‘অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি সব স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশ প্রয়োজন’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিসহ সব স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতির সমন্বিত বিকাশ প্রয়োজন বলে মনে করেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, এমপি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে একক কোনো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে দক্ষ জনবল ও বহুমাত্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সমন্বয়ে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে কোনো মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) রাজধানীর ফার্মগেটে খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ইউনানী আয়ুর্বেদিক গ্রাজুয়েট ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আগড্যাব) আয়োজিত সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গঠনে আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভূমিকা শীর্ষক চিকিৎসক সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি।
অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এমপি বলেন, চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রধানত চার ধরনের পদ্ধতি রয়েছে, যথা—অ্যালোপ্যাথি, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক এবং হোমিওপ্যাথি। এর মধ্যে আমাদের প্রচলিত ও প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি হলো অ্যালোপ্যাথি। বাকি তিনটি পদ্ধতিকে বলা হয় ঐতিহ্যগত (ট্র্যাডিশনাল) চিকিৎসা ব্যবস্থা। এর মধ্যে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক পদ্ধতি দুটি সম্পূর্ণভাবে এই উপমহাদেশের নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতি। আর হোমিওপ্যাথির উৎপত্তি মূলত জার্মানি থেকে।
তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের আর্থিক সক্ষমতা ও জনবলের বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্বভাবতই সব স্তরে সবার জন্য সব ধরনের চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রচলিত প্রতিটি চিকিৎসা পদ্ধতিরই (অ্যালোপ্যাথি, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথি) যার যার অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সে সময়েই দূরদর্শিতার সাথে এই বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, দেশের এই বিশাল জনসংখ্যাকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে হলে কেবল একটি পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে সকল সিস্টেম অব মেডিসিনকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, অলটারনেটিভ বা ট্র্যাডিশনাল চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসারে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ অবদান রয়েছে। মিরপুরে লাল রঙের যে সুন্দর সরকারি গ্র্যাজুয়েট কলেজ ভবনটি আপনারা দেখছেন, সেটি প্রতিষ্ঠার সাথে বেগম খালেদা জিয়া সরাসরি সম্পৃক্ত। শুধু মিরপুরে নয়, বর্তমানে সিলেটেও এই চিকিৎসার একটি গ্র্যাজুয়েট কলেজ ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে। কাজেই সামগ্রিকভাবে বলা যায়, আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া একে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এর ব্যাপকতা ও বিস্তার লাভে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন।
ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের বেহাল অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখানে যে ভেষজ বাগানটি দেখানো হলো, সেটির অস্তিত্ব এখন আর অনেক ক্ষেত্রেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি সেখানকার কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আদৌ আছেন কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অলটারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার ইউনিটের স্টাফরা দীর্ঘ ২৫ মাস ধরে কোনো বেতন পাচ্ছেন না; অথচ তাদেরও তো জীবন-জীবিকা আছে। মূলত বিগত সরকারের সময়ে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, জনগণের ভোটের প্রতি তাদের কোনো তোয়াক্কা ছিল না। রাতে ভোট করে ফেলা, ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে না দেওয়া কিংবা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়াই ছিল তাদের রাজনীতি। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় জনগণের প্রতি বা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। আর দায়বদ্ধতা না থাকলে মানুষের কল্যাণে বা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করা সম্ভব হয় না। আমি এখন তাড়াহুড়োর মধ্যে আছি, দ্রুত সংসদে যেতে হবে। কারণ আমরা বিরোধী দলের সামনের সারির সদস্যরা ঠিক সময়ে আসনে উপস্থিত আছি কি-না, তা সবাই খেয়াল রাখেন। জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে বলেই আমরা নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলি, আর এখানেই আগের শাসকদলের সাথে আমাদের মূল পার্থক্য।’
তিনি বলেন, আজ প্রশ্ন উঠেছে, ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা কেন দীর্ঘ ২৫ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না? এগুলোকে কীভাবে একটি নিয়মের মধ্যে এনে সমন্বয় করা যায়, তা ভাবা জরুরি। এই দেশ সবার। বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ও ব্যাচেলর মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় লক্ষাধিক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক রয়েছেন। আপনারা তথ্য নিলেই এর সত্যতা পাবেন। এর পাশাপাশি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও এই খাতে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের দেশে কবিরাজ নামে একটি শ্রেণী রয়েছে, যাদের হয়তো পুঁথিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা নেই, কিন্তু দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। যদিও তাদের চিকিৎসা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে, আমি সেই বিতর্কে যেতে চাই না। মূল কথা হলো, দেশের স্বাস্থ্যসেবার স্বার্থে এই বিপুল সংখ্যক জনশক্তিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন ও সমন্বয় করা প্রয়োজন।
স্বীকৃত সকল চিকিৎসা পদ্ধতির বিকশিত হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত যে সমস্ত চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলোকে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে দেওয়া উচিত। কারণ, স্বাস্থ্য খাত কখনো এককভাবে চলতে পারে না। সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সব ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতির যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন বিভিন্ন ক্যাটাগরির দক্ষ জনবল। শুধু চিকিৎসক দিয়ে এই খাত চালানো সম্ভব নয়; এজন্য পর্যাপ্ত নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফিজিওথেরাপিস্ট প্রয়োজন। এ ছাড়া সমাজে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা (ডিজেবিলিটি) রয়েছে, যা দূর করতে স্পিচ থেরাপিস্ট ও রেডিওথেরাপিস্টসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর সুপ্রশিক্ষিত ও বিশেষায়িত জনবল গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
‘স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের সবকিছু একটি সমন্বিত ও সর্বজনীন দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে হবে; তা না হলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই সার্বজনীন উদ্যোগের বিষয়টি মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বড় অবদান। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—‘সবার জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।’ এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সবার জন্য সম্পূর্ণ অবাধ ও উন্মুক্ত রাখা হবে, অর্থাৎ দেশের যেকোনো নাগরিক সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা উপভোগ করতে পারবেন’—বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আরেকটি লক্ষ্য হলো, যাতে দেশের যেকোনো অঞ্চলের মানুষ যেকোনো পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে গ্রহণ করতে পারে। আর বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে—যাদের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে তারা নিজস্ব ব্যয়ে চিকিৎসা নেবেন, কিন্তু যাদের পে করার ক্ষমতা নেই, রাষ্ট্র তাদের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করবে। অর্থাৎ, 'চিকিৎসা ছাড়া দেশের কোনো মানুষ থাকবে না'—এটিই হচ্ছে মূল কথা। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কারণ সরকার মনে করে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন এবং আমাদের দল বিএনপি মনে করে—জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। বিএনপি এই কাজটি দলের প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই করে এসেছে। দেশের স্বাস্থ্য খাতের যত ভালো দিক বা অর্জন রয়েছে, তার প্রত্যেকটির ভিত্তি গড়েছে বিএনপি। উদাহরণস্বরূপ, আজকের যে দেশব্যাপী ইমিউনাইজেশন বা শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি, এটির সূচনা করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ইতিহাস দেখলেই এই সত্যতা পাওয়া যাবে।’
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে স্বাস্থ্যখাতে যে উদাসীনতা ও অবহেলা হয়েছে, তার নেতিবাচক প্রভাব আজ হামের ওপর কেমন পড়েছে, তা আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে সমাজে তার প্রভাব কতটা ভয়াবহ ও ব্যাপক হতে পারে, তার অন্যতম বড় উদাহরণ হলো এই হাম পরিস্থিতি। কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির কারণেই এটি ঘটেছে। এ রোগ তো আগেও হয়েছে, আমাদের সময়েও হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে এটি মহামারী আকারে রূপ নিয়েছে, আক্রান্ত শিশুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে এবং চারিদিকে যে হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয়েছে—বাংলাদেশ অনেকদিন পর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি অবলোকন করছে।
অনুষ্ঠানে ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথি সেবায় যুক্ত বিভিন্ন স্তরের চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এমইউ/