০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:১৫ পিএম

বিভিন্ন মেডিকেলে প্রফ পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা

বিভিন্ন মেডিকেলে প্রফ পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা
প্রতীকী ছবি

মেডিভয়েস রিপোর্ট: সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার খরচ তুলনামূলক কম হলেও পেশাগত পরীক্ষার ফি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে পরীক্ষার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাদের অভিযোগ, আগের বছরের তুলনায় এবার ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলেও এর কারণ বা খাত সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে প্রফে বসতে এত টাকা কেন—এই প্রশ্ন তুলে প্রতিবাদে নেমেছেন তারা।

অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের বলেছে, একই সঙ্গে বিভিন্ন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি কাঠামোয় সমন্বয় আনারও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গত ৪ অক্টোবর এক প্রতিবাদলিপিতে খুলনা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘অত্যন্ত ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা জানাচ্ছি যে, মে ২০২৬-এর দ্বিতীয় পেশাগত এমবিবিএস পরীক্ষার জন্য পরীক্ষা ফি ও সেশন চার্জ বাবদ খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা মেডিকেল কলেজ কর্তৃক মোট ১১,৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ফি নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলছি। এটি শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যান্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় নির্ধারিত এই ফি আমাদের কাছে অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য।’

‘আমরা এই ফি নির্ধারণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং দাবিগুলো উত্থাপন করছি, যথা—শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং দেশের অন্যান্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জসা রেখে পরীক্ষা ফি ও সেশন চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে এবং পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার সময়সীমা বৃদ্ধি করতে হবে।

‘দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা ফর্ম পূরণ কার্যক্রম বয়কট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে দাবিগুলো পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি।’

ফরিদপুর মেডিকেলে এক প্রফে অতিরিক্ত ফি ৮,৩০০ টাকা

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের ১৭-১৮ সেশনের এক শিক্ষার্থ বলেন, সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রফেশনাল পরীক্ষার ফি নির্ধারিত থাকে—এটা আমরা জানি। কিন্তু সেই নির্ধারিত ফি'র বাইরে অতিরিক্ত ৮,৩০০ টাকা একজন শিক্ষার্থীকে প্রফে বসার জন্য কেন দিতে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর আমরা জানতে চাই। এটা কোনো নতুন মেডিকেল কলেজ নয় যে, কলেজের উন্নয়ন, অবকাঠামো বা কোনো বিশেষ খাতের জন্য প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রফের আগে এভাবে অতিরিক্ত হাজার হাজার টাকা নেওয়া যৌক্তিক হবে। 

‘সরকারি মেডিকেলে পড়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর আর্থিক সামর্থ্য এক নয়। কারও পরিবারের কাছে হয়তো ৮-৯ হাজার টাকা খুব সামান্য। কিন্তু কারও কাছে এই টাকাটাই মাসের বাজারের টাকা, কারও বাবার কয়েক দিনের উপার্জন, কারও পরিবারের জন্য বাড়তি একটি বড় চাপ’—বলেন তিনি। 

ওই শিক্ষার্থীর আক্ষেপ, ‘প্রফের আগে একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা থাকার কথা, তিনি কীভাবে ভালোভাবে প্রস্তুতি নেবেন? কিন্তু তার বদলে যদি চিন্তা করতে হয়, আরও ৮৩০০ টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব? তাহলে সেটা শুধু একটি ফি’র বিষয় থাকে না; এটা হয়ে যায় একজন শিক্ষার্থীর ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ। আর প্রশ্নটা আরও জোরালো হয় যখন দেখা যায়, দেশের অধিকাংশ সরকারি মেডিকেল কলেজে এ ধরনের অতিরিক্ত ফি’র প্রচলনই নেই। তাহলে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে এই অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার প্রয়োজনটা ঠিক কোথায়? এই টাকার খাত কী? কেন এই টাকা নেওয়া হচ্ছে? কোন নিয়ম বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে নেওয়া হচ্ছে?’

তাজউদ্দিন আহমেদে এক তৃতীয়াংশ ফি বৃদ্ধি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ফাইনাল প্রফের জন্য লাগবে ৮ হাজার ৬০০, থার্ড প্রফের জন্য হচ্ছে ৮ হাজার ৪০০, সেকেন্ড প্রফের জন্য ৭ হাজার ২০০ আর ফার্স্ট প্রফের জন্য ৪ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ গত বছর ছিল এর অর্ধেকের চেয়ে একটু বেশি, বলতে পারেন সর্বোচ্চ দুই-তৃতীয়াংশ।

কর্তৃপক্ষ এবার বাড়ানোর কোনো কারণ উল্লেখ করেছেন কি-না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কোনো কিছু বলেননি। শুধু একটি নোটিশ দিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। 

মাইগ্রেশনে নামমাত্র ফিতে ভর্তির সুযোগ

তিনি বলেন, আগে মাইগ্রেশনে ভর্তির সমান টাকা দেওয়া লাগতো। এখন নামমাত্র ফি দিয়ে কলেজ পরিবর্তন করা যাচ্ছে। ওই ফি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বলা চলে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রফের ফি বৃদ্ধি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সবাই বিরক্ত জানিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের বাসা থেকে নিয়মিত যে টাকাটা আসে, এটা দিয়েই বাইরে থাকার খরচ মেটাতে হয়। এখন হঠাৎ করে এবার ৮,০০০ টাকা লাগবে—মানে ৮-১০ হাজারের কাছাকাছি। এই অতিরিক্ত পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ। ওনারাও তো জিজ্ঞাসা করে যে, এত টাকা কি জন্য লাগবে? এত লাগার তো কথা না। 

