১৯ অগাস্ট, ২০২৬ ০৮:১৭ পিএম

চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা ও স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার সংকট পরস্পর সম্পর্কিত: ড্যাব

চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা ও স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার সংকট পরস্পর সম্পর্কিত: ড্যাব
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: রোগীর মৃত্যু বা চিকিৎসাসেবা নিয়ে অসন্তোষকে কেন্দ্র করে একের পর এক হামলার ঘটনায় চিকিৎসকদের নিরাপত্তা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তেমনি ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবাও। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখার দাবি জানিয়েছে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)।

গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তারা জানায়, ৬০০ জন চিকিৎসকের মধ্যে ৫৫ ভাগ কর্মজীবনে কোনো কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৭.১ ভাগ শারীরিক এবং ৮২.৯ ভাগ মৌখিক নির্যাতনের।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় আলাদা আইন প্রণয়নের দাবি জানান। তাঁদের মতে, চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকদের উপর হামলার প্রতিবাদে আজ বুধবার (১৯ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের আকরাম খা হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা তুলে ধরে ড্যাব।

স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন ও নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে, যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা মনে করি, ৫ আগস্টের পর গণতান্ত্রিক সরকার যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এ ধরনের অত্যাচার ও নির্যাতন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পরমুখাপেক্ষী করার একটি ষড়যন্ত্র চলছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার চিকিৎসা বাবদ বিদেশে চলে যায়। এই ব্যয় কমাতে চিকিৎসক সমাজসহ স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমার পর্যায়ে ছিল। কিন্তু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন কমে যাবে। এর ফলে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা আবারও বাড়তে পারে।

এই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে রুখে না দাঁড়ালে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও সংকটের দিকে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ড্যাব সভাপতি।

অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে ড্যাব মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, বাংলাদেশের মানুষ যখন বিগত স্বৈরাচার সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হটিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের কাঙ্খিত স্থিতিশীল বাংলাদেশ পেয়েছে, ঠিক তখনই আমরা চিকিৎসক সমাজ এক ক্রান্তিলগ্ন পার করছি। আপনারা অবগত আছেন যে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকদের উপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, একটি কুচক্রি মহল বারবার চিকিৎসকদের উপর হামলা চালাচ্ছে। গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর শান্তিনগরস্থ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে একদল বহিরাগত সন্ত্রাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় এবং তাকে মারাত্মকভাবে আহত করে।

‘এর আগে দুই দিন আগে গত ১৫ আগস্ট দিবাগত রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মো. মোশাররফ হোসেনের ওপর হামলা চালায়। এ সময় অনারারি মেডিকেল অফিসার (এইচএমও) ডা. মো. মোশাররফ হোসেন ও একজন ওয়ার্ড বয়কে টেনে-হিঁচড়ে মেঝেতে ফেলে মারধরের ঘটনা ঘটে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংঘটিত এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা চিকিৎসক সমাজকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।’

তিনি বলেন, তার এক মাসে আগে গত ১২ জুলাই সকালে নাটোর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ক্লিনিক্যাল কন্ট্রাসেপশন) ডা. শাহাবুজ্জামান রুবেল এবং নাটোর সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (এমসিএইচ-এফপি) ডা. মৌসুমি কামালের উপর ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে। অথচ নাটোর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ভর্তি রুমি বেগমের প্রসব ব্যথা শুরু হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ রোগীর স্বজনদের গর্ভস্থ শিশুর অপরিপক্কতা এবং শিশুর হার্টবিট পাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে অবহিত করেন। রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নাটোর সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হলেও রোগীর স্বজনরা সে পরামর্শ গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে জরুরি ভিত্তিতে স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন করা হলে মৃত শিশুর জন্ম হয়। এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর ঘটনার পর চিকিৎসকদের ওপর সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়।

এ ছাড়াও গত ১৫ জুন কুমিল্লার সৌহার্দ্য (মেডিকমপ্লেক্স) হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. জুবায়েরের ওপর বর্বর ও ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে। গত ১২ জুন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজনদের কর্তৃক কার্ডিওলজি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. রাকিবুল হাসান, ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. রিফাত ও ডা. নাইমের ওপর সংঘটিত বর্বর হামলার ঘটনা ঘটে।

গত ১৮ মে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. রায়হান রাব্বানীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। গত ১৫ মে তারিখে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে হার্ট অ্যাটাকে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ডা. নাসিরের উপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় ডা. নাসির গুরুতরভাবে আহত হন। গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর বাবা এম.এ. তাহের এবং মামা হেলাল উদ্দিনসহ ‘কিছু সন্ত্রাসী’ কর্তৃক কর্তব্যরত সন্তানসম্ভবা চিকিৎসক ডা. দীপাঞ্জনা দাশ এবং ডা. সাবা দেবীর উপর রড দিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়।

