সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন পরিচালক ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার
মেডিভয়েস রিপোর্ট: রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তা ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার।
আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পার-২ শাখার প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ‘ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার (কোড-১০০৬৭২৮) বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক (হেমাটোলজি) পদে ইনসিটু এবং ওএসডি হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন। একই সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগে।’
নতুন আদেশে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) পদে পদায়ন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
মেডিভয়েস প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনালাপে নতুন দায়িত্ব পালন ও হাসপাতালের বিভিন্ন সেবাব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগসহ নানা পরিকল্পনা তুলে ধরেন ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার।
বলেন, ‘গত দেড় থেকে পৌনে দুই বছর ধরে আমি এখানে কর্মরত আছি। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ হয়েছে। এর আলোকে আমি দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।’
গত কয়েক মাস ধরে এখানে স্থায়ী পরিচালক ছিলেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনায় আমাদেরও একজন স্টেকহোল্ডার হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় ছিল।’
ডা. গোলাম সারওয়ার আরও বলেন, ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ একটি বড় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। হাসপাতালের কার্যক্রমের পরিধিও ব্যাপক। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। তাই এ দায়িত্ব নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব। তবে আমি আশাবাদী, ইনশাআল্লাহ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দায়িত্বটি সঠিকভাবে পালন করতে পারব।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপনার একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের কাছ থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হবে বলে মনে করেন? তিনি বলেন, ‘আমাদের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পরিচালক পদটি সাধারণত পরিচালক কাম অধ্যাপক হিসেবে দেওয়া হয়। আমাদের এখানে বিষয়টি সেভাবে নয়। তবে আমার বিভাগের সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, সেটি অবশ্যই থাকবে। যদিও আমার প্রশাসনিক দায়িত্ব এখন বেশি থাকবে, তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার যে একাডেমিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও চিকিৎসাসংক্রান্ত সম্পর্ক ছিল, সেটি একটি পর্যায়ে বজায় রাখার চেষ্টা করব। যেহেতু আমি নিজেও ক্লিনিক্যাল কাজে যুক্ত, তাই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যতটা সম্ভব সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা থাকবে।’
হোস্টেল-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আপনার কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। চাইলেও শিক্ষার্থী ও রোগীদের সুযোগ-সুবিধার জন্য অনেক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন পরিসর বেড়েছে। এই সুযোগটি কীভাবে কাজে লাগাবেন?
ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ারের জবাব, ‘কথাটি ঠিক। আমি ছোটখাটো অনেক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। একেবারে বেজলাইন পর্যায়ে এসব কাজ করতে গিয়ে অনেক বিষয় কাছ থেকে দেখেছি। তখন অনেক প্রশ্ন জাগত, অনেক অভিযোগও করতে ইচ্ছা করত, মনে হতো, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যদি কিছু বিষয় আরও গুরুত্ব দিয়ে করতেন, তাহলে অনেক কিছুই ভালোভাবে করা সম্ভব হতো। সেখান থেকে আমার নিজেরও কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। আশা করি, সেই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগুলো এখন কাজে লাগাতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও হোস্টেল কো-অর্ডিনেটর হিসেবে তাদের ভালো-মন্দ দেখভাল, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন ফ্যাসিলিটি উন্নয়ন, রিনোভেশন কিংবা নতুন কিছু করা যায় কি-না, এসব বিষয়ে আমি অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করতাম। তখন কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। চাইলেই সবকিছু করা সম্ভব হতো না। এখন যেহেতু দায়িত্ব ও কাজের পরিসর অনেক বেশি, তাই আগের অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগিয়ে আরও কার্যকরভাবে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
সোহরাওয়ার্দীর নতুন পরিচালক বলেন, এটি একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। নামের মধ্যেই এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল। মেডিকেল কলেজ মানে শিক্ষার্থী একটি প্রধান অগ্রাধিকার। শিক্ষার্থী না থাকলে মেডিকেল কলেজই হবে না। এরপর আসে হাসপাতালের বিষয়টি, অর্থাৎ রোগী। সুতরাং এখানে শিক্ষার্থী এবং রোগী দুজনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল প্রাণই হচ্ছে শিক্ষার্থী ও রোগী। তাদের প্রয়োজন ও সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়েই কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে আমাদের প্যাথোলজি ও অন্যান্য ল্যাবরেটরি সার্ভিসের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য আমি একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে কাজ করছিলাম। এ ক্ষেত্রে আমাদের বেশ কিছু সমস্যা ও ঘাটতি ছিল। বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আমরা দেখেছি, সেবার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি ঘাটতি ও ত্রুটি রয়েছে।’
‘পরবর্তীতে তৎকালীন পরিচালক আমাকে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দেন। এরপর আমি দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করি। মূল লক্ষ্য ছিল কীভাবে রোগীদের আরও ভালো ও কার্যকর সেবা দেওয়া যায়। গত কয়েক মাস ধরে এটি আমার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবেও ছিল। এরই মধ্যে আমরা অনেকটা গুছিয়ে আনতে পেরেছি এবং পদ্ধতিগত বিভিন্ন ধরনের অপচয় ও দুর্বলতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। তবে রোগীদের যে ভোগান্তি, সেটি পুরোপুরি কমানো এখনও সম্ভব হয়নি। আশা করছি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ ক্ষেত্রে আরও দৃশ্যমান উন্নতি করা সম্ভব হবে’—যোগ করেন তিনি।
ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রোগীকে একটি সেবার জন্য চারবার পর্যন্ত লাইনে দাঁড়াতে হয়। প্রতিটি লাইনে ৫০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় চলে যেতে পারে। একজন ডেঙ্গু রোগী জ্বর নিয়ে এসে যদি তিন-চার ঘণ্টা বিভিন্ন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, সেটি অত্যন্ত কষ্টকর। এই জায়গাটিতে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। রোগীদের এই ভোগান্তি কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবো। আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকবে রোগী যেন হাসপাতালে এসে দ্রুত প্রয়োজনীয় সেবা নিয়ে চলে যেতে পারেন। এটিই আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিশন বা ভিশন হবে।’
সেবাপ্রক্রিয়ার অনাকাঙিক্ষত জটিলতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, টাকা জমা দেওয়ার জন্য এক জায়গায় লাইনে দাঁড়াতে হয়, এরপর বারকোড নেওয়ার জন্য আরেক জায়গায় অপেক্ষা করতে হয়, তারপর রক্ত দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়। এরপর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার ক্ষেত্রেও অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়। প্রতিটি ধাপে যদি ৩০ মিনিট বা এক ঘণ্টা করে সময় চলে যায়, পুরো প্রক্রিয়াটিই একজন রোগীর জন্য অত্যন্ত ভোগান্তির হয়ে ওঠে।
সোহরাওয়ার্দীর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। চাহিদার তুলনায় রোগীর সংখ্যা এবং সেবার ওপর চাপও অনেক বেশি। তারপরও আমার মনে হয়, শুধু নিয়মিত কাজগুলো আরও ভালোভাবে, শৃঙ্খলার সঙ্গে এবং সমন্বিতভাবে পালন করতে পারলেই রোগীদের ভোগান্তি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এজন্য সব সময় বড় কোনো উদ্ভাবনী উদ্যোগের প্রয়োজন নেই।’
এমইউ/