ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া
নবজাতক শিশু বিশেষজ্ঞ,
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ),
বিসিএস (স্বাস্থ্য),
এমডি, নিওনেটোলজি
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়,
রেজিস্ট্রার, শিশু বিভাগ
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
১৪ জুন, ২০২৬ ১১:১৮ পিএম
হাসপাতালে হঠাৎ লাইভে এসে চাপ সৃষ্টি করলে চিকিৎসকের করণীয়
কয়েক বছর আগেও হাসপাতালে কোনো সমস্যা হলে রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতেন, বিভাগীয় প্রধানের কাছে অভিযোগ করতেন বা হাসপাতাল প্রশাসনের দ্বারস্থ হতেন। এখন দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে কোনো অসন্তোষ তৈরি হলেই অনেকের প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ফোন বের করে লাইভ সম্প্রচার শুরু করা। জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনেও দেখা যায় কেউ একজন ক্যামেরা তাক করে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করার চেষ্টা করছেন।
একটি পরিচিত দৃশ্য কল্পনা করা যাক। রাত দুইটা। জরুরি বিভাগে একসঙ্গে কয়েকজন সংকটাপন্ন রোগী এসেছে। একজন চিকিৎসক একদিকে দুর্ঘটনায় আহত রোগী দেখছেন, অন্যদিকে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত একজন শিশুর চিকিৎসা চলছে। ঠিক তখনই আরেক রোগীর স্বজন এসে উচ্চস্বরে বলতে শুরু করলেন, ‘আমার রোগীকে দেখছেন না কেন?’ কয়েক মিনিটের মধ্যেই মোবাইল ফোন বের হলো, ফেসবুক লাইভ চালু হলো, আর শুরু হলো অভিযোগের বন্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা লাইভটি দেখছেন, তারা জানেন না যে ওই চিকিৎসক গত দশ ঘণ্টা ধরে টানা দায়িত্ব পালন করছেন কিংবা একই সময়ে আরও কয়েকজন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। তারা কেবল ভিডিওর কয়েক সেকেন্ডের একটি অংশ দেখছেন।
বাস্তবতা ও ভিডিওর পার্থক্য
এখানেই সবচেয়ে বড় সমস্যাটি তৈরি হয়। বাস্তবতা ও ভিডিওর বাস্তবতা এক জিনিস নয়। ক্যামেরা সবকিছু দেখায় না; ক্যামেরা কেবল একটি দৃশ্য দেখায়। ফলে একজন চিকিৎসক সঠিক অবস্থানে থেকেও ভুলভাবে উপস্থাপিত হতে পারেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন চিকিৎসকের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা। রাগ হওয়া স্বাভাবিক। অপমানিত বোধ করাও স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, লাইভে থাকা অবস্থায় আপনার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি মুখভঙ্গি এবং প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি রেকর্ড হচ্ছে। আপনি যদি রাগের মাথায় বলে ফেলেন, ‘ক্যামেরা বন্ধ করুন, বের হয়ে যান,’ তাহলে পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়তো শুধু এই অংশটুকুই ছড়িয়ে পড়বে। কেউ দেখবে না যে এর আগে আপনাকে কতটা উসকানি দেওয়া হয়েছিল।
দীর্ঘ তর্কে জড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়
ধরা যাক, একজন স্বজন লাইভে বলছেন, ‘ডাক্তার কিছুই করছেন না।’ এই মুহূর্তে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে দীর্ঘ তর্কে জড়িয়ে পড়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং শান্তভাবে বলা যেতে পারে, ‘রোগীর চিকিৎসা চলছে। বিস্তারিত বিষয় আপনাদের সঙ্গে আলাদা করে আলোচনা করা হবে।’ অনেক সময় সংক্ষিপ্ত ও সংযত একটি বাক্যই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা ভুল
আরেকটি সাধারণ ভুল হলো মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা। অনেক চিকিৎসক মনে করেন, ফোনটি বন্ধ করতে পারলেই সমস্যা শেষ হয়ে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো হয়। ফোন ধরার মুহূর্তের ভিডিওটিই পরে ভাইরাল হয়ে যায়। তখন পুরো আলোচনা সরে গিয়ে কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়, ‘ডাক্তার কেন ফোন কেড়ে নিলেন?’ ফলে মূল বিষয়টি হারিয়ে যায়। তাই শারীরিক প্রতিরোধের পরিবর্তে নিরাপত্তাকর্মী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ডাকা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
সব অভিযোগকারীর উদ্দেশ্য খারাপ নয়
চিকিৎসকদের একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—সব অভিযোগকারী মানুষ খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন না। অনেকেই আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা বা অসহায়ত্ব থেকে আবেগপ্রবণ আচরণ করেন। একজন মা যদি তার অসুস্থ শিশুকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্বেগে থাকেন, তাহলে তার আচরণ সবসময় যুক্তিনির্ভর নাও হতে পারে। এই মানবিক বাস্তবতা উপলব্ধি করলে অনেক সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই কমে যেতে পারে।
তবে সব ঘটনা যে শুধুই আবেগের কারণে ঘটে, তাও নয়। কখনো কখনো কিছু ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে চাপ সৃষ্টি করার জন্য লাইভ করেন। তারা মনে করেন ক্যামেরা চালু করলেই চিকিৎসক ভয় পেয়ে যাবেন বা বিশেষ সুবিধা দিতে বাধ্য হবেন। উদাহরণস্বরূপ, জরুরি বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী রোগীকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি অপেক্ষা করতে রাজি নন। তখন তিনি লাইভে গিয়ে বলতে শুরু করেন, ‘দেখুন, এখানে কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না।’
এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের কাজ হলো নিয়ম মেনে চলা, লাইভের চাপে নীতিমালা পরিবর্তন করা নয়।
রোগীর স্বাস্থ্যতথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো অনৈতিক
রোগীর গোপনীয়তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি বিভাগে অনেক রোগী এমন অবস্থায় থাকেন, যা প্রকাশ্যে প্রদর্শনের মতো নয়। কারও রক্তাক্ত শরীর, কারও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্য, কারও মৃত্যুযন্ত্রণা—এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনৈতিক এবং অনেক ক্ষেত্রে মর্যাদাহানিকর। তাই ভদ্রভাবে বলা যেতে পারে, ‘এখানে অন্যান্য রোগীও আছেন। তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।’
সাংবাদিক পরিচয়ে কেউ এলে আরও সতর্ক হতে হবে। প্রকৃত সাংবাদিকরা সাধারণত পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করেন। কিন্তু আজকাল অনেকেই ক্যামেরা হাতে নিয়ে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেন। এ ধরনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের উচিত ব্যক্তিগতভাবে বিতর্কে না জড়িয়ে হাসপাতালের প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা। কারণ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের দায়িত্ব সাধারণত প্রতিষ্ঠানের, চিকিৎসকের ব্যক্তিগত নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসককে ক্যামেরার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে না। তার কাজ রোগীর চিকিৎসা করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কী বলল, তার জবাব সবসময় সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেক সময় নীরবতা, সংযম এবং পেশাগত আচরণই সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর।
সংকটময় পরিস্থিতি সামালের দক্ষতা অর্জনও জরুরি
বর্তমান যুগে চিকিৎসকদের শুধু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা জানলেই চলবে না; সংকটময় সামাজিক পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতাও প্রয়োজন। কারণ হাসপাতাল এখন শুধু চিকিৎসার স্থান নয়, অনেক সময় এটি আবেগ, প্রত্যাশা, হতাশা এবং সামাজিক চাপেরও মিলনস্থল। এই বাস্তবতায় একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধৈর্য, পেশাদারিত্ব এবং আত্মসংযম।
ক্যামেরার সামনে জেতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মর্যাদা, রোগীর নিরাপত্তা এবং পেশার সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা।
এমইউ/