গত ২০ একদল দুর্বৃত্ত রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. আহমেদ হোসেনকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। 

এদিকে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার থাকা অবস্থায় জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কর্মচারী জামালকে একদল দুষ্কৃতকারী গুলি করে হত্যা করে এবং বক্ষব্যাধি হাসপাতালের এক কর্মকর্তাকে কুপিয়ে জখম করে।

এ ছাড়াও গত ১২ এপ্রিল দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর রোগীর স্বজনরা বর্বর হামলা চালায়। রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনরা 'ভুল চিকিৎসার' অভিযোগ তুলে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর শারীরিক হামলা, অশালীন আচরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রমে বাধা প্রদান করেন। এমনকি একপর্যায়ে চিকিৎসকদের জিম্মি করে রাখার ঘটনাও ঘটে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ব্যাপার।

গত ৮ এপ্রিল বুধবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষার্থী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের উপর হামলা এবং হাসপাতালের সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করে। তথ্যমতে ওষুধ পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের প্রথমে কথা কাটাকাটি হয়, যা পরবর্তীতে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় কয়েকজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী আহত হয়েছেন এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। 

এ ছাড়াও ঢাকা মেডিকেলসহ অন্যান্য হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও অন্তঃবিভাগে প্রতিনিয়তই চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের উপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনার নজির রয়েছে। সেই কারণে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন।

গত ২১ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে সময় চাঁদপুর জেলার মতলবের গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় ফেরার পথে চাঁদপুর মতলবের কালিপুর বাজার এলাকায় একদল দুষ্কৃতিকারী ডা. মো. বশির আহমেদ হৃদয়ের উপর বর্বর সন্ত্রাসী হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা বাটখারা দিয়ে আঘাত করে তার মাথায় গুরুতর জখম করে। 

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক রাত ৯.৩০ ঘটিকার সময় মেহেরপুর ক্লিনিকে একজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মুশফিকুর রহমান অভি, ডা. মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর রোগীর স্বজন ও বহিরাগত কিছু ব্যক্তি পরিকল্পিত ও অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে এবং হাসপাতালের মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে; যা অত্যন্ত নিন্দনীয়, উদ্বেগজনক ঘটনা।

গত ১৭ জানুয়ারি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাইনি ও অবস্ বিভাগে রোগীর পরিবারের সদস্য ও বহিরাগত একদল উচ্ছৃঙ্খল দুষ্কৃতিকারী উক্ত বিভাগে কর্মরত নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ অন্যান্য চিকিৎসক ও উপস্থিত কর্মচারীদের উপর অতর্কিতে হামলা চালায় ও হাসপাতালের সরকারী সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করে। গত ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, পরিচালক এবং অফিসের কর্মচারীবৃন্দের উপর অকস্মাৎ কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল অবসরপ্রাপ্ত এবং বহিরাগত এর সমন্বয়ে একদল সন্ত্রাসী জীবননাশক হামলা চালিয়েছে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে।

সহিংসতার শিকার ৫৫ ভাগ চিকিৎসক

এই ঘটনাগুলো শুধু বড় হাসপাতালের ঘটনা। এ ছাড়াও প্রতিদিন জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ব্যক্তিগত চেম্বারে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা সংবাদপত্র বা জনচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। ২০২৫ সালের বাংলাদেশব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৬০০ জন চিকিৎসকের মধ্যে ৫৫% কর্মজীবনে কোনো কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ১৭.১% ঘটনা ছিল শারীরিক হামলা এবং ৮২.৯% মৌখিক নির্যাতন। আরেকটি গবেষণায় ৪০৬ জন চিকিৎসকের মধ্যে ১২.৩% গত ১২ মাসে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় ৪৪১ জন চিকিৎসকের ৬৭.৩% কোনো না কোনো ‘ওয়ার্কপ্লেস ভায়োলেন্স’র বাজে অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ১৩.৫% শারীরিক সহিংসতার কথা বলেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হাসপাতাল একটি পবিত্র, জনসেবামূলক ও মানবিক স্থান যেখানে প্রতিমুহূর্তে জীবন রক্ষার লড়াই চলে। চিকিৎসক সমাজ এই মহান জনসেবায় নিয়োজিত থেকে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। দিনরাত নির্ঘুম পরিশ্রম করে, নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক সময় বিসর্জন দিয়ে পবিত্র ঈদসহ বিভিন্ন জাতীয় ছুটিতেও তাঁরা মানুষের জীবন বাঁচানোর ব্রত পালন করেন। অথচ মানবসেবায় নিয়োজিত এই চিকিৎসকদের এবং স্বাস্থ্য কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্বর ও কাপুরুষোচিত হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি সমাজের মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ প্রতিফলন।

