মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন
এডিটর প্রফেশনাল ম্যাগাজিন
বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশন
জাতীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ
১৬ মার্চ, ২০২৬ ০৬:৫০ পিএম
তিন হাসপাতালে অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ
সম্প্রতি দেশের তিনটি সরকারি হাসপাতালে নার্সদের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এই হাসপাতালগুলো হলো কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী অভিযোগ উঠেছে যে, অ্যানেস্থেশিয়া ইনজেকশন প্রয়োগের পর রোগীর মৃত্যু হয়েছে এবং এই ঘটনাগুলো ঘটেছে প্রায় একই দিনে একই সময়ে—সকাল ৬:৩০ থেকে ৭টার মধ্যে।
ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এখানে সম্ভাব্যভাবে মেডিকেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এরর হয়েছে এবং ওষুধ প্রয়োগের মৌলিক নীতিমালা অনুসরণে গুরুতর ব্যত্যয় ঘটেছে।
আমি সব সময় একটি কথা বলার চেষ্টা করি—নার্সের সেবা পেতে চান, তেমন নার্স হন। এই নৈতিক অবস্থান ছাড়া নার্সিং পেশার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বর্তমানে ভুল ওষুধ প্রয়োগ বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার (ডব্লিউএইচও) অন্যতম বড় রোগী-নিরাপত্তা সমস্যা। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় প্রতি ২০ জন রোগীর মধ্যে ১ জন (৫%) ওষুধজনিত ভুলের কারণে ক্ষতির শিকার হন। এসব ঘটনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মারাত্মক বা জীবননাশের ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
ওষুধজনিত ভুলে বিশ্বে বছরে ক্ষতি ৪২ বিলিয়ন ডলার। প্রতি বছর ওষুধজনিত ভুলের কারণে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। গবেষণায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগ পর্যায়েই সবচেয়ে বেশি ভুল ঘটে।
নার্সরা রোগীর সাথে সবচেয়ে বেশি সময় থাকেন এবং প্রতিদিনের চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০% সময় ওষুধ প্রয়োগে ব্যয় করেন। তাই নার্সরা এই প্রক্রিয়ার ফাইনাল সেফটি চেক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রোগীর জন্য নির্ধারিত ওষুধ প্রয়োগের সময় এমন কোনো ভুল, যা রোগীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে—তাই মেডিকেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এরর। এর মধ্যে রয়েছে ভুল রোগীকে ওষুধ দেওয়া, ভুল ডোজ, ভুল ওষুধ, ভুল রুট, ভুল সময়, ভুল টেকনিক এবং যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া ওষুধ প্রয়োগ।
ওষুধ প্রয়োগের ভুল সাধারণত ব্যক্তিগত ভুলের কারণে নয়; বরং এটি একটি সিস্টেম ফেলিওর। প্রধান কারণগুলো হলো—
১. অতিরিক্ত কাজের চাপ: অতিরিক্ত রোগী-নার্স অনুপাত এবং কর্মঘণ্টা বেশি হওয়া।
২. নার্স বার্নআউট: বর্তমান বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো নার্স বার্নআউট।
৩. অপর্যাপ্ত ফার্মাকোলজি শিক্ষা: নার্সিং শিক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে ফার্মাকোলজি খুব সীমিতভাবে পড়ানো হয়।
৪. নাইট ডিউটির ক্লান্তি: বিশেষ করে ডিউটির শেষ ভাগে ভুলের ঝুঁকি বাড়ে।
৫. দুর্বল ক্লিনিক্যাল তদারকি: নিয়মিত ক্লিনিক্যাল নার্সিং অডিট না থাকা এবং
৬. উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নার্সিং এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (নিয়েনার) একটি গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে নার্সদের মেডিকেশন ভুল প্রয়োগের পরিমাণ ৩৮%। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কিছু কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ওষুধ প্রয়োগজনিত ভুল হয়ে থাকে।
এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হলো—নার্স-রোগীর অনুপাত অত্যন্ত কম, হাই অ্যালার্ট মেডিকেশন পলিসি দুর্বল, ক্লিনিক্যাল অডিট সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত, গবেষণাভিত্তিক নার্সিং সেবা দেওয়ার অনীহা এবং নিয়মিত নার্সিং শিক্ষার ঘাটতি।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার সকল সরকারি ওষুধকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে মিলিয়ে লাল-সবুজ করেছে, যা বর্তমান সময়ে মেডিকেশন ভুল ব্যবহারের একটি অন্যতম কারণ। সব ওষুধের রং এক হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
এ ছাড়া মেডিকেশন সেফটি রিপোর্টিং সিস্টেম দুর্বল। ফলে মেডিকেশন এরর হলে তা প্রায়ই ব্যক্তিগত ভুল হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একটি টিম অ্যান্ড সিস্টেম ফেলিওর।
ভুল ওষুধ প্রয়োগ প্রতিরোধে নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. ওষুধ প্রয়োগ নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে চলা (সঠিক রোগী, ডোজ, সময়, পথ ও পদ্ধতি)।
২. অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ওষুধ পুনঃনিরীক্ষণ করা।
৩. হাই অ্যালার্ট মেডিকেশন পলিসি তৈরি করা।
৪. ক্লিনিক্যাল নার্সিং অডিট চালু করা এবং প্রতিটি হাসপাতালে মেডিকেশন অডিট চালু রাখা।
৫. কনটিনিউয়াস নার্সিং এডুকেশন চালু করা। ফার্মাকোলজি, নিরাপদ ও গবেষণাভিত্তিক নার্সিং সেবা এবং নিরাপদ ওষুধ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নার্সদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৬. মেডিকেশন এরর রিপোর্ট সংরক্ষণ করার পরিবেশ তৈরি করা। ভুল হলে তা লুকানো নয়, বরং শেখার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
৭. ওষুধের রং এবং প্যাকেজিংয়ে ভিন্নতা আনা।
নার্সেস বার্নআউট: একটি বড় সংকট
আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিশেষ করে তরুণ নার্সদের মধ্যে হতাশা অনেক বেশি। যদি আমরা এই সমস্যার সমাধান না করি, তাহলে ভবিষ্যতে রোগী-নিরাপত্তা আরও বড় ঝুঁকিতে পড়বে। তাই নার্সদের যথাযথ ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধি, ভালো কাজের জন্য সম্মান প্রদান এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক নার্স দিবসের বার্তা
গত বছরের আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আওয়ার নার্সেস, আওয়ার ফিউচার: কেয়ারিং ফর নার্সেস স্ট্রেংথেন্স ইকোনমিজ’ অর্থাৎ আমাদের নার্স আমাদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ তখনই নিরাপদ হবে, যখন আমরা নার্সদের যত্ন নিতে পারবো।
কারণ একজন রোগীর মৃত্যু মানে শুধু একটি জীবন নয়; বরং তার সাথে যুক্ত থাকে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি দেশের অর্থনীতি।
সুতরাং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হলে নার্সদের শক্তিশালী করতেই হবে।
এমইউ/