বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের তথ্য
দেশের ৫৭% স্বাস্থ্যপেশাজীবী অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিশুকে গুঁড়াদুধের পরামর্শ দেন
মেডিভয়েস রিপোর্ট: শিশুর জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধই যথেষ্ট উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের ৫৭ ভাগ স্বাস্থ্যপেশাজীবী আইন লঙ্ঘন করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিশুকে গুঁড়োদুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে মাতৃদুগ্ধ পানবান্ধব পরিবেশ, ছয় মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং মাতৃদুগ্ধ বিকল্প (বিএমএস) আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর জোর দেন তারা।
আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকাল ১১টায় দুপুর রাজধানীর মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কনফারেন্স হলে আয়োজিত কনফারেন্সে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে এই সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ।
বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এস কে রায়ের সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে মাতৃদুগ্ধপানের গুরুত্ব নিয়ে স্বাগত বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ডা. সারিয়া তাসনিম।
বক্তব্যে তিনি বলেন, মায়ের দুধ শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি শুধু শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টিই নিশ্চিত করে না, মায়ের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতেও এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। শিশুরা যখন পর্যাপ্ত পুষ্টি পেয়ে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে এবং রোগবালাই থেকে সুরক্ষিত থাকে, তখন পুরো পরিবারের ওপরও আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।
তিনি বলেন, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি, পানি ও শক্তি মায়ের দুধ থেকেই পাওয়া যায়। এ সময় অতিরিক্ত কোনো খাবার বা পানির প্রয়োজন হয় না। ছয় থেকে ১২ মাস বয়সে শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির অর্ধেকের বেশি মায়ের দুধ থেকে আসে। তাই এ সময় মায়ের দুধের পাশাপাশি বয়স উপযোগী সম্পূরক খাবার দিতে হবে। আর ১২ থেকে ২৪ মাস বয়সে শিশুর মোট শক্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মায়ের দুধ থেকে পাওয়া উচিত। অর্থাৎ বয়সভেদে শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মান ও পরিমাণে পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি।
মায়ের দুধ শুধু খাদ্য নয়, এটি একটি জীবন্ত জৈবিক ব্যবস্থা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এতে রয়েছে নানা ধরনের উপকারী উপাদান ও অণুজীব, যা শিশুর হজমক্ষমতা উন্নত করে, অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলে। ফলে শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিপক্বতা, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা এবং সুস্থ বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়।
অধ্যাপক ডা. সারিয়া তাসনিম বলেন, মায়ের বুকের দুধকে ‘শিশুর প্রথম টিকা’ বলা হয়। কারণ এটি সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করে। বর্তমানে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা ও স্থূলতার মতো অসংক্রামক রোগ বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু একচেটিয়াভাবে মায়ের দুধ পান করে, তাদের ক্ষেত্রে ইসকেমিক হৃদ্রোগে মৃত্যুঝুঁকি ৪৩ শতাংশ, স্ট্রোকে ৩৩ শতাংশ এবং ক্যান্সারজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
তিনি জানান, জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানো হলে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৩১ শতাংশ কমে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য নবজাতকের মৃত্যুহার কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগগুলোর একটি হলো জন্মের পরপরই বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করা।
প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এস কে রায়। তিনি বলেন, বিটিআই ইনডিকেটরের রিপোর্ট দ্বারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯১টি দেশে শিশুকে মাতৃদুগ্ধদান, ঘরে তৈরি বাণিজ্য বাজার সংক্রান্ত কার্যক্রমসমূহের পলিসি, আর্থিক বরাদ্দ ও অগ্রগতি ঘাটতি পর্যালোচনা করা হয়।
তিনি বলেন, একটি শিশু জন্মের পর পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ—সব জায়গা থেকেই মাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সহায়তা কার্যক্রমগুলোকে আরও শক্তিশালী, সক্রিয় ও কার্যকর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কর্মজীবী মায়েদের জন্য ছয় মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে এক সময় সরকারপ্রধানের কাছে চার মাসের পরিবর্তে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবি জানানো হয়েছিল। পরে সরকারি চাকরিজীবী নারীদের জন্য ছয় মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি অনুমোদন করে সরকার। এখন প্রয়োজন এই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতেও একই সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য এফবিসিসিআইসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আইসিডিডিআর,বি, ব্র্যাকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কর্মজীবী মায়েদের জন্য ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করেছে, যা ইতিবাচক উদাহরণ।
মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে মাতৃদুগ্ধ পানবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন অধ্যাপক ডা. এস কে রায়। বলেন, এজন্য শিশুকে দুধ খাওয়ানোর জন্য নির্ধারিত কক্ষ, বিশ্রামের স্থান এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর্মজীবী মায়েরা নির্বিঘ্নে শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করাতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কোনো মা যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য মন্ত্রণালয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি। মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্ব নয়; এটি সব খাতের যৌথ দায়িত্ব।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে নীতি ও মাঠপর্যায়ের যৌথ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের পরিচালক খুরশিদ জাহান।
মাতৃদুগ্ধ বিকল্প আইন ও স্বাস্থ্যপেশাজীবীদের করণীয় বিষয়ক আলোচনায় বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সুফিয়া খাতুন মাতৃদুগ্ধ বিকল্প (বিএমএস) আইন লঙ্ঘনের বিস্তারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক কৌটা দুধসহ অন্যান্য সামগ্রী বিক্রিতে পরামর্শ দিতে পারেন না।
এ সময় চলতি বছরের এক গবেষণার বরাত দিয়ে বিবিএফ’র ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, হাসপাতাল, দোকান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য প্রদর্শন, পরোক্ষ প্রচার, অনিবন্ধিত পণ্য বিক্রি এবং স্বাস্থ্যপেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের ২০২২ সালে প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের ৫৭% স্বাস্থ্যপেশাজীবী আইন লঙ্ঘন করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিশুকে গুঁড়াদুধ খাওয়ানোর জন্য মায়েদের পরামর্শ দেন।
অনিবন্ধিত ও অনিরাপদ পণ্যের ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনিবন্ধিত পণ্য, দূষিত পানি, ভুল মাত্রায় প্রস্তুতকরণ এবং অপরিষ্কার বোতল ব্যবহারে জীবাণু সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার আশঙ্কা বাড়ে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা পেশাগত জীবনে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. খন্দকার মো. রেজাউল হক।
অনুষ্ঠানে বিবিএফের বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—জাতীয় উপদেষ্টা কমিটিতে বিবিএফকে স্থায়ী কাখার সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা; পণ্য নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বিবিএফকে স্বাধীন কারিগরি প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত করা; মনিটরিং, প্রশিক্ষণ, আইন লঙ্ঘন প্রতিবেদন ও জনসচেতনতায় বিবিএফের ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা এবং সকল কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধ নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক ডা. রওশন জাহান আখতার আলো, গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন নেছা, নিপসম পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানা, বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর মহাপরিচালক দিল আফরোজা, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান ড. সামিনা আহমেদ, বিএমআরসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার।
এমইউ/