দেশের তরে চিকিৎসকদের অবদান

গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় যে দুর্যোগসহ যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে চিকিৎসকদের অবদানের কথা জানিয়ে ড্যাব নেতৃবৃন্দ বলেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীবৃন্দ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ক্লান্তিহীনভাবে, কোনো প্রকার প্রতিদান আশা না করেই রোগীর সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের একটি নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বারবার এমন হামলার ঘটনা এই নির্মম বাস্তবতাই প্রমাণ করে যে, আজ চিকিৎসকদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন। রোগীর মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা; তবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে চিকিৎসকের ওপর হামলা চালানো কোনো সভ্য ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজে কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এদেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে এদেশের চিকিৎসক সমাজ সর্বাগ্রে সাড়া দিয়েছে এবং জাতির প্রয়োজনে নিজেদের নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দিয়েছে। ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে এবং ফিল্ড হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিয়ে চিকিৎসক সমাজ যে অতুলনীয় ভূমিকা রেখেছেন, তা জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ রাখবে। ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনে রাজপথে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়ে ও আহতদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে চিকিৎসকগণ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অংশীদার হয়েছিলেন। ৯০'র স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ ডা. শামসুল আলম খানের আত্মত্যাগ জাতিকে স্বৈরাচারের শৃঙ্খল হতে মুক্ত করতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এদেশের চিকিৎসকগণ যে অসামান্য ও সাহসী অবদান রেখেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দুইজন চিকিৎসক শাহাদাত বরণ করেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে অনেক চিকিৎসকও নিজেরা ফ্যাসিস্ট হাসিনার রোষানলে পড়েছেন; ফ্যাসিস্টদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন; শান্তিমূলক বদলি ও পদোন্নতি বঞ্চনার শিকার হয়েছেন; তবুও তাঁরা তাঁদের মানবিক দায়িত্ব থেকে এক মুহূর্তের জন্যও পিছপা হননি।

শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে নয়; বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারিতেও এদেশের চিকিৎসকগণ সর্বদা মানুষের পাশে থেকে মানবতার এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন
করে এসেছেন। করোনাকালীন সময়ে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে ১৮০ জনেরও অধিক চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেছেন। তবুও, এদেশের চিকিৎসকগণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে দুর্গম চরাঞ্চল পর্যন্ত, দিনরাত এক করে তাঁরা মানুষের জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে নিয়োজিত থেকেছেন। এই ইতিহাস, ত্যাগ ও আত্মত্যাগের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।

চিকিৎসকের ওপর হামলা দেশবিরোধী চক্রান্তের অংশ 

অনুষ্ঠানে ড্যাব মহাসচিব বলেন, যতগুলো ঘটনাবলীর কথা বলা হয়েছে সেগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের কাউকেই চিহ্নিত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা যায়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা তৈরি হলে স্বাস্থ্যসেবার জন্য মানুষের বিদেশমুখিতা বৃদ্ধি পায় এবং এই সময়ে এ সমস্ত ঘটনাবলীকে আমরা দেশবিরোধী গভীর চক্রান্তের অংশ বলে মনে করি।

‘উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ড্যাব সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহে যেকোন ধরনের হামলায় জড়িতদের অতি দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড ঘটাতে সাহস না পায়। একই সাথে, হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন এবং জরুরি বিভাগে পুলিশি টহল জোরদার করতে হবে।

চিকিৎসা সুরক্ষা আইন সময়ের দাবি

একইসাথে, চিকিৎসায় অবহেলাজনিত অভিযোগের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, চীন ও ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশে চিকিৎসক সুরক্ষা আইন বলবৎ আছে। বাংলাদেশেও চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসা সুরক্ষা আইন এখন সময়ের দাবি। কোনো রোগীর মৃত্যু বা জটিলতা নিয়ে অভিযোগ থাকলে তা সহিংসতার মাধ্যমে নয়, বরং যথাযথ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে। সর্বোপরি, হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের প্রতি সহিংসতা রোধে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যাতে চিকিৎসকদের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়।

ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ড্যাব মনে করে ও বিশ্বাস করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নিরাপদ পরিবেশ দেশের জনগণের আস্থাশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ার পূর্বশর্ত। তাই আমাদের সকলের নাগরিক দায়িত্ব স্বাস্থ্য খাতের অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির যেকোন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং জনগণের আস্থাশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের দল মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা তাদের সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দিয়ে জনগণের আস্থাশীল স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করবে।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।