২৭ জুন, ২০২৬ ১০:৩৭ পিএম

‘হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক নাগরিকভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু

‘হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক নাগরিকভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নাগরিকের অংশগ্রহণ, গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং জবাবদিহি জোরদারের লক্ষ্যে ‘হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ’ নামে নাগরিকভিত্তিক নতুন একটি প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু হয়েছে। আজ শনিবার (২৭ জুন) বিকালে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়েলবিং কেয়ার ফাউন্ডেশনের গোলটেবিল সংলাপে এর আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়।

সংলাপে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও গবেষকরা এ উদ্যোগকে সরকারের স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে সহায়ক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন। অনুষ্ঠানে দেশের স্বাস্থ্যখাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, সেবার মানোন্নয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তারা।

আলোচনায় হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশের একটি প্রস্তাবিত কাঠামো উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে ৩০০ জন হেলথ পার্লামেন্ট মেম্বার নিয়ে একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে। এসব সদস্য নিজ নিজ এলাকার স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব সমস্যা, নাগরিকের মতামত ও স্থানীয় চাহিদা সংগ্রহ করে গবেষণাভিত্তিক সুপারিশ প্রণয়ন করবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করবেন।

ধারণা, কাঠামো ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়েলবিং কেয়ার ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ মেম্বার মাহমুদুল হাসান।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সংসদীয় আসনের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বাস্তবতা ও জনগণের মতামত বেসরকারি পর্যায়ে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ হবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি নাগরিকভিত্তিক স্বাস্থ্য সংলাপ প্ল্যাটফর্ম।

গোলটেবিল আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, আয়োজক ও গোলটেবিল আলোচকদের কথার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছি, হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ করা হচ্ছে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য। সরকার পরিবর্তন চাচ্ছে, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও আছে, এই বছর তারা বড় একটি বাজেটও দিয়েছে। সরকারকে সবকিছুতে সহযোগিতা করলে এই উদ্যোগকে সরকার ইতিবাচকভাবে নেবে।

তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা অনেক কাজে ব্যস্ত থাকেন। সাধারণত স্বাস্থ্যের মাইক্রো বিষয়গুলো তাদের নজরে আসে না। সেসব বিষয়ে হেলথ পার্লামেন্ট যদি সরকারকে সহযোগিতা করে এবং তারা যদি এই বিষয়গুলো আলোচনায় নিয়ে আসে তাহলে এর পথ ধরে এগুলো সরকারের নীতিতে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং এর বাস্তবায়ন হয়ে যাবে।

নতুন এই ধারণাটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সমন্বয় দরকার উল্লেখ করে ড. আব্দুল হামিদ বলেন, এই হেলথ পার্লামেন্টের মাধ্যমে কাজটা করতে গেলে বড় ধরনের তহবিল দরকার, সহযোগিতা দরকার। সেই জায়গায় আলোচনা হওয়া দরকার যে, তাদেরকে আমরা কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি। তা না হলে তারা কাজটা করতে পারবেন না, এটা সম্ভব না। এটা রাষ্ট্রের কাজ, একটা বেসরকারি ইনস্টিটিউশন, যারা লাভের আশা ছাড়া করছেন, তারা কোথা থেকে করবে? সেই বিকল্প ব্যবস্থা তো তাদের নেই। সেজন্য আমরা এখানে যারা আছি সরকারি-বেসরকারি, এমনকি এনজিওসহ দেশে-বিদেশে যারা সুহৃদ আছেন, তাদের সবার সহযোগিতায় এই ভালো উদ্যোগটি এগিয়ে নিতে হবে, তাহলে ভালো কিছু হবে।

জবাবদিহিমূলক এ রকম প্ল্যাটফর্মের অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান যে আঙ্গিকে চিন্তা করা হচ্ছে, তা কেবল সেই কাঠামোতেও না, বরং মাইক্রো লেভেলেও দরকার আছে। আমি যদি আমার নিজের ক্ষেত্রে বলি, আমার নিজের ভেতরে একটা হেলথ পার্লামেন্ট দরকার। কেন? বোতলজাত পানির ভেতরে মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে, আমি কিন্তু তা নির্দ্বিধায় খেয়ে ফেলছি। সুতরাং আমার নিজের ভেতরেও একটা হেলথ পার্লামেন্ট দরকার। প্রত্যেকটা বাড়িতে একটা হেলথ পার্লামেন্ট দরকার। আমাদের শিশুদেরকে চিপস, চকলেট, চানাচুর, আইসক্রিম এবং রেস্টুরেন্টের খাবার থেকে বিরত রাখতে পারছি না। এটা যদি না পারি, তাহলে আমাদের হেলথ ভালো থাকবে না।’