ফি বেড়েছে মুগদা মেডিকেলে 

মুগদা মেডিকেল কলেজে প্রথম প্রফ ৫৬৬০ টাকা, দ্বিতীয় প্রফ ৪৫০০ টাকা ও তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষার ফি ৫,৬৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুগদা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষার এক শিক্ষার্থী জানান, মুগদা মেডিকেলে তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষার ফি ৫,৬৫০ টাকা চেয়েছে, হিসাবে যেখানে ৪,৮০০ টাকা হওয়ার কথা।

মেডিকেল কলেজ প্রশাসক যা বলছেন

এ ব্যাপারে একাধিক মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রায় একই রকম চিত্র মিলেছে। তবে তারা মনে করেন, একেক মেডিকেলে একেক রকম ফি নেওয়া হলেও খুব বেশি নেওয়া হচ্ছে না। কোনো কোনো মেডিকেলে ভর্তির সময় সেশন ফি নেওয়ায় প্রফের সময় অংকটা বড় দেখায় না। এর পরও শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে ফি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। 

জানতে চাইলে খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আমানুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যেহেতু খুলনা মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ফর্ম ফিলাপের জন্য নির্ধারিত ফি ও খাতগুলো দেওয়া আছে। যেমন—কেউ তিনটি বিষয়ে ফর্ম ফিলাপ করলে নির্ধারিত ফি প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকার মতো আসে। এর সঙ্গে সরকারি বেতন ও অন্যান্য নির্ধারিত চার্জ রয়েছে। আর যে সেশন চার্জের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত বার্ষিক। আগে ভর্তি হওয়ার সময়ও সেশন চার্জ নেওয়া হতো। বর্তমানে ভর্তি ফি-ও নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে। আগে বিভিন্ন সময়ে ১৮ হাজার থেকে প্রতিষ্ঠান ভেদে ২২-২৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। কিন্তু এখন সাধারণত ১১ থেকে ১৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়। ডিজি অফিস নির্ধারিত সীমার বাইরে নেওয়ার সুযোগ নেই।’

তাহলে ভর্তির সময় যে সেশন ফি নেওয়া হয়, সেটি কি পরবর্তীতে আবার নেওয়া হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেশন চার্জ বার্ষিক। ভর্তি হওয়ার সময় এক বছরের জন্য নেওয়া হয়। পরবর্তীতে আবারও নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তা প্রযোজ্য হবে। তবে ১১ হাজার ৪০০ টাকা বেশিই মনে হচ্ছে।

বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ফি কাঠামো ভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথাও সাড়ে সাত হাজার টাকা, আবার কোথাও ৪ হাজার ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অনেক জায়গায় সেশন ফি আগেই নেওয়া হয়, ফলে পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের ওপর একসঙ্গে বাড়তি চাপ পড়ে না। শিক্ষার্থীরা যেহেতু এ বিষয়ে দাবি তুলেছে, তাই তাদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানোর জন্য সেশন চার্জের অংশটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টাকা হিসেবে সমন্বয়ের বিষয়টি আমরা দেখছি।

বিষয়টি আরও সহজ করার উপায় খুঁজছেন জানিয়ে তিনিবলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত সাড়ে সাত হাজার টাকার ফি কিছুটা কমানো যায় কি-না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। অন্যান্য মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে এগিয়ে এসেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ও জানিয়েছে, বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করে উপস্থাপন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে এবং আমি সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাচ্ছি। সাড়ে সাত হাজার টাকার যে চার্জটি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি কমানো যায় কি না—এ বিষয়ে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।’

‘তবে এটি তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ এই ফি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনুমোদিত। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তাই বর্তমান শিক্ষার্থীরা হয়তো এবারই এর সুফল নাও পেতে পারে; তবে ভবিষ্যতে, পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এর সুফল পেতে পারে’—বলেন তিনি।

এ ব্যাপারে কথা বলতে গাজীপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জোবায়দা সুলতানাকে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টাও পাওয়া যায়নি।

তদন্ত করে পদক্ষেপের আশ্বাস স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের

পেশাগত পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। আমি বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। কোন যুক্তিতে বা কী কারণে অতিরিক্ত ফি নেওয়া হচ্ছে, আদৌ এর পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হবে।’

একই সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাগত পরীক্ষার ফি-তে অসামঞ্জস্য থাকার কথাও জানান তিনি। বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি কম, আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি—এ ধরনের বৈষম্য রয়েছে। এ বিষয়ে আগামী সপ্তাহে একটি বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে একসঙ্গে আলোচনায় বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈঠকে স্নাতক পর্যায়ের পেশাগত পরীক্ষার ফি কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় আনার বিষয়ে আলোচনা হবে।

‘তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত হওয়ায় ফি বেশি বা কম নিতে তাদের সরাসরি নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। ফি কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় আনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ কারণেই এই উদ্যোগ।’

বৈঠকের পর এ বিষয়ে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি জানান, সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে মেডিকেল কলেজগুলোকে বর্ধিত ফিসহ পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হবে।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত