বাজেট ২০২৬-২৭
তামাক কর কাঠামো সংস্কারে বিশেষজ্ঞদের তাগিদ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির উদ্বেগ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তামাক করের কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ উপস্থাপন করেছে। বাজেটে কর প্রশাসনের উন্নয়ন ও কর ফাঁকি রোধে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রস্তাবিত তামাক কর কাঠামো পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে সক্ষম হয়নি।
তামাক সেবন হ্রাস, যুবসমাজের ধূমপান রোধ এবং সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান কাঠামোর কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর না করলে তামাক পণ্য ভোক্তাদের কাছে সাশ্রয়ী থেকে যাবে এবং করবৃদ্ধির জনস্বাস্থ্যগত কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়বে।
আজ সোমবার (২২ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) উদ্যোগে ‘বাজেট ২০২৬-২৭: তামাক কর ও নীতি সংস্কারের শেষ সুযোগ’ শীর্ষক একটি পোস্ট-বাজেট সংবাদ সম্মেলনের এসব বিষয় তুলে ধরেন আলোচকরা। এতে সঞ্চালনা করেন পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
এতে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. শাফিউন নাহীন শিমুল এবং ঢাবির অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস.এম. আব্দুল্লাহ। মূল উপস্থাপনা পরিচালনা করেন পিপিআরস’র সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মুহম্মদ ইহতিসাম হাসান, যিনি প্রস্তাবিত তামাক কর পদক্ষেপ, সিগারেট বাজারের প্রবণতা এবং অর্থ বিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কারের অবশিষ্ট সুযোগ বিশ্লেষণ করেন।
সিগারেটের সাশ্রয়যোগ্যতা ও বাজার প্রবণতা বিষয়ক উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয় যে, বারবার কর ও মূল্য সমন্বয় সত্ত্বেও সিগারেট এখনও অনেক ভোক্তার নাগালের মধ্যে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, তামাক থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়তে থাকলেও ২০২৪ সাল থেকে সামগ্রিক সিগারেট সরবরাহ কমতে শুরু করেছে, যা ইঙ্গিত করে যে কর-চালিত মূল্যবৃদ্ধির আরও সুযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের চার-স্তরবিশিষ্ট সিগারেট কর কাঠামো অব্যাহত থাকায় ধূমপায়ীরা ধূমপান ছাড়ার বদলে সস্তা ব্র্যান্ডে চলে যাচ্ছেন, ফলে তামাক করের জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষণ উপস্থাপন করতে গিয়ে মুহম্মদ ইহতিসাম হাসান বলেন, নিম্ন-মূল্য সিগারেট স্তরের অস্তিত্ব করবৃদ্ধির জনস্বাস্থ্যগত প্রভাবকে দুর্বল করে দেয়। ভোগ কমার বদলে ধূমপায়ীরা কেবল সস্তা ব্র্যান্ডে সরে যায়। কার্যকর কাঠামোর জন্য নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করা, প্রতি ১০ স্টিকের প্যাকেটের ন্যূনতম মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং প্রতি প্যাকেটে চার টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা প্রয়োজন, যাতে মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি সরকারি রাজস্বে রূপান্তরিত হয়।
সরকারি রাজস্বের উপর প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ড. শাফিউন নাহীন শিমুল উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ৭০ বিলিয়ন সিগারেট স্টিক বিক্রি হয়, যা একটি বিশাল তামাক বাজার নির্দেশ করে। ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি সত্বেও ধূমপানের হার প্রত্যাশিত হারে কমেনি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সাম্প্রতিক কর পদক্ষেপগুলো সর্বোচ্চ জনকল্যাণ নিশ্চিত করছে কিনা এবং যুক্তি দেন যে মূল্যবৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারের পরিবর্তে তামাক কোম্পানিগুলোর কাছে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, যখন মধ্যম স্তরের একটি প্যাকেটের দাম ৮০ টাকা থেকে ৯২ টাকায় বাড়ে, তখন মূল প্রশ্ন হলো- এই বৃদ্ধির সুবিধা কে পাচ্ছে? সরকারের পরিবর্তে তামাক কোম্পানির লাভ মানে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি, যা শেষ পর্যন্ত জনগণেরই ক্ষতি।