‘আমাদের হেলথ ও মৃত্যু নিয়ে যখন কথা বলি, তখন ধরে নিই, এটা অন্যের বিষয়, আমার না। এই হেলথ এবং মৃত্যু ঘিরে যতদিন নিজেকে ভাবনায় আনতে না পারবো ততদিন আমরা সুরক্ষিত হতে পারবো না। সেজন্য প্রত্যেক বাড়ি, প্রত্যেক কমিউনিটি, স্কুল-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই হেলথ পার্লামেন্ট দরকার। সুতরাং হেলথ পার্লামেন্টের প্রয়োজনীয়তা খুবই পরিষ্কার। আমি মনে করি, আমরা সবাই মিলে সবার জায়গা থেকে যদি সহযোগিতা করি এবং সরকারকে যদি বোঝানো যায় যে, এটা কোনোভাবেই বিপরীতধর্মী কিছু না, সাংঘর্ষিক কিছু না, বরং সরকারের যেসব পলিসি ও এজেন্ডাআছে, এই পার্লামেন্ট সেসব বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। তাহলে আশা করা যায় এটা বাস্তবে ভিত্তি পাবে।’

অনুষ্ঠানে জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সিনিয়র ফ্যাকাল্টি ডা. হালিদা হানুম আখতার বলেন, ‘বাংলাদেশে কোন জিনিসটার অভাব? জ্ঞানের অভাব, ডাটার অভাব? আমাদের দেশের লোকজন ল্যানসেটে কত সুন্দর সুন্দর গবেষণাপত্র পাবলিশ করেন, আমাদের ইউনিভার্সিটির লোকজন, বিএমআরসির লোকজন বড় বড় কাজ করছেন। তাহলে শূন্যতা কোথায়? অভাব কোথায়? বিচ্ছিন্নতা কোথায়? আমার মানুষ মারা যাচ্ছে, অথচ ডাক্তারকে মারতে আসছে স্বজনরা! আরে, ডাক্তার এক জায়গায় দাঁড়ালে মানুষ আহ্লাদ করবেন, 'স্যার স্যার' বলবেন। শ্রদ্ধার সঙ্গে বলবেন, স্যার, আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। অথচ সেখানে ঘটছে অন্য জিনিস। এগুলো বড় বড় প্রশ্ন। উত্তর আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশের ভূমিকা হবে সেই শূন্যতা চিহ্নিত করা।’

গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, এই উদ্যোগ সরকারের স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (ইউএইচসি) এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি-৩) অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যা, নাগরিকের মতামত ও স্থানীয় চাহিদা একত্রিত করে নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপনের মাধ্যমে কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।

তাঁরা আরও বলেন, হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেমের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্য বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠক, নীতি সংলাপ, স্বাস্থ্য বাজেট বিশ্লেষণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, গবেষণা, অ্যাডভোকেসি এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী নাগরিকভিত্তিক স্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য সমতার মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুব ও সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, গবেষণাভিত্তিক সুপারিশ, নিয়মিত সংলাপ, স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ এবং অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশ দেশের স্বাস্থ্যনীতি উন্নয়নে একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

আলোচনা শেষে হেলথ পার্লামেন্ট বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা এবং এর লোগো উন্মোচন করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা উদ্যোগটিকে একটি গবেষণাভিত্তিক, নাগরিক-অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ওয়েলবিং কেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মো. রাজিকুল হাসান রিফাতের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সংগঠনের এক্সিকিউটিভ মেম্বার ডা. মাহবুবুর রহমান রাজিব।

এতে উপস্থিত ছিলেন ঢাবি স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শাফিউন নাহিন শিমুল, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এ. এম. পারভেজ রহিম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্কুল হেলথ প্রোগ্রামের সহকারী পরিচালক মো. আসিফ ইকবাল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা শাখা) ডা. মোহাম্মদ জাকারিয়া রানা, সেরাক-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস. এম. শাইকাত, ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মো. আদনান হোসাইন, ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মোহাম্মদ মাসুমুল হক ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের (কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য) জাতীয় পরামর্শক ডা. এ.এন.এম. এহতেশাম কবির।

এ ছাড়াও দেশের নীতিনির্ধারক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, তরুণ নেতৃত্ব এবং ২০টিরও বেশি স্বাস্থ্যবিষয়ক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন অনুষ্ঠানে।

উপস্থিত ছিলেন ওয়েলবিং কেয়ার ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি জেনারেল রাকিব হাসান অভি, ট্রেজারার আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, জয়েন্ট সেক্রেটারি গোলাম মাবুদ, ভাইস চেয়ারম্যান আরাফাতুল কবির, এক্সিকিউটিভ মেম্বার মাহমুদুল হাসান, এক্সিকিউটিভ মেম্বার ডা. মাহবুবুর রহমান রাজিব, এক্সিকিউটিভ মেম্বার সুলতানা পারভীন ও এক্সিকিউটিভ মেম্বার এনামুল্লাহ এনাম।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত