হাসান মাহমুদ শুভ
মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও ফিচার লেখক
ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর, ঢাকা
২৯ অগাস্ট, ২০২৬ ১২:১২ পিএম
হাম নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সময়মতো চিকিৎসা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও তীব্র ভাইরাসঘটিত একটি রোগ। সাধারণত শিশুরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হলেও যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে। হাম নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে এই রোগ থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
হামের পরিচিতি ও শরীরে বিস্তারের ধরন
হাম মূলত একটি বিশেষ ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে। শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশের পর হামের জীবাণু প্রথমে ওপরের শ্বাসনালিতে বংশবিস্তার করে। এরপর এটি পাশের লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানকার কোষ ধ্বংস করে। এর ফলে রোগীর শরীরে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার মতো অবস্থা দেখা দিতে পারে।
পরবর্তী সময়ে ভাইরাস রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে। রক্তের মাধ্যমে ভাইরাস দেহের রোগ প্রতিরোধক কোষের নেটওয়ার্ক এবং শ্বাসতন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রে ছড়িয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে ভাইরাসের বিস্তার আরও ব্যাপকভাবে ঘটে, যা ত্বক, বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, কিডনি ও মূত্রথলিকে আক্রান্ত করতে পারে।
হামের বৈশিষ্ট্য
হামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গালের ভেতরে সাদাটে দাগ (কপলিক স্পট) এবং ত্বকের র্যাশ বা ফুসকুড়ি। এগুলো মূলত ভাইরাসের প্রতি দেহের একধরনের অতি-সংবেদনশীল বা অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার কারণে তৈরি হয়। সাধারণত হাম নির্দিষ্ট সময় পর নিজে থেকেই সেরে যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসে আক্রান্ত কোষগুলোকে ধ্বংস ও অপসারণ করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনে। রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পর সাধারণত এই রোগের বিরুদ্ধে আজীবন রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে।
সংক্রমণ ও ছোঁয়াচে প্রবণতা
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। বাতাসের মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই জীবাণু অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই একই বাড়িতে থাকা অন্যদের মাঝে খুব সহজেই হামের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে বাড়ির অন্য সদস্যরা হামে আক্রান্ত হবেন কি না, তা মূলত তাঁদের নিজ নিজ রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
বিভিন্ন পর্যায় ও লক্ষণসমূহ
হামের লক্ষণগুলো সাধারণত কয়েকটি পর্যায়ে প্রকাশ পায়–
প্রাথমিক লক্ষণ বা শুরুর পর্যায় (৩–৪ দিন): এই পর্যায়ে সাধারণত জ্বর, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। পাশাপাশি ওপরের মাড়ির দাঁতের পাশে গালের ভেতরের দিকের আবরণে ছোট ছোট সাদা দানার মতো দাগ (কপলিক স্পট) দেখা যায়, যা হাম রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
ফুসকুড়ি বা র্যাশ ওঠার পর্যায় (৬–৭ দিন): এ পর্যায়ে ত্বকে হামের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়। সাধারণত জ্বরের চতুর্থ দিনে, যখন জ্বর সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে, তখন নিয়মিত ধারায় র্যাশ বের হতে শুরু করে। র্যাশ প্রথমে কানের পেছনে দেখা দেয় এবং পরবর্তী ৩–৪ দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অংশ ও হাত-পায়ের আঙুল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
আরোগ্য বা সেরে ওঠার পর্যায়: এ পর্যায়ে রোগের উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। র্যাশ যে ক্রমে ছড়িয়ে পড়েছিল, ঠিক একইভাবে তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। র্যাশ সেরে যাওয়ার পর ত্বকে সূক্ষ্ম বাদামি বর্ণের খসখসে আবরণ তৈরি হওয়া বা চামড়া ওঠার প্রবণতা থাকতে পারে। তবে কাশি প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
হামের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জটিলতাসমূহ
হামের কারণে রোগীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। ফলে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ (মেনিনজাইটিস), রক্তে জীবাণুর মারাত্মক সংক্রমণ (সেপটিসেমিয়া), মারাত্মক ডায়রিয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া এবং কানের সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই জটিলতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সঠিক চিকিৎসার অভাবে হাম-পরবর্তী জটিলতায় বহু শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।
সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ
হাম নিরাময়ের নির্দিষ্ট বা জাদুকরী কোনো ওষুধ নেই। চিকিৎসক সাধারণত রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন, যাতে কষ্ট উপশম হয়। তাই হামের লক্ষণ প্রকাশ পেলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।
জেএইচ/