লুবনা ইয়াসমিন

লুবনা ইয়াসমিন

জনস্বাস্থ্য গবেষক ও আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


২২ জুলাই, ২০২৫ ০৬:২১ পিএম

মাইলস্টোন ট্রাজেডি: মর্মান্তিক সময়ে দায়িত্বশীল আচরণ সকলের কর্তব্য

মাইলস্টোন ট্রাজেডি: মর্মান্তিক সময়ে দায়িত্বশীল আচরণ সকলের কর্তব্য
লুবনা ইয়াসমিন। ছবি: মেডিভয়েস

বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হয়েছে সোমবার দুপুরে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বাড়ছেই। যারা বেঁচে আছেন—তাদের অনেকেই গুরুতর আহত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। অনেক শিশু এই ঘটনার শিকার হয়ে শারীরিক ও মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত। স্মরণকালের ভয়াবহ এক বিমান দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো গোটা বাংলাদেশ। আমি হতভম্ব, আমরা কেউই এমন ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হতে চাই না।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—এই দুর্ঘটনায় শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যাদের পরিবারে এই শিশুদের ওপর দিয়ে এমন বিপর্যয় নেমে এসেছে, তাদের যন্ত্রণার কথা চিন্তা করে দেখুন। দয়া করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এক লাইন পড়ে তথ্য যাচাই না করে স্ট্যাটাস দেওয়া বন্ধ করুন। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কারও উপকার হয় না, বরং ক্ষতিই হয়।

এমন সংকটময় মুহূর্তেও প্রতারক চক্র সক্রিয়। বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে ‘ডোনেশন চাওয়া’র নামে প্রতারণা চলছে। ডোনেশন পাঠানোর আগে যাচাই করুন। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতার যথেষ্ট মাধ্যম ও কর্তৃপক্ষ আছে।

এখন প্রয়োজন উপযুক্ত চিকিৎসা ও সেবা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের চিকিৎসক ও সেবাকর্মীরা অতীতে বহুবার দুর্যোগের সময় অসীম দক্ষতা দেখিয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় দগ্ধ অসংখ্য মানুষকে সেবা দিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন—এই দেশেও দক্ষতার অভাব নেই। বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনতে হবে—এমন দাবি অযৌক্তিক ও প্রহসনমূলক। বরং আমাদের নিজেদের ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা জরুরি।

এই সময়ে সমালোচনা, দোষারোপ, গালাগাল করে কোনো লাভ নেই। এখন প্রয়োজন যথাযথ তত্ত্বাবধান। হাসপাতালগুলোতে আহতদের সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক-সেবাকর্মীদের রাত-দিন একাকার হয়ে যাচ্ছে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ—মনিটরিং জোরদার করুন, যেন কোনো অব্যবস্থাপনা না ঘটে। শিক্ষকদের গায়ে, সেনাবাহিনীর সদস্যরা হাত তুলেছেন। কিন্তু কেন? এই রকম একটা অবস্থায় কেউ কাউকে মারতে পারে—আমার বোধগম্য নয়।

একটা কোচিং সেন্টারেই শ’ শ’ বাচ্চা পড়াশোনা করে, এটা তো একটা স্কুল ছিল। কতজন মারা গেছে এটা লুকানোর চেষ্টা করে কি কোনো লাভ হবে কারও? দুর্ঘটনার তথ্য গোপন করে লাভ নেই। অনেকেই জানতে চায়—কতজন শিশু মারা গেছে, কতজন নিখোঁজ, কারা কোথায় ভর্তি, কতজন পুড়ে গেছে, দগ্ধ হয়েছে বা শরীর খণ্ডিত হয়েছে, স্কুলে দুর্ঘটনার সময় কতজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক ছিলেন? এসব তথ্য বের করা কঠিন নয়—স্কুল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও স্থানীয়রা জানেন। দয়া করে সত্য গোপন করবেন না। মানুষ জানতে চায়। নিহত ও আহত শিশুদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।

বিভ্রান্তিমূলক স্ক্রিনশট ও গুজব থেকে সাবধান থাকুন। সম্প্রতি একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট এমন দুর্ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল—এই নিয়ে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে সে নামে কোনো ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট নেই। Chief Adviser GOB নামে একটি অ্যাকাউন্টকে ভুয়া খবরের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে এমন কোনো তথ্য নেই। বিদেশ থেকে এসব বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়ে জনগণকে নাড়া দেওয়া এক ধরনের সাইবার প্রতারণা। দয়া করে, এসব গুজবে কান দেবেন না।

এই মুহূর্তে যা প্রয়োজন—সঠিক তথ্য, দ্রুত চিকিৎসাসেবা, প্রতারক চক্র থেকে সতর্কতা, আর একটুখানি মানবিকতা। সরকার, সেনাবাহিনী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ—সততা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করুন।

মনে রাখুন, ভুয়া খবর ছড়ানো শুধু অপরাধ নয়, এটি দুর্যোগে আরও মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই মর্মান্তিক সময়ে দায়িত্বশীলভাবে আচরণ করা আমাদের সকলের কর্তব্য। সত্য জানুন। গুজব বন্ধ করুন। বাংলাদেশকে সাহায্য করুন সত্য দিয়ে, বিভ্রান্তি দিয়ে নয়।

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : উত্তরার বিমান দুর্ঘটনা
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত