জুলাই উদযাপনে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা
হামলা-হুমকি উপেক্ষা করেই আহতদের সেবা দেন চিকিৎসকরা: এনডিএফ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলা, হুমকি ও নানা বাধা উপেক্ষা করেই আহতদের স্বাস্থ্যসেবা, রক্ত ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহ করার দাবি করেছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। আহতদের চিকিৎসা বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকলেও এনডিএফের কৌশলী চিকিৎসা সেবায় বহু প্রাণ রক্ষা পেয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, চিকিৎসক-সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত অবদানেই সাফল্যের মুখ দেখে জুলাই আন্দোলন।
এনডিএফ নেতারা জানান, ঐতিহাসিক সেই প্রেক্ষাপট ধারণ এবং আত্মত্যাগ ও বৈষম্যবিরোধী চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে মাসব্যাপী 'জুলাই উদযাপন' কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ‘জুলাই অভ্যুত্থান: ইনসাফ, মেধা ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ/রাষ্ট্র সংস্কার’ প্রতিপাদ্যে মাসব্যাপী এই জাতীয় কর্মসূচির স্লোগান ঠিক করা হয়েছে ‘জুলাইয়ের আত্মত্যাগ থেকে আগামীর অঙ্গীকার।’
আজ বুধবার (১ জুলাই) সকাল ১১টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
এতে এনডিএফ অফিস সম্পাদক ডা. একেএম জিয়াউল হক জুলাই স্মরণে এনডিএফের মাসব্যাপী কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, গবেষণা কার্যক্রম, স্মৃতিচারণ, চিকিৎসাবিষয়ক সম্মেলন, প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হবে। সব শেষে আগামী ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে গ্র্যান্ড ফাইনাল।
এনডিএফ অফিস সম্পাদক জানান, মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে জুলাই মেডিকেল কনফারেন্স, গবেষণাপত্র ও প্রবন্ধ আহ্বান, স্মৃতিকথা সংগ্রহ, আলোকচিত্র ও তথ্যভিত্তিক প্রদর্শনী, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ‘এনডিএফ ৩৬ জুলাই অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হবে। আগামী ৯ আগস্ট রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার, শাহবাগে দিনব্যাপী গ্র্যান্ড প্রোগ্রামের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে মাসব্যাপী এই কর্মসূচির সমাপনী।
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই আন্দোলনে চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থী, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, অ্যাম্বুলেন্স কর্মীসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের আত্মত্যাগ ও মানবিক ভূমিকার পাশাপাশি দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের অবদানও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে উপস্থাপন করা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার ও আহতদের সম্মাননা, নতুন প্রজন্মের মধ্যে ন্যায়বিচার, মেধা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের চেতনা বিকাশ এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা।
সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল ইনসাফ বা ন্যায়বিচার, আর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানও একই চেতনার ধারাবাহিকতা বহন করে। তাই জুলাইয়ের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের সম্মাননা, গবেষণা, চিকিৎসাবিষয়ক সম্মেলন, সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কার, মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা তুলে ধরা হবে।
এনডিএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. আমিনুল হক খান বলেন, ‘আমি ১৯৭১ সচক্ষে দেখেছি, ভালোভাবে দেখেছি। ১৯৬৯ থেকে আমি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। উনসত্তরের গণ-আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছু দেখার আমার সৌভাগ্য হয়েছে এবং বোঝারও সুযোগ হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘তো একাত্তরের যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মূলত কী ছিল? সেই চেতনা সত্যিকার অর্থে ছিল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না। আসলে ন্যায়বিচার, ইনসাফই ছিল আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। পরবর্তী সময়ে জোর করে সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ পার্শ্ববর্তী একটি দেশ থেকে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজেই একাত্তরের চেতনা যদি ঠিকমত বাস্তবায়িত হতো, যদি তদানীন্তন শাসক দল অদক্ষতার পরিচয় না দিত, দুর্নীতি, লুটপাট না করত এবং আমাদের দেশের ওপর প্রতিবেশী একটি দেশ জুলুম-নির্যাতন ও লুটপাট না করতো—তাহলে চব্বিশের প্রয়োজন আসত না।’
‘সুতরাং একাত্তর আর চব্বিশের মধ্যে আক্ষরিক অর্থে কোনো পার্থক্য নেই। একাত্তরের যে চেতনা ছিল, চব্বিশেরও সেই একই চেতনা। আমরা একাত্তরকেও ধারণ করি, চব্বিশকেও ধারণ করি। তো চব্বিশের চেতনাকে আমরা যাতে ভুলে না যাই, সেজন্য আমাদের আজকের এই আয়োজন’—বলেন তিনি।
এনডিএফের জয়েন্ট সেক্রেটারি ডা. রুহুল কুদ্দুস বিপ্লব বলে, ‘ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে কোনো জাতি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। জুলাই স্মরণে সেজন্যই ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের মাসব্যাপী এই আয়োজন। জুলাই অভ্যুত্থানকে ইতিহাসের পাতায় লেখার ক্ষেত্রে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের যে ভূমিকা—আমরা সেটা একটি সম্মানের জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।’
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্নকে নতুনভাবে উন্মোচিত করেছে। শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের ত্যাগ এবং চিকিৎসক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মানবিক অবদান জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের সিনিয়র সহ সভাপতি চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহ বলেন, বিগত ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। আপনারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন তথ্য জাতির কাছে প্রকাশ করেছেন। অনেক ঝুঁকি নিয়ে জুলাই যোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন এবং আপনাদের সেই যোগাযোগ এবং সমন্বয় জুলাই বিপ্লব সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
‘আপনারা যে রকম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি চিকিৎসা পেশা থেকে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের চিকিৎসকরাও এই জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা প্রদানের চেষ্টা করেছে।’
জুলাই যোদ্ধাদের ওপর বিভৎস অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গুলিতে খুলি উড়ে যাওয়া, মগজ বের হয়ে যাওয়া, ফুসফুস বের হয়ে যাওয়া—এই ধরনের অবস্থাগুলো ঠাণ্ডা মাথায় চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক ভাই ও বোনেরা চেষ্টা করেছেন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে আল্লাহর রহমতে অনেক ক্যাজুয়ালিটি আমরা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছি।’
তিনি বলেন, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম বাংলাদেশের চিকিৎসকদের এমন একটি সংগঠন, যে সংগঠন এদেশের মানুষের সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। আমরা সিডর-আইলা থেকে রানা প্লাজা ধস পর্যন্ত সব ধরনের দুর্যোগ-দুর্বিপাকে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম এদেশের মানুষের সাথে থেকেছে।
‘এরই ধারাবাহিকতায় ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানেও ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম তরুণ যোদ্ধাদেরকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছে। আপনারা শুনে আশ্চর্য হবেন যে, এনডিএফের উদ্যোগে প্রায় ৮৪ ব্যাগ রক্ত আমরা জোগাড় করে আহত ভাইদের চিকিৎসার ব্যবস্থা আমরা করেছি।’
জুলাই উদযাপনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে ডা. ওয়ালিউল্লাহ হলেন, শুধুমাত্র আনন্দ-উল্লাসের জন্য জুলাই উদযাপন করছি, বিষয়টা এমন নয়। আমরা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, কি ধরনের একটি বিপর্যয় মোকাবেলা করে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে এদেশে স্বৈরাচারকে উৎখাত করতে হয়েছে।
এনডিএফ সহ-সভাপতি ডা. আতিউর রহমান বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালগুলোতে যখন বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সামগ্রী অভাব হয়েছে, তখন আমরা সেগুলো সরবরাহ করেছি।’
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ডা. নুরুদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব আমাদের জীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। জুলাই মাসের প্রতিটি দিন ছিল আমাদের জন্য একটা হিমশীতল করা একেকটা দিন। কখন কী হয়—সেই শঙ্কায় আমরা মূলত দিনগুলো পার করেছি। বিগত ১৭ বছরের যে একটা জগদ্দল পাথর, স্বৈরাচারী শাসন আমাদের মাথার উপর চেপে বসেছিল, সেই পাথরকে উৎপাটনের জন্য ছাত্র-জনতা সুনিপুণ একটা পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল এবং আমাদের জাতিকে মুক্ত করেছিল। সেটা সত্যিই বিশ্বের ইতিহাসে বিরল হয়ে থাকবে। আমাদের সন্তানতুল্য ছেলেরা জুলাই বিপ্লবে যে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে, এটা অনন্য।’
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম মানবতার সেবায় নিয়োজিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা ডাক্তার হই, তাদেরকে একটা শপথ করানো হয়—‘রোগীর স্বাস্থ্য এবং কল্যাণই হবে আমার প্রথম বা প্রধান বিবেচ্য বিষয়। রোগীর জীবন এবং সম্মান আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। যেকোনো ধর্ম বা বর্ণের রোগীর প্রতি আমাদের সিম্প্যাথি, এম্প্যাথি সমভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যখন গণহত্যা চালানো হয়, তখন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদেরকে চিকিৎসা না দিতে আমাদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’—এভাবে রোগীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এর বিপরীতে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সদস্যরা রোগীদেরকে চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসে। এতে তাঁদের জীবনও হুমকির মুখে পড়ে।’
তিনি বলেন, এ সময় সরকারদলীয় সমর্থকদের বাঁধার কারণে রোগীদের চিকিৎসা দিতে নানা কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। বাঁধার মুখে বলতে হয়, ‘গুলি বিদ্ধ হয়নি, রাস্তায় এক্সিডেন্ট করে এসেছে। এভাবে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে অনেক রোগীর জীবনের সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়েছিল ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের চিকিৎসকরা।
আন্দোলনে অবদানের জন্য ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, মূলত এই আন্দোলন চিকিৎসক সমাজ পুরোপুরি সম্পৃক্ত ছিল। তারা যেরকম মাঠে কাজ করছিলেন, তেমনি ভেতরেও রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে এই আন্দোলন সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়েছিলেন।
এ সময় সাংবাদিকদের অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন ডা. নুরুদ্দিন। বলেন, ‘অনেকে সাংবাদিক ভাই নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন—মূলত সর্বস্তরের জনগণের একটা সম্মিলিত অবদান ছিল এই ‘জুলাই বিপ্লব’।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডা. উসামা রাইয়ান। তিনি বলেন, চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীরা যেসব হাসপাতালে জুলাই যোদ্ধাদের সেবা দিয়েছিলেন, আজ তাদেরকে তালিকা করে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনডিএফের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।
এমইউ/