পরিবার পরিকল্পনায় বছরব্যাপী প্রচার কার্যক্রম শুরু ১ ডিসেম্বর, ২৭ লাখ মানুষকে সম্পৃক্তের লক্ষ্য
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জোরদার, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বছরব্যাপী জাতীয় জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ১ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এ কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১ ডিসেম্বর এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।
‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ স্লোগানকে সামনে রেখে নেওয়া এ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রজনন হার বৃদ্ধি এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার কমে যাওয়ায় নতুন করে এ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট প্রজনন হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪-এ। অন্যদিকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিয়ে বছরব্যাপী বড় ধরনের জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন শুরু হবে। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। জারি গান, সারি গান, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রচার চালানো হবে।
তিনি বলেন, উদ্যোগটি শুধু প্রচার-প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।
কর্মসূচির আওতায় ২২ দফা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মহিলা সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রচার, হাট-বাজারে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ততা এবং ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে যুক্ত করা।
এ ছাড়া ‘মা ও গর্ভবতী সুরক্ষা সমাবেশ’, বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, ২৩ হাজার ৫০০ ইউনিটে ‘ওয়েলবিং ক্লাব’ গঠন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘পরিবার সংলাপ’, কৈশোর ও যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, নবদম্পতিদের কাউন্সেলিং এবং পরিবার পরিকল্পনায় পুরুষদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।
পাশাপাশি বিনা মূল্যে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর প্রচার, পল্লিচিকিৎসক ও ধাত্রীদের রেফারেল অংশীদার করা এবং এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচিতে তরুণ-কিশোর-কিশোরী, নবদম্পতি, পুরুষ, গর্ভবতী ও প্রসূতি মা, বস্তিবাসী, ভাসমান এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। হাট ক্যাম্পেইন, র্যালি ও সমন্বয় সভা ছাড়া এক বছরে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে মহিলা সংসদ সদস্যদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে ৬৪ জেলা ও ৫০৩ উপজেলায় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে। ডিসেম্বর মাসে ইউনিয়ন পর্যায়ে হাট ক্যাম্পেইন এবং উপজেলা পর্যায়ে আন্তমন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।
তবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা কনডম, খাবার বড়ি, আইইউডি, ইনজেকশন ও ইমপ্ল্যান্টসহ প্রায় ২৮ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনা মূল্যে সরবরাহ করেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় ধরে এসব সামগ্রী কেনা বন্ধ থাকায় দেশের অনেক উপজেলা ও মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত নেই।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালের (এসসিএমপি) মনিটরিং ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ১৯৮টি উপজেলায় কনডমের মজুত সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ৩৫৪টি উপজেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং ৪২৮টি উপজেলায় আইইউডির মজুত নেই।
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের অপারেশনাল প্ল্যানের অসমাপ্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় গর্ভনিরোধক সামগ্রী কেনার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ এসব সামগ্রী সংগ্রহ করে মাঠপর্যায়ে বিতরণ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী আবার পাওয়া যাচ্ছে—এ তথ্য জনগণকে জানানো জরুরি। কোথায় এবং কীভাবে এসব সামগ্রী পাওয়া যাবে, তা জানাতেই জাতীয় পর্যায়ে প্রচার কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ কমানো এবং সন্তান জন্মদানের মধ্যে যথাযথ বিরতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, পরিবারগুলোকে এসব বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ জনবল সংকট। মহাপরিচালক জানান, মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়া পরিবার কল্যাণ সহকারীর (এফডব্লিউএ) উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে অধিদপ্তরে প্রায় ৩৭ শতাংশ জনবল সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার কর্মী কম রয়েছে। তবে জনবল সংকটের মধ্যেও বিদ্যমান কর্মীদের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ, মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং সেবাপ্রাপ্তি সহজ করা গেলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম আরও গতিশীল করা সম্ভব হবে।
সূত্র: বাসস
এমআর/