শিয়ালের মাংসে রোগমুক্তি, মিথ বনাম বাস্তবতা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিয়ালের মাংস খাওয়ার প্রচুর সংবাদ পাওয়া যায়। অনেকে মনে করে এটি বাত ব্যথার জন্য উপকারী। আবার কেউ কেউ মনে করে শক্তিবর্ধক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিয়ালের মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এতে বিভিন্ন জুনোটিক পরজীবী ও জীবাণু থাকে। এছাড়া বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী শিয়াল শিকার, হত্যা, ক্রয়-বিক্রয় ও অবৈধভাবে সংরক্ষণ দণ্ডনীয় অপরাধ।
অন্যদিকে শিয়ালের মাংস খাওয়া ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতেও হারাম। কারণ এটি দাঁত ও নখর দিয়ে শিকার করা হিংস্র প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের প্রাণীর মাংস খেতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রচারিত সংবাদ অনুযায়ী, বরিশালের একটি এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি সাতটি শিয়াল ধরে সেগুলো জবাই করে রুটি দিয়ে খেয়েছেন।
এছাড়া চলতি মাসের ২৬ তারিখে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলায় প্রকাশ্যে শিয়াল হত্যার পর মাংস বিক্রি করছিলেন মো. ইব্রাহিম (৪৫) নামের এক ব্যক্তি। শিয়াল প্রমাণের জন্য পাশে প্রাণীটির কাটা মাথাও রেখেছিলেন তিনি। বিষয়টি দেখে স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ করেন। পরে তাঁকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজনের মাঝে শিয়ালের মাংস নিয়ে বহু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, অনেকে মনে করে এটি বাত ব্যথার জন্য উপকারী। আবার কেউ কেউ মনে করে শক্তিবর্ধক। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে এই মাংস খাওয়ার কোনো উপকারিতা নেই বরং ক্ষতিকর।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির মেডিভয়েসকে বলেন, শিয়াল বা গোল্ডেন জ্যাকেলের মাংসে ট্রিকিনেলা নামক ক্ষুদ্র পরজীবী কৃমি থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই এই মাংস খাওয়ার কোনো উপকারিতা নেই, বরং মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
তিনি আরও বলেন, শিয়ালের রক্ত বা লালার সংস্পর্শে আসলে রেবিজ (জলাতঙ্ক) জাতীয় রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য এটি খাওয়া পরিহার করা উচিত।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী শিয়াল হত্যা করা একটি গুরুতর অপরাধ। এই আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণী শিকার করলে সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড অথবা ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। একই অপরাধ পুনরায় করলে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এ বিষয়ে বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক ড. জগলুল হোসেন মেডিভয়েসের সাথে আলাপকালে বলেন, ‘শিয়াল হত্যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের পরিপন্থী এবং এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন অমান্য করে কেউ শিয়াল হত্যা করলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করবে।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে শিয়ালের মাংস খাওয়া হারাম উল্লেখ করে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতী আবু মুহাম্মদ রহমানী বলেন, শিয়ালের মাংস খাওয়া হারাম কারণ এটি দাঁত ও নখ দিয়ে শিকার করে। তাই যারা শিয়াল হত্যা করে মাংস কেনা বেচা ও ভক্ষণ করছেন তারা হারাম কাজের সাথে জড়িত হচ্ছেন। এ কাজ থেকে তাদের ফিরে আসা উচিত।
বাত সারাতে কবিরাজি চিকিৎসা উপমহাদেশের অনেক দেশেই প্রচলিত আছে। তবে এর কার্যকারিতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যেমন ভারতের ওডিশায় শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খেলে বাতব্যথা কমে কি না, তা নিয়ে একটি গবেষণা হয়েছিল। ২০২০ সালে প্রকাশিত গবেষণাটির শিরোনাম ‘ইউজ অব অ্যানিমেল অ্যান্ড অ্যানিমেল প্রোডাক্টস ফর রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ট্রিটমেন্ট: অ্যান এক্সপ্লোরেটিভ স্টাডি ইন ওডিশা, ইন্ডিয়া’।
১১৩ জন রোগীর ওপর করা ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খেলে বাতব্যথা কমে, এমন প্রমাণ তারা পায়নি।
এইউ/