আলোচনায় নতুন নিকোটিন পণ্যের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা জানান, ‘নিকোটিন পাউচ’ ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক অনুমোদন পেয়েছে এবং বাংলাদেশকে অন্যত্র দেখা ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি এড়াতে সতর্ক থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে ড. শিমুল বলেন, বেশ কয়েকটি দেশে তরুণদের মধ্যে নিকোটিন পণ্যের দ্রুত বিস্তার নিয়ন্ত্রক বিলম্বের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেয়। বাংলাদেশকে একইরকম পরিণতি রোধে সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তামাক কর ও জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে ড. এস.এম. আব্দুল্লাহ যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দিকে অগ্রসর হতে হলে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর তামাক কর নীতি অপরিহার্য।
তিনি বলেন, তামাক কর অসংক্রামক রোগের বোঝা কমাতে সাশ্রয়ী একটি হাতিয়ার হলেও বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম জটিল কাঠামো হিসেবে রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘যদি বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে চিকিৎসামূলক থেকে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তরিত হতে চায়, তাহলে তামাক করকে কেন্দ্রীয় নীতি হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে। কাঠামো সরলীকরণ ও সাশ্রয়যোগ্যতা হ্রাসের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন।’
ধোঁয়াবিহীন তামাক খাতের নিয়ন্ত্রণ ঘাটতির বিষয়ে তিনি বলেন, বিশেষত নারীদের মধ্যে এর ব্যাপক প্রচলনের কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেন যে, নিবন্ধন ও ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ অত্যন্ত কঠিন। কার্যকর সম্মতি নিশ্চিত করতে কার্যকর ট্র্যাকিং অপরিহার্য।
আলোচনায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আরও কঠোর প্রয়োগের গুরুত্বও তুলে ধরে ড. সৈয়দ মোহাম্মদ আকরাম জানান, হাসপাতাল, পার্ক ও খেলার মাঠের নির্ধারিত সীমার মধ্যে ধূমপান ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপের ক্ষমতা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান আইন প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট কর্তৃত্ব প্রদান করে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের আরও সক্রিয় ব্যবহার এবং স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা লঙ্ঘন হ্রাস, সম্মতি বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকের দাম বাড়ানো হলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথেষ্ট কিনা। তিনি বলেন, ‘শুধু দাম বেড়েছে কিনা সেটা বিষয় নয়; বরং বৃদ্ধিটি তামাক ব্যবহার কমাতে এবং সরকারি রাজস্ব সর্বোচ্চ করতে যথেষ্ট কিনা সেটাই মূল প্রশ্ন।’
তিনি আরও বলেন, কিছু প্রস্তাবিত সমন্বয় বাজার বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন বলে মনে হচ্ছে এবং অতিমাত্রায় কারিগরি মূল্য সংশোধন প্রায়ই উল্লেখযোগ্য ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়। কর সিদ্ধান্ত যখন প্রকৃত বাজার পরিস্থিতি প্রতিফলিত না করে দশমিকের হিসাবে আটকে যায়, তখন নীতির প্রভাব সীমিত থাকে এবং মূল্যবান রাজস্ব সুযোগ হাতছাড়া হয়।
সুশাসন সংক্রান্ত উদ্বেগও তুলে ধরে তিনি সতর্ক করেন যে, অবৈধ বাণিজ্য ও বাজার ফাঁকি সরকারি রাজস্ব ক্ষয় করছে এবং এর জন্য আরও শক্তিশালী প্রয়োগ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ই-সিগারেট বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. রহমান বলেন, ‘ই-সিগারেটের নিয়ন্ত্রণমূলক সংজ্ঞা দুর্বল করা হয়েছে এবং এগুলো কার্যত সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। সম্ভাব্য রাজস্ব লাভ নগণ্য, কিন্তু তরুণদের উপর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য এবং এটি আগামী বছরগুলোতে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।’
জেএইচ/