) হতে সংগৃহীত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমাদান, অবকাঠামো উন্নয়ন, ভবিষ্যতে কোন কোন যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হতে পারে—এর প্রাক্কলন ও সংগ্রহের রূপরেখা তৈরি—এগুলোর জন্য স্বতন্ত্র বিভাগ না থাকলে সঠিকভাবে হাসপাতাল পরিচালনা করা অসম্ভব।

সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের আয়ের ভিন্নতা

বেসরকারি হাসপাতালের আয়ের উৎস হলো সেবাপ্রার্থী কর্তৃক প্রদত্ত ফি। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের আয়ের উৎস হলো সরকার থেকে প্রাপ্ত বরাদ্দ। আমাদের দেশে একবার বাজেট প্রাপ্তির পর চাহিদা অনুযায়ী পুনরায় বাজেট প্রাপ্তি বেশ সময়সাপেক্ষ। দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল প্রধানের বক্তব্য হলো, তারা যে পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ পান, তা তাদের চাহিদা ও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

অর্থনৈতিক বিধিমালার সংশোধন প্রয়োজন

সরকারি হাসপাতালে কৃত বিভিন্ন ল্যাব টেস্ট থেকে প্রাপ্ত সেবামূল্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারি কাজে ব্যয় করতে পারেন না। এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দিতে হয়। ল্যাবের রাসায়নিক উপাদান (রিয়েজেন্ট) বা অন্যান্য দ্রব্য কিনতে চাইলে সরকারের কাছে বাজেট বরাদ্দ চেয়ে আনতে হয়। হাসপাতালের সেবামূল্য থেকে প্রাপ্ত অর্থ রোগীদের কল্যাণে সরাসরি ব্যয় করা যায়—এমনভাবে অর্থনৈতিক বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার প্রয়োজনীয়তা

বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করা থেকে শুরু করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে পণ্য ক্রয় করা হাসপাতাল প্রধানের একার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এই জন্য এ বিভাগে একজন সিনিয়র অফিসার থাকা বাঞ্ছনীয়।

প্রশাসন ও অর্থ বিভাগে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মকর্তা থাকলে এবং চাহিদা অনুযায়ী বাজেট পেলে হাসপাতালে আগত সেবাপ্রার্থীদের খুব চমৎকারভাবে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায়, এর চমৎকার উদাহরণ ঢাকা সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের প্রশাসনিক কাঠামো

৫০০ রোগীর জন্য প্রস্তাবিত 'সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে' ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ১৫০-এর কম। সেই হাসপাতালের প্রশাসন পরিচালনা করেন একজন মহাপরিচালক (২য় গ্রেডের অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদাসম্পন্ন), একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (৩য় গ্রেডের যুগ্মসচিব মর্যাদাসম্পন্ন), চারজন পরিচালক (৫ম গ্রেডের উপসচিব মর্যাদাসম্পন্ন), চারজন উপপরিচালক (৬ষ্ঠ গ্রেডের সিনিয়র সহকারী সচিব মর্যাদাসম্পন্ন), ছয় থেকে সাতজন সহকারী পরিচালক (সহকারী সচিব মর্যাদাসম্পন্ন)।

প্রশাসন, অর্থ, পরিকল্পনা ও বাজেট বিভাগ পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যান্য হাসপাতাল সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মডেল অনুসরণ করলে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারবে। (চলবে) 

জেএইচ/